প্রতারণার টার্গেট এমপি-নেতা

কখনো প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের বড় কর্মকর্তা, কখনো আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় নেতা, আবার কখনো মন্ত্রী পরিচয়ে টার্গেট করা ব্যক্তিকে ফোন করে টাকা চেয়েছে একটি চক্র। অনলাইন মাধ্যম থেকে ওই ব্যক্তির ফোন নম্বর সংগ্রহ করে চক্রটি। এভাবে ফোন করে টার্গেট করা অনেকের কাছ থেকেই তারা টাকা হাতিয়ে নিয়েছে।

এ চক্রের হোতা আবু হোরায়রা ওরফে খালিদকে (২৫) গত রবিবার নাটোরের সিংড়া থেকে গ্রেপ্তার করার পর পুলিশ এসব তথ্য জানিয়েছে।

ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) গোয়েন্দা বিভাগের সাইবার অ্যান্ড স্পেশাল ক্রাইম বিভাগের অর্গানাইজড ক্রাইম ইনভেস্টিগেশন টিম খালিদকে গ্রেপ্তার করে। তার কাছ থেকে তিনটি ভুয়া নাম-ঠিকানায় নিবন্ধিত সিম কার্ড উদ্ধার করা হয়। এসব সিম কার্ডে খোলা বিকাশ ও নগদ অ্যাকাউন্টে কত টাকা লেনদেন হয়েছে তা অনুসন্ধান করছে পুলিশের গোয়েন্দা বিভাগ (ডিবি)।

ডিবি কর্মকর্তারা জানান, খালিদ ফোন করে বলতেন, ‘করোনাকালীন অর্থ সাহায্যের জন্য মাননীয় প্রধানমন্ত্রী একটি ট্রাস্ট গঠন করেছেন। সেই ট্রাস্টে অর্থ পাঠানোর জন্য প্রধানমন্ত্রী অনুরোধ করেছেন।’ ৫০ হাজার থেকে ২ লাখ টাকা পর্যন্ত সহায়তা দিতে বলত খালিদ। অনেকে যাচাই না করেই টাকা দিয়ে দিত। অসংখ্য ভুক্তভোগীর কাছ থেকে এভাবে চক্রটি লাখ লাখ টাকা আত্মসাৎ করেছে বলে ডিবি কর্মকর্তারা জানিয়েছেন। এ ছাড়া নির্বাচনে দলীয় মনোনয়ন ও পদপদবি দেওয়ার কথা বলেও মোটা অঙ্কের টাকা হাতিয়ে নিয়েছে চক্রটি।

চক্রের হোতা খালিদের বাড়ি নাটোরের সিংড়া উপজেলার বালুয়া বাসুয়া গ্রামে। তার বাবার নাম জিয়াদুল ইসলাম। খালিদ রংপুর বেতারে তৃতীয় শ্রেণির পদে চাকরি করেন।

অর্গানাইজড ক্রাইম ইনভেস্টিগেশন টিম লিডার অতিরিক্ত উপকমিশনার মো. নাজমুল হক দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘খালিদের বিরুদ্ধে আগেও প্রতারণার মামলা হয়েছে। চক্রের অন্যদের গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে।’

জাতীয় সংসদের সদস্য হোসনে আরা বেগমের (সংরক্ষিত মহিলা আসন ৩১৬) পক্ষে তার ব্যক্তিগত সহকারী মো. সিনার ম-ল গত বছরের ১০ ডিসেম্বর জামালপুরের ইসলামপুর থানায় খালিদের বিরুদ্ধে একটি জিডি করেন।

জিডিতে উল্লেখ করা হয়, গত বছর ৯ ডিসেম্বর বিকেলে হোসনে আরা বেগমের ব্যক্তিগত মোবাইল ফোনে নিজেকে আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কাযনির্বাহী কমিটির ‘সাংগঠনিক সম্পাদক’ কামাল হোসেন পরিচয় দিয়ে ফোন করেন। তিনি প্রধানমন্ত্রীর উদ্ধৃতি দিয়ে বলেন, গরিব-দুঃখীদের মধ্যে অনুদান হিসেবে দেওয়ার জন্য প্রত্যেক এমপিকে কমপক্ষে দুই লাখ টাকা দিতে হবে। একটি বিকাশ অ্যাকাউন্টের নম্বর দিয়ে সেখানে টাকা পাঠাতে বলেন। কিন্তু ওই সংসদ সদস্য জানতে পারেন এমন কোনো নির্দেশ প্রধানমন্ত্রী দেননি।

ওই জিডির সূত্র ধরে গত বছরের ১৪ ডিসেম্বর র‌্যাব খালিদকে রংপুরের পরশুরাম থানা এলাকা থেকে গ্রেপ্তার করে। পরদিন পরশুরাম থানায় একটি মামলা করেন সিনার ম-ল।

এ বিষয়ে মামলার তদন্ত কর্মকর্তা পরশুরাম থানার উপপরিদর্শক (এসআই) মো. হাবিবুর রহমান গত বুধবার দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘টাকা হাতিয়ে নিতে না পারায় প্রতারণার মামলাটি দুর্বল ছিল। এজন্য সহজেই খালিদ জামিন পেয়ে গেছেন।’

আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক এসএম কামাল হোসেনের সহযোগী পরিচয় দিয়ে কার্তিক বিশ্বাস ওরফে শুভ নামে এক ব্যক্তি গত ১৯ ফেব্রুয়ারি রাজধানীর ধানম-ি থানায় অজ্ঞাত পরিচয় এক ব্যক্তির বিরুদ্ধে একটি প্রতারণার মামলা করেন। ওই মামলার তদন্তে নেমে তথ্য-প্রযুক্তির সহায়তায় আবার খালিদকে গ্রেপ্তার করে পুলিশের গোয়েন্দা বিভাগ (ডিবি)।

ধানম-ি থানায় করা মামলার এজাহারে উল্লেখ করা হয়েছে, অজ্ঞাত পরিচয় ওই ব্যক্তি এসএম কামাল হোসেনের নাম ও দলীয় পরিচয় ব্যবহার করে প্রধানমন্ত্রীর উদ্ধৃতি দিয়ে দলীয় অর্থ সংগ্রহের কথা বলছে। নেতাকর্মীদের কাছে বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা ও পদ দেওয়ার কথা বলে প্রতিজনের কাছ থেকে ৫০ হাজার করে টাকা চাচ্ছে। এ ছাড়া ওই ব্যক্তি আওয়ামী লীগের বিভিন্ন মন্ত্রী ও এমপিদের সহকারীর পরিচয় দিয়ে দাপ্তরিক কাজের সুবিধা দেওয়ার কথা বলেও টাকা নিচ্ছে।

কার্তিক বিশ্বাস দেশ রূপান্তরকে বলেন, শুধু কামাল হোসেন নন, আরেক সাংগঠনিক সম্পাদক শফিকুল আলম শফিক ও প্রতিমন্ত্রী জুনায়েদ আহম্মেদ পলকের কথা বলেও চক্রটি টাকা নিয়েছে বলে তিনি জানতে পেরেছেন।