কানাডার বিক্ষোভে বাংলাদেশি প্রতিষ্ঠানের ইন্ধন!

কানাডার রাজধানী অটোয়াতে চলমান বিক্ষোভ, ‘ফ্রিডম কনভয়’-তে একটি বাংলাদেশি ডিজিটাল প্রতিষ্ঠান অন্যতম মুখ্য ভূমিকা পালন করেছে বলে অভিযোগ উঠেছে। সংবাদভিত্তিক ওয়েবসাইট গ্রিড সম্প্রতি এক প্রতিবেদনে এই অভিযোগ তুলেছে। ফেসবুকসহ অন্যান্য সামাজিক মাধ্যমের পাশাপাশি ‘গিভসেন্ডগো’-এর মত অর্থ সংগ্রহকারী ওয়েবসাইটের মাধ্যমে বিক্ষোভটির ডিজিটাল জগতে একটি বিশাল উপস্থিতি রয়েছে। ডিজিটাল কার্যক্রমগুলোর উদ্দেশ্য বিক্ষোভটিতে নীতিগত সমর্থন, রসদ, মানুষ ও অর্থ যোগান দিয়ে সহায়তা করা।

গ্রিড এসব অনলাইন ফোরামের তথ্য বিশ্লেষণ করে, বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে আলাপ করে এবং অর্থ প্রদানের ৮০,০০০টি রেকর্ড পর্যালোচনা করে। বিশ্লেষণের পর ১১ ফেব্রুয়ারি (শুক্রবার) নিজেদের ওয়েবসাইটে একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করে গ্রিড। প্রকাশিত প্রতিবেদনটিতে উঠে এসেছে এমন এক চিত্র, যাতে বিশ্বের এক প্রান্তে চলমান বিক্ষোভটির সঙ্গে আরেক প্রান্তের ব্যক্তি ও ব্যবসার সম্পর্কের বিষয়টিও উঠে এসেছে। একই সাথে উঠে এসেছে আপাত টিকাবিরোধী বিক্ষোভের সঙ্গে ইহুদীবিরোধী, শ্বেতাঙ্গ কর্তৃত্ববাদী, উগ্রবাদী গোষ্ঠীদের যোগসূত্র।

সবচেয়ে বড় দুইটি ফেসবুক গ্রুপ পরিচালনা করত জাকির সৈকতের বাংলাদেশি ডিজিটাল মার্কেটিং প্রতিষ্ঠান।

গ্রিড এর অনুসন্ধানে জানা যায় যে, কানাডার ফ্রিডম কনভয় এর সঙ্গে সম্পর্কিত ফেসবুকের সবচেয়ে বড় দুইটি গ্রুপ, একটি বাংলাদেশি ডিজিটাল মার্কেটিং প্রতিষ্ঠান পরিচালনা করত। গত বৃহস্পতিবার ফেসবুকের নিয়ন্ত্রণকারী কোম্পানি মেটা গ্রুপগুলো বন্ধ করে দেয়। ২৭ জানুয়ারি তৈরি করা ‘ফ্রিডম কনভয় ২০২২’ এবং ৩০ জানুয়ারি তৈরি করা ‘কনভয় টু অটোয়া ২০২২’ নামের গ্রুপ দুইটিতে মোট ১,৭০,০০০ সদস্য ছিল। ‘গিভসেন্ডগো’ নামের অর্থায়ন সংগ্রহকারী ওয়েবসাইটে থাকা অটোয়ার বিক্ষোভকারীদের পেজটিতে অর্থ প্রদানের জন্য আহ্বান জানানো হয়েছিলো বাংলাদেশি ফার্মের পরিচালিত ঐ গ্রুপ দুইটিতে।

নিজের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ বিষয়ে বাংলাদেশি ফার্মটির প্রতিষ্ঠাতা জাকির সৈকত ভয়েস অফ আমেরিকাকে বলেন, ‘আমি একটি ফেসবুক গ্রুপ খুলেছি সেখানে অনেক লোকজন এসে যুক্ত হয়েছে। এর বেশি কিছু জানি না’।

আন্তর্জাতিক কয়েকটি গণমাধ্যমে বিষয়টি নিয়ে সংবাদ প্রকাশ হয়েছে এই বিষয়টিকে আপনি কীভাবে দেখছেন, জানতে চাইলে জাকির সৈকত বলেন, ‘যারা নিউজ করেছে তারা নিজেরা আলোচনায় থাকার জন্য নিউজ করেছে’।

জাকির সৈকত নিজের বিষয়ে ভয়েস অফ আমেরিকাকে বিস্তারিত তথ্য জানাতে রাজি হননি।

যুক্তরাষ্ট্রের ইউনিভার্সিটি অফ ক্যালিফোর্নিয়া-বার্কলের ইনভেস্টিগেটিভ রিপোর্টিং প্রোগ্রামের একজন গবেষক, নাজমুল আহসান, গত সপ্তাহে জাকির সৈকতের সঙ্গে যোগাযোগ করেন।

এ প্রসঙ্গে নাজমুল আহসান ভয়েস অফ আমেরিকাকে বলেন, গ্রিড এর প্রতিবেদনটি প্রকাশের আগেই (যুক্তরাষ্ট্র সময় ৮ ফেব্রুয়ারি মঙ্গলবার সন্ধ্যা) তিনি জাকির সৈকতের সঙ্গে কথা বলেছিলেন। তখন সৈকত তাকে জানিয়েছিলেন, তিনি কানাডার ফ্রিডম কনভয় নিয়ে কাজ করছেন। এছাড়াও, সে সময়ে সৈকত আরও জানান, যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা, অস্ট্রেলিয়াসহ বিভিন্ন দেশের অডিয়েন্সকে টার্গেট করে তিনি বিভিন্ন ক্যাম্পেইন পরিচালনা করে থাকেন।

পরে সাংবাদিক হিসেবে সৈকতের মতামত গ্রহণ করতে চাইলে সে বিষয়ে তিনি অস্বীকৃতি জানান বলে নাজমুল আহসান ভয়েস অফ আমেরিকাকে বলেন। নাজমুল আহসান ভয়েস অফ আমেরিকাকে আরও জানান, গ্রিডের প্রতিবেদন প্রকাশের পর থেকে জাকির সৈকতের প্রতিষ্ঠানের ফেসবুক পেজ, ‘জেএস সোশ্যাল মিডিয়া মার্কেটিং’ নামক অ্যাকাউন্টটি আর খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। সেই অ্যাকাউন্ট-এর সূত্র ধরেই জাকির সৈকতের সঙ্গে যোগাযোগ করেন নাজমুল আহসান।

বাংলদেশি প্রতিষ্ঠানের জড়িত থাকা বিষয়ে, পুলিশের ডিবি সাইবার অ্যান্ড স্পেশাল ক্রাইম-এর ডিসি মো. শরিফুল ইসলাম ভয়েস অফ আমেরিকাকে বলেন, ‘জাকির সৈকতের বিষয়টি এখনও আমরা জানি না। আমাদের কাছে এ বিষয়ে কোনো তথ্য বা অভিযোগ এখনো আসেনি । তবে এ ধরনের কার্যক্রম দমনে আমাদের কাজের অভিজ্ঞতা আছে। যদি কেউ সোশ্যাল মিডিয়ায় সংঘবদ্ধ হয়ে অনৈতিক বা আইনবিরুদ্ধ কাজ করে তার বিরুদ্ধে পদক্ষেপ নেওয়া হয়’।

ওদিকে জাকির সৈকত নামের একজন ব্যক্তির সঙ্গে বৃহস্পতিবার যোগাযোগ করেছিল গ্রিড। সৈকত অনলাইনে তাদেরকে একটি সাক্ষাৎকার প্রদান করলেও সেখানে ভিডিও চালু করেননি, যার কারণে তার চেহারা দেখা যায়নি।

গ্রিডকে গ্রুপ দুইটি যে তারা পরিচালনা করেন, সেটি নিশ্চিত করেন সৈকত। সাক্ষাৎকারটিতে সৈকত বলেন, ‘এটি আমার নিজস্ব সিদ্ধান্ত কারণ আমি স্বাধীনতায় বিশ্বাস করি’। তিনি আরও বলেন, ‘স্বাধীনভাবে কথা বলার অধিকার রয়েছে আমাদের’।

গ্রিডকে সৈকত বলেন যে, বিক্ষোভকারীদের মতাদর্শে বিশ্বাস করেন বলে গ্রুপ দুইটি চালু করেন তিনি। পৃথিবীর আরেক প্রান্তের একটি বিক্ষোভ সমর্থন করার জন্য কোন অর্থ পাননি বলেও দাবি করেন তিনি।

তবে, শুধুমাত্র যে কানাডার বিক্ষোভেই বাংলাদেশিরা জড়িত, বিষয়টি তেমন নয়। অস্ট্রেলিয়াতে ‘কনভয় টু ক্যানবেরা’ নামের একটি বড় ফেসবুক গ্রুপও একজন বাংলাদেশি অ্যাডমিনিস্ট্রেটর পরিচালনা করেন বলে তথ্য পাওয়া গিয়েছে বলে জানায় গ্রিড।

কানাডা সরকার ১৫ জানুয়ারি দেশটিতে প্রবেশকারী ট্রাকচালকদের জন্য কোভিড-১৯ এর টিকাগ্রহণ ও অন্যান্য বিষয়ে কিছু বিধিনিষেধ জারি করে। এর প্রতিবাদে জানুয়ারি ২২ থেকে বিভিন্ন স্থান থেকে ট্রাকচালকরা ট্রাকের বহর নিয়ে অটোয়ার দিকে রওনা হন। জানুয়ারির ২৯ তারিখে অটোয়ার পার্লামেন্ট হিলে অবস্থান নেন তারা। সেই বিক্ষোভটি এখনও চলমান রয়েছে এবং এর ফলে অটোয়ার কেন্দ্রস্থল কার্যত অচল হয়ে পড়েছে।

আরেকটি অংশ ৭ ফেব্রুয়ারি কানাডা ও যুক্তরাষ্ট্রের মিশিগানের মধ্যবর্তী অ্যাম্বাসেডর সেতুটি অবরোধ করে। ফলে এই সীমান্ত সংযোগস্থলটি দিয়ে দুইটি দেশের মধ্যে চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। ১১ তারিখে কানাডার আদালত এই অবরোধের বিরুদ্ধে রায় দিলে, পুলিশ ১৩ তারিখ এলাকাটি নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নিতে সক্ষম হয়।

এর আগে শুক্রবার (১১ ফেব্রুয়ারি) যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন কানাডার প্রধানমন্ত্রী জাস্টিন ট্রুডোর সাথে এ বিষয়ে ফোনালাপ করেন। বিক্ষোভ নিরসনে ট্রুডোকে কেন্দ্রীয় সরকারের শক্তি প্রয়োগের আহ্বান জানান প্রেসিডেন্ট বাইডেন। সেদিন আলাপকালে ট্রুডো প্রেসিডেন্ট বাইডেনকে বলেন যে, বিক্ষোভের পরিণতি ‘আরও গুরুতর’ হয়ে চলেছে।

এই প্রতিবাদ-বিক্ষোভ বা ‘ফ্রিডম কনভয়’- এর মূল দাবিটি ছিল টিকা সংক্রান্ত বিধিনিষেধ ও টিকা পাসপোর্টের বাধ্যবাধকতা অপসারণ।

ওদিকে 'গিভসেন্ডগো' ওয়েবসাইটটির কানাডা কনভয় সংক্রান্ত পেজে জমা হওয়া অর্থ নিয়ে একটি বিশ্লেষণ করে গ্রিড। তাতে দেখা যায় যে, গত বৃহস্পতিবার পর্যন্ত সেখানে ৮০ লক্ষ ডলারের বেশি জমা হয়, যার বেশিরভাগই অজ্ঞাতপরিচয় ব্যক্তিদের থেকে এসেছে এবং সেই দানগুলোর বেশিরভাগই ১০০ ডলার বা তার কম পরিমাণের। ৮০,০০০ টি লেনদেন বিশ্লেষণ করে গ্রিড, যার মধ্যে প্রায় অর্ধেক দানকারীরা তাদের পরিচয় গোপণ রাখেন। আবার অনেকেই ছদ্মনাম ব্যবহার করেছেন, যেগুলোর মধ্যে কানাডার প্রধানমন্ত্রী জাস্টিন ট্রুডো এবং যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনের নামও ব্যবহার করা হয়।

কানাডার ফ্রিডম কনভয়ের মত বিক্ষোভ যুক্তরাষ্ট্রসহ অন্যান্য দেশেও ছড়িয়ে পড়ছে। শনিবার প্যারিসের আর্ক দ্য ট্রিয়ম্ফ স্মৃতিস্তম্ভের আশপাশে বিক্ষোভকারীরা যান চলাচল বাধাগ্রস্ত করে, যদিও শহরটিতে বিক্ষোভকারীদের প্রবেশের ক্ষেত্রে নিষেধাজ্ঞা জারি ছিল। প্যারিসে বিক্ষোভকারীদের ছত্রভঙ্গ করতে পুলিশ কাঁদানে গ্যাস নিক্ষেপ করে।

এছাড়াও শনিবার নিউজিল্যান্ড ও অস্ট্রেলিয়াতেও বিক্ষোভকারীরা রাস্তা বন্ধ করে দেয় এবং মানুষের জীবনযাত্রা ব্যাহত করে। অস্ট্রেলিয়ার রাজধানী ক্যানবেরার একটি স্থানে প্রায় ১০,০০০ বিক্ষোভকারী জড়ো হন। তারা রাস্তায় চলাচল বাধাগ্রস্ত করেন, যার ফলে একটি জনপ্রিয় বইমেলা বাতিল করে দিতে হয়।