ছাত্রীকে দলবদ্ধ ধর্ষণের প্রতিবাদে সড়ক অবরোধের সময় স্থানীয়দের হামলার শিকার হয়েছেন গোপালগঞ্জের বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (বশেমুরবিপ্রবি) উপাচার্যসহ শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা। এ সময় বিশ্ববিদ্যালয়ের হামলার নির্দেশ দেওয়া হয় মসজিদের মাইকে। হামলায় বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য, প্রক্টরসহ অন্তত ২০ শিক্ষক-শিক্ষার্থী আহত হয়েছেন।
বৃহস্পতিবার (২৪ ফেব্রুয়ারি) বিকাল সাড়ে ৪টায় গোপালগঞ্জ সদরের ঘোনাপাড়ায় ঢাকা-খুলনা মহাসড়ক অবরোধকারী শিক্ষার্থীদের ওপর এ হামলার ঘটনা ঘটে। এ সময় অবরোধকারী শিক্ষার্থীরা দিশেহারা হয়ে আশেপাশে ছুটে পালান। বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. একিউএম মাহবুব, প্রক্টর ড. মো. রাজিউর রহমানসহ অনেক শিক্ষক-শিক্ষার্থী হামলার শিকার হয়ে আশেপাশের বাড়িতে আশ্রয় নেন। শিক্ষার্থীদের ওপরে সন্ধ্যা ৭টা পর্যন্ত দফায়-দফায় হামলা চালায় স্থানীয়রা।
হামলাকারীরা প্রধানমন্ত্রীর উপহার দেওয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি গাড়িও ভাঙচুর করে। মসজিদের মাইকে ঘোষণা দিয়ে ক্যাম্পাসে গিয়েও দেশীয় অস্ত্র ও লাঠিসোঁটা নিয়ে ওপরে হামলা চালানো হয় বলে অভিযোগ।
হামলায় আহত বিশ্ববিদ্যালয়ের লোক প্রশাসন বিভাগের তৃতীয় বর্ষের শিক্ষাার্থী ফারাবি, আইন বিভাগের শিক্ষাার্থী জাকারিয়া, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের শিক্ষার্থী হোসাইন, বাংলা বিভাগের দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী দীপঙ্কর সাহা, মার্কেটিং প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থী রাকিবুলকে গোপালগঞ্জ সদর হাসপাতালে ভর্তি করা হয়।
এ ছাড়া সমাজবিজ্ঞান বিভাগের চতুর্থ বর্ষের শিক্ষার্থী রাজকে উন্নত চিকিৎসার জন্য খুলনা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে।
এ ঘটনার আগেও বেশ কয়েকবার মসজিদের মাইকে ঘোষণা দিয়ে শিক্ষার্থীদের ওপর হামলা চালিয়েছে স্থানীয়রা। এমন ঘটনা বারবার ঘটায় ক্ষোভ প্রকাশ করেন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা।
বিশ্ববিদ্যালয়ের ইলেক্ট্রিক্যাল অ্যান্ড ইলেক্ট্রনিক ইঞ্জিনিয়ারিং (ইইই) বিভাগের শিক্ষার্থী হান্নান মিয়া বলেন, কত আয়োজন করে মসজিদের মাইকে ঘোষণা দিয়ে আমাদের ওপর হামলা হয়, বোনেদের লাঞ্ছনার শিকার হতে হয়, কিছুদিন পরপর বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীর ওপর নির্যাতন হয়।
মার্কেটিং বিভাগের শিক্ষার্থী মো. তাওহীদ হাসান বলেন, কতটা আমরা অসহায় বলতে পারব না। ১ ঘণ্টা আগে যারা আমাদের সঙ্গে একাত্মতা প্রকাশ করে স্লোগান দিয়েছিল, তারাই নারকীয় হামলা চালায়, পরিকল্পিতভাবে মাইকে ঘোষণা করে হামলা করা হয়। যাকে যেখানে পেয়েছে ইচ্ছামতো পিটিয়েছে এমনকি আমাদের বোনরাও রক্ষা পায়নি।
সন্ধ্যা সাড়ে ৭টার দিকে উপাচার্য ড. একিউএম মাহবুব ক্যাম্পাসে ফিরে এসে জানান, বিকেলে তার ওপরও হামলা হয়। আতঙ্কগ্রস্ত হয়ে তিনিসহ কয়েকজন শিক্ষক ও শিক্ষার্থী পাশ্ববর্তী একটি বাড়িতে আশ্রয় নেন।
তিনি বলেন, আমার ওপর হামলা হয়েছে সভাপতি ড. কামরুজ্জামানসহ সবাই হামলার শিকার হয়েছেন। পুলিশ প্রটেকশনের জন্য বার বার জানিয়েছি। তারা গ্রাহ্য করেনি। পুলিশ প্রটেকশন ছাড়াই তারা ক্যাম্পাসে ফিরে আসতে হয়েছে।
হামলায় বিষয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর ড. মো. রাজিউর রহমান বলেন, এখন থেকে আর কোনো বিষয়ে জেলা প্রশাসনের সঙ্গে আলোচনা হবে না। আমরা সরাসরি প্রধানমন্ত্রীর হস্তক্ষেপ কামনা করছি। প্রশাসনের নজরে আনা হয়েছে প্রতিটা বিষয়। এরপরও স্থানীয়রা শিক্ষার্থীদের ওপরে হামলা চালিয়েছে।
প্রক্টর আরো বলেন, শুক্রবার সকাল ১১টার মধ্যে আমাদের পরবর্তী করণীয় জানানো হবে।
জানা যায়, বুধবার (২৩ ফেব্রুয়ারি) রাত সাড়ে ৯টার পর বিশ্ববিদ্যালয়ের এক ছাত্রী তার বন্ধুর সঙ্গে গোপালগঞ্জ সদরের নবীনবাগ হেলিপ্যাডের সামনে থেকে হেঁটে যাচ্ছিলেন। এ সময় ৫ থেকে ৭ জন বখাটে এসে ওই ছাত্রী আর তার বন্ধুকে গোপালগঞ্জ জেলা প্রশাসন স্কুল অ্যান্ড কলেজের নির্মাণাধীন ভবনে তুলে নিয়ে যায়। সেখানে বন্ধুকে আটকে রেখে মারধর করা হয়। তখন ওই ছাত্রী দলবদ্ধ ধর্ষণের শিকার হন। ভুক্তভোগী ছাত্রী বন্ধুদের মেসে গিয়ে সব ঘটনা জানায়। পরে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন ছাত্রীকে উদ্ধার করে গোপালগঞ্জ সদর হাসপাতালে ভর্তি করে।
গোপালগঞ্জ সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. মনিরুল ইসলাম বলেন, জিজ্ঞাসাবাদের জন্য পিয়াস সিকদার (২২), অন্তর (২১) ও জীবনকে (২০) আটক করে থানায় আনা হয়েছে। এছাড়া ভিডিও ফুটেজ দেখে আসামিদের শনাক্ত করার চেষ্টা চলছে।
এদিকে অন্তর ও জীবন নামে দু’জন পরিচ্ছন্নতা কর্মীকে আটকের ঘটনায় শহরের অন্যান্য পরিচ্ছন্নতা কর্মীরা নবীনবাগে রাস্তার ওপর আবর্জনা ফেলে অবরোধ করে। ঘটনাস্থলে সাংবাদিক গেলে অবরোধকারী পরিচ্ছন্নতা কর্মীরা অশ্লীল আচরণ করে সংবাদ সংগ্রহে বাধা দেয়।
ভোর থেকে শুরু হওয়া অবরোধে দুপুর আড়াইটায় শিক্ষার্থীদের সঙ্গে কথা বলতে ঘোনাপাড়া ঘটনাস্থলে যান গোপালগঞ্জ জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক মাহাবুব আলী খান, ছাত্রলীগের নেতাকর্মী, জেলা প্রশাসক শাহিদা সুলতানা, পুলিশ সুপার আয়েশা সিদ্দিকাসহ কর্মকতারা।
তারা অভিযুক্তদের গ্রেপ্তারের আশ্বাস দিয়ে শিক্ষার্থীদের অবরোধ তুলে নেয়ার অনুরোধ করেন। এ সময় জেলা আওয়ামী লীগ ও ছাত্রলীগের পক্ষ থেকে শিক্ষার্থীদের দাবি-দাওয়ার সঙ্গে সহমত পোষণ করা হয়। এ ছাড়া দোষীদের আটক ও সর্বোচ্চ শাস্তির দাবিতে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক সমিতি, কর্মচারী সমিতিসহ বেশ কয়েকটি সংগঠন বিবৃতি দিয়েছে।