ইউক্রেনে রাশিয়ার আগ্রাসন অষ্টম দিনে পড়েছে আজ বৃহস্পতিবার (৩ মার্চ)। সবশেষ বুধবার ইউক্রেনের অন্যতম প্রধান শহর এবং বন্দরনগরী খেরসন দখলে নিয়েছে রুশ সেনারা। বুধবার থেকে ইউক্রেনের সব গুরুত্বপূর্ণ শহরের আবাসিক এলাকাগুলোতেও বোমা হামলা শুরু করেছে রাশিয়া।
বুধবার ইউক্রেনের প্রথম কোনো বড় শহর হিসেবে খেরসনের দখল নিয়েছে রাশিয়া। শহরের মেয়র জানিয়েছেন, রাশিয়ার সৈন্যরা সিটি কাউন্সিল ভবনে জোরপূর্বক প্রবেশ করেছে এবং বাসিন্দাদের উপর কারফিউ জারি করেছে।
বৃহস্পতিবার ইউক্রেনের রাজধানী কিয়েভ থেকে বাসিন্দাদের নিরাপদে সরে যাওয়ার পরামর্শ দিয়েছে রাশিয়া। মস্কো থেকে রুশ কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, কিয়েভ থেকে বাসিন্দারা দেশটির মধ্যাঞ্চলীয় শহর ভ্যাসিলকিভের দিকে চলে যেতে পারবেন এবং এতে তাদেরকে বাধা দেওয়া হবে না।
অন্যদিকে, ইউক্রেনের বাহিনী বলছে, রাশিয়ার প্যারাট্রুপাররা খারকিভ শহরে নেমেছে। সেখানকার রাস্তায় ইউক্রেনের সৈন্যদের সঙ্গে রাশিয়ার সৈন্যদের লড়াই চলছে।
মারিওপোল এবং খারকিভ শহর ঘিরে রেখেছে রাশিয়ার সৈন্যরা। মারিওপোল শহরের ডেপুটি মেয়র বলেছেন, শহরটিতে ১৫ ঘণ্টার বেশি সময় ধরে একটানা বোমা বর্ষণ করা হয়েছে। ফলে সেখান পরিস্থিতি এখন মানবিক বিপর্যয়ের কাছাকাছি।
একটি আবাসিক অঞ্চলে কয়েকশ মানুষ নিহত হয়েছে বলে ডেপুটি মেয়র আশংকা করছেন। নিহতদের মধ্যে তার বাবাও রয়েছেন।
ইউক্রেনে গত এক সপ্তাহের তীব্র যুদ্ধে রাশিয়ার প্রায় ৫০০ সৈন্য মারা গেছে বলে বুধবার প্রথমবারের মতো স্বীকার করেছে মস্কো। রাশিয়ার প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের এক বিবৃতিতে এই তথ্য জানিয়ে বলা হয়েছে, ইউক্রেনে আক্রমণে প্রায় ৫০০ রুশ সৈন্য মারা গেছে। এছাড়া আহত হয়েছে আরও কয়েকশ।
সংঘাতের অবসানে বেলারুশে রাশিয়া এবং ইউক্রেনের উচ্চ পর্যায়ের প্রতিনিধি দলের বৈঠক হয়েছে। সোমবার স্থানীয় সময় দুপুরের দিকে প্রিপিয়াত নদীর কাছে ইউক্রেন-বেলারুশ সীমান্তের গোমেল অঞ্চলে এই বৈঠক হয়।
গত ২৪ ফেব্রুয়ারি রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন ইউক্রেনের দোনবাস (দোনেৎস্ক এবং লুহানস্ক) অঞ্চলে সামরিক অভিযানের ঘোষণা দেন। ওইদিন সকালে দেওয়া ভাষণে পুতিন ইউক্রেনের সেনাদের অস্ত্র ফেলে ফিরে যাওয়ার আহ্বান জানান। কোনো রক্তপাত হলে তার জন্য ইউক্রেন দায়ী থাকবে বলেও হুঁশিয়ার করেন পুতিন।
এরপর দ্বিতীয় দিনেই ইউক্রেনের রাজধানী কিয়েভের কাছের প্রধান একটি বিমানবন্দর দখলে নেয় রুশ সৈন্যরা। প্রায় ২০০ হেলিকপ্টার ব্যবহার করে অভিযান চালিয়ে ইউক্রেনের দুই শতাধিক সৈন্যকে হত্যার পর ওই ঘাঁটি দখলে নেওয়া হয় বলে জানায় রাশিয়ার প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়।
ইউক্রেনে রাশিয়ার অত্যন্ত বিপজ্জনক সামরিক উপস্থিতির চিত্র দেখা গেছে স্যাটেলাইটে। ৪০ মাইলের দীর্ঘ একটি সামরিক বহর ইউক্রেনের রাজধানী কিয়েভের উত্তর দিক ধরে এগিয়ে যাচ্ছে।
যে আগ্রাসী মনোভাব নিয়ে রাশিয়া তড়িৎগতিতে ইউক্রেনে সামরিক অভিযান শুরু করেছে, সেটি এখন কিছুটা ঝিমিয়ে পড়েছে।
তার মাঝে নতুন করে শত শত সামরিক যান নিয়ে কিয়েভের দিকে রুশ সৈন্যদের এই বহর নিয়েও নানা ধরনের গুঞ্জন তৈরি হয়েছে। বিশ্লেষকদের ধারণা, রাশিয়া হয়তো তার আগ্রাসনের কৌশল পাল্টে ফেলেছে।
বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, যে সামরিক বহর কিয়েভের দিকে এগোচ্ছে, তাতে সামরিক রসদ সরবরাহ ও সাঁজোয়া যান রয়েছে। রাজধানী ঘেরাও এবং পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন করে ফেলা অথবা পুরোমাত্রার আক্রমণ চালানোর জন্য এই সামরিক বহর ব্যবহার করা হতে পারে।
লন্ডনের শীর্ষস্থানীয় পলিসি ইনস্টিটিউট চ্যাথাম হাউসের রুশ যুদ্ধ বিশেষজ্ঞ ম্যাথিউ বুলেগু নিউইয়র্ক টাইমসকে বলেছেন, আমরা যা দেখছি তা মূলত দ্বিতীয় ধাপের কৌশল। এটি অত্যন্ত নৃশংস এবং অনিয়ন্ত্রিত যুদ্ধের দিকে গতি বদল। যা ইউক্রেনে পুরো পরিস্থিতিকে অনেক বেসামরিক হতাহত এবং রক্তাক্ত যুদ্ধের দিকে নিয়ে যাবে।
রাশিয়ার ওই সামরিক বহরের যথাযথ উদ্দেশ্য সম্পর্কে আগাম ধারণা করা কঠিন বলে সতর্ক করে দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। তারা বলেছেন, কিয়েভকে দেশটির উত্তরপূর্বাঞ্চল থেকে বিচ্ছিন্ন করে ফেলতে সাঁড়াশি অভিযান চালানোর জন্যও ওই বহরকে ব্যবহার করা হতে পারে। রাশিয়া প্রাথমিক কৌশল শেষে দ্বিতীয় স্তরের কৌশলে প্রবেশ করেছে বলে ধারণা করছেন বিশেষজ্ঞরা।
প্রাথমিক কৌশল অনুযায়ী, ক্রেমলিনের নেতারা ভুলভাবে ধরে নিয়েছিলেন যে, ইউক্রেনের সামরিক বাহিনী অত্যন্ত দক্ষ রুশ সামরিক বাহিনীর সাথে লড়াইয়ে দ্রুত পরাজয়ের সম্মুখীন হবে। এছাড়া বড় ধরনের প্রতিবন্ধকতা বা লড়াই ছাড়াই রাশিয়ার সৈন্যরা দ্রুত বড় বড় শহরগুলো দখল করতে পারবে। কিন্তু ইউক্রেনের সশস্ত্র বাহিনী এবং হাতে অস্ত্র তুলে নেওয়া নাগরিকদের কঠোর প্রতিরোধের মুখে প্রায় স্থবির হয়ে পড়েছে রাশিয়ার সামরিক বাহিনীর অভিযান।
রাশিয়ার সেই সামরিক বহর এখন কোথায় সেটি জানা কঠিন হয়ে পড়েছে। কারণ আকাশে প্রচণ্ড মেঘ থাকায় এই বহরের চিত্র স্যাটেলাইটে পরিষ্কারভাবে পাওয়া যাচ্ছে না। এছাড়া বহরের পথের বাড়িঘরে আগুন দেখা গেলেও আসলে সেখানে হামলা হয়েছে কিনা, তাও স্পষ্ট নয়।
বৃহস্পতিবার (৩ মার্চ) ভোরের আলো ফোটার আগেই ইউক্রেনের রাজধানীতে দফায় দফায় বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটেছে বলে জানিয়েছে ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম বিবিসি। মধ্যরাতে হওয়া এসব বিস্ফোরণের একটি ভিডিও সামনে এসেছে বলেও প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে।
বৃহস্পতিবার ভোরে ইউক্রেনের রাজধানী কিয়েভে কমপক্ষে চারটি বিস্ফোরণ হয়েছে। এরমধ্যে কিয়েভ শহরের কেন্দ্রে দু’টি শক্তিশালী বিস্ফোরণ ঘটেছে। এরপরে একটি মেট্রো স্টেশনের কাছে আরও দু’টি বিস্ফোরণ হয়। এসময় বিমান হামলার সতর্কতামূলক সাইরেনের শব্দও শোনা যায়।
এছাড়া কিয়েভে শক্তিশালী বিস্ফোরণের একটি ভিডিও সামনে এসেছে বলে জানিয়েছে বিবিসি। এতে রাতের আধারে কিয়েভে বিস্ফোরণের দৃশ্য উঠে এসেছে।
আরও পড়ুন...
কিয়েভের বাসিন্দাদের চলে যেতে বলছে রাশিয়া
থমকে গেছে রুশ সেনা বহর, দাবি যুক্তরাষ্ট্রের
তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ নিয়ে যে হুঁশিয়ারি দিলেন রুশ পররাষ্ট্রমন্ত্রী