বিদায়ী নির্বাচন কমিশনার মাহবুব তালুকদার বলেছেন, আমি যে বিএনপির মুখপাত্র, এটা আমি প্রথম জেনেছি মন্ত্রিপরিষদ সচিবের প্রেস বিফিং থেকে।
শেষ কার্যদিবসে সোমবার নিজ দপ্তরে বিদায়ী ব্রিফিংয়ে এ কথা বলেন তিনি। বরাবরের মত শেষ ব্রিফিংয়েও ‘আমার কথা’ শীর্ষক লিখিত বক্তব্য সাংবাদিকদের হাতে তুলে দেন বিদায়ী নির্বাচন কমিশনার। তবে এদিন সাংবাদিকদের বিভিন্ন প্রশ্নের উত্তরও দেন তিনি।
নানা ঘটনায় কমিশনের ভূমিকা নিয়ে হতাশা প্রকাশ করে আলোচনায় থাকা এ নির্বাচন কমিশনার বলেন, ‘আমি যে বিএনপির মুখপাত্র, এটা আমি প্রথম জেনেছি মন্ত্রিপরিষদ সচিবের প্রেস বিফিং থেকে। মজার ব্যাপার হচ্ছে- আমি যখনই দৃঢ়ভাবে কোনো বক্তব্য পেশ করি, তখনই বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ লোক সমালোচনা করে বলে যে ‘সে তো বিএনপির সুরে কথা বলে।’
তিনি বলেন, ‘বিএনপির যে কী সুর, সেটা আমি বুঝি না। যারা এ ধরনের কথা বলেন, তারা হয়ত বা জানেন, আমি তো জানি না।’
এক প্রশ্নের জবাবে মাহবুব তালুদার বলেন, বিব্রত বোধ করার কথা বলেছি সব সময়, নীরব জনগোষ্ঠীর ভাষা বোঝার চেষ্টা করেছি। যাদের কথা সারফেসে আসে না, রাজনৈতিক দল বলে না, সেসব অশ্রুত ভাষা বোঝার চেষ্টা করেছি। আমি মনে করি আমি তাদের মুখপাত্র। তাদের কাছ থেকে জেনে বুঝে বলার চেষ্টা করেছি।’
মাহবুব তালুকদারের দাবি, নির্বাচন কমিশনার হিসেবে সভায় সব সময় ‘নিগৃহীত’ হতে হয়েছে তাকে।
তিনি বলেন, ‘আমি পাঁচজনের একজন। গণতন্ত্রের কথা বলতে গিয়ে, গণতন্ত্রের জন্য সংখ্যালঘু হিসেবে আমি হেরে গেলাম। এমনও ঘটনা রয়েছে, একাদশ সংসদ নির্বাচনের কমিশনে কথা বলতে গিয়ে আমাকে বক্তব্য রাখতে দেওয়া হয়নি। কেন? ’
শেষ ব্রিফিংয়ে কেন সিইসির সঙ্গে উপস্থিত হলেন না জানতে চাইলে মাহবুব তালুকদার বলেন, ‘কারণ, এটাই যে, আমি মুক্তভাবে কথাগুলো বলতে পারলাম। আমার এ কথাগুলো ওখানে মানানসই বলে আমি মনে করি না। পাঁচ বছরে যা কিছু বলেছি, ফলোদয় হয়নি।’
লিখিত বক্তব্যে মাহবুব তালুকদার বলেন, নির্বাচন কমিশন গঠন আইনটি সব রাজনৈতিক দলের কাছে গ্রহণযোগ্য না হলে সংকটের সমাধান হবে না। এখন পর্যন্ত আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিরোধী দলগুলোর অংশগ্রহণের কোনো পূর্বাভাস দেখা যাচ্ছে না। এতে সংকট আরও ঘনীভূত হবে।
ভোটের সহিংসতা নিয়ে তিনি বলেন, ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়েছে, ওই নির্বাচনে গণতন্ত্র নেই, গণতন্ত্রের লাশ পড়ে আছে। এই লাশ সৎকারের দায়িত্ব কে নেবে? কথাটা রূপকার্থে বলা হলেও এটাই সত্য। নির্বাচনের নামে সারা দেশে এমন অরাজকতা কখনো কাঙ্ক্ষিত ছিল না।
তার মতে, তৃণমূল পর্যায়ে এই নির্বাচন ‘দ্বন্দ্ব-সংঘাতের চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত’ করে দিয়েছে। অন্যদিকে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় পদে আসীন হওয়াকে নির্বাচন বলা যায় কি-না, তা নিয়েও তার প্রশ্ন আছে।
বিদায়বেলার আত্মবিশ্লেষণে মাহবুব তালুকদার বলেন, নির্বাচন কমিশনের বড় দুর্বলতা নির্বাচন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিবর্গের অনিয়ম, পক্ষপাতিত্ব, জালিয়াতি- ইত্যাদি সম্পর্কে ভুক্তভোগীরা যে সকল অভিযোগ করেন, সে বিষয়ে ব্যবস্থা নেওয়ার দৃষ্টান্ত বিরল। লিখিতভাবে যে সব অভিযোগ পাঠানো হয়, তারও যথাযথ নিষ্পত্তি হয় না। অধিকাংশ অভিযোগই আমলে না নিয়ে নথিভুক্ত করা হয় বা অনেক ক্ষেত্রে নথিতেও তার ঠাঁই হয় না। আমাদের কার্যকালের শেষ পর্যায়ে এসে বিগত কয়েক মাসে অবশ্য এর কিছু ব্যতিক্রম লক্ষ্য করা যাচ্ছে।
নির্বাচনে জনমানসের প্রতিফলন ‘একান্ত অপরিহার্য’ মন্তব্য করে এ নির্বাচন কমিশনার বলেন, ইউনিয়ন পরিষদ থেকে সংসদ নির্বাচন পর্যন্ত সর্বত্র জনমানসের প্রতিফলন একান্ত অনুপস্থিত। এতে বিশেষভাবে টাকার খেলাই প্রতিভাত হয়। রাজনীতি ধীরে ধীরে ব্যবসায়ীদের করতলগত হয়ে যাচ্ছে।
অবাধ, সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের বাধাগুলো দূর করতে নির্বাচন প্রক্রিয়ার সংস্কার প্রয়োজন বলেও মত দেন মাহবুব তালুকদার।