‘তোমরা আইছো কারা? আমার পুতেরে (ছেলে) আইন্না দাও, কতো স্বপ্ন ছিলো নতুন ঘর উঠাইবে, এবার ছুটিতে আইয়া বিয়াও করবে। হেদিন ফোনে কইলো এবার আইয়া তোমারে লইয়া জাহাজ দেহামু (দেখামু)। মোর পুতের কোনো স্বপ্নই পূরণ হইলো না।’ ইউক্রেনের অলিভিয়া বন্দরে রাশিয়ার রকেট হামলায় নিহত হাদিসুর রহমানের শোকে এভাবে বিলাপ করছিলেন মা আমেনা বেগম। কান্না করতে করতে বারবার মূর্ছা যাচ্ছিলেন তিনি।
চলমান রাশিয়া ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে ইউক্রেনে আটকা পড়া বাংলাদেশি পণ্যবাহী জাহাজ এমভি বাংলার সমৃদ্ধিতে রকেট হামলায় প্রকৌশলী হাদিসুর রহমান আরিফ নিহত হয়েছেন। বাংলাদেশ শিপিং করপোরেশনের ওই জাহাজের থার্ড ইঞ্জিনিয়ার হিসেবে দায়িত্ব পালন করছিলেন তিনি। বাংলাদেশ সময় বুধবার (২ মার্চ) রাত সাড়ে ৯টার (ইউক্রেনের সময় বুধবার বিকেল ৫টা ১০ মিনিট) দিকে জাহাজের এক পাশে একটি মিসাইল এসে আঘাত হানে। এ সময় নিহত আরিফ জাহাজের ওপরেই ছিলেন।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, বরগুনার বেতাগী উপজেলার অবসরপ্রাপ্ত স্কুলশিক্ষক আবদুর রাজ্জাক ও গৃহিণী আমিনা বেগমের চার সন্তানের মধ্যে আরিফ দ্বিতীয়। ছোট বেলা থেকেই অদম্য মেধাবী ছিলেন আরিফ। এসএসসিতে জিপিএ ফাইভ এইচএসসিতে ৪. ৬০ নিয়ে পাস করেন তিনি। এরপর ২০১১ সালে বাংলাদেশ মেরিন একাডেমি চট্টগ্রামে ভর্তি হন তিনি। সেখান থেকে ৪৭ তম ব্যাচ হিসেবে শিক্ষাগত জীবন শেষ করেন তিনি। ২০১৩ সালে মেরিন ইঞ্জিনিয়ার হিসেবে চাকরিতে যোগদান করেন তিনি। এরপর বিভিন্ন জাহাজে দায়িত্ব পালন করেন তিনি। সবশেষ গত বছরের ১২ ডিসেম্বর এমভি বাংলার সমৃদ্ধিতে যুক্ত হন ২৯ বছর বয়সী এই তরুণ।
অসুস্থ মায়ের চিকিৎসা, নতুন ঘর নির্মাণসহ ভাইদের মানুষের মতো মানুষ করার স্বপ্ন দেখতেন এই তরুণ। বড় বোনের ইতিমধ্যে বিয়ে হলেও ছোট দুই ভাই এখনো অধ্যয়নরত রয়েছেন। তাদের পড়ালেখা শেষ করানোর পাশাপাশি নতুন জীবন সঙ্গী বাছাই করতে চেয়েছিলেন এবার ছুটেতে এসে। সেই স্বপ্ন অধরাই রয়ে গেল। সকলকে কাঁদিয়ে চিরনিদ্রায় এখন এই টগবগে তরুণ। পরিবারের উপার্জনক্ষম ব্যক্তিকে হারিয়ে দিশেহারা পরিবারের অন্য সদস্যরা।
বুধবার জাহাজ থেকে ছোট ভাই গোলাম মাওলা প্রিন্সকে ফোন করেন হাদিসুর রহমান। প্রিন্সর সঙ্গে কথা বলার সময় হাদিসুরের প্রান্তে একটি বিকট শব্দ হওয়ার পর হাদিসুর রহমানের সংযোগটি বিচ্ছিন্ন হয়। এরপর বারবার চেষ্টা করেও আর সংযোগ স্থাপন করা সম্ভব হয়নি।
হাদিসুর রহমানের ছোট ভাই গোলাম মাওলা প্রিন্স বলেন, গোলার আঘাত হানার সময় বড় ভাই বাইরে এসে মুঠোফোনে আমাকে ফোন দিয়েছিলেন। তবে হঠাৎ একটি গোলা এসে পড়ে জাহাজটিতে। বিকট শব্দের কারণে কিছুই শুনতে পাইনি। আমার ভাই এবার বাড়ি ফিরে বিয়ে করার কথা ছিল। আমাদের সব শেষ। একমাত্র আয়ের মাধ্যম ছিল আমার ভাই। আমরা কীভাবে বাঁচব।
মেজ ভাই তরিকুল ইসলাম তারেক বলেন, আমার ভাই আমাদের পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি। তাকে হারিয়ে আমরা এখন অসহায় হয়ে পড়েছি। আমরা কি করব? আমাদের কি হবে কিছুই বলতে পারি না।
বেতাগী উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান মাকসুদুর রহমান ফোরকান বলেন, আরিফ আমার চাচাতো ভাইয়ের ছেলে। ছোট বেলা থেকেই সে ছিল শান্ত স্বভাবের। স্বপ্ন দেখতে ভালোবাসত ছেলেটা। এই অল্প বয়সে ওর মৃত্যু কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় না। আমরা আশাবাদী সরকারের সংশ্লিষ্ট মহল এই পরিবারটির পাশে দাঁড়াবে।
বেতাগীর সহকারী কমিশনার ভূমি ফারহানা ইয়াসমিন বলেন, বরগুনার জেলা প্রশাসক ও বেতাগী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার নির্দেশে আমি নিহতের বাড়ি গিয়ে তাদের খোঁজ খবর নিয়েছি। জেলা প্রশাসন ও উপজেলা প্রশাসন তাদের পাশে থাকবে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
প্রসঙ্গত, জাহাজটি ইউক্রেনের বন্দর থেকে পণ্য ভর্তি করে ইতালির বন্দরে যাওয়ার কথা ছিল। কিন্তু যুদ্ধ শুরু হয়ে যাওয়ায় ওই বন্দর থেকে পণ্য লোডিং কাজ বাতিল করা হয়। এ কারণে জাহাজটি ইউক্রেনের অলভিয়া বন্দরে নোঙর করে রাখা হয়। জাহাজটি গত ২১ ফেব্রুয়ারি খালি অবস্থায় তুরস্কের এরেগলি বন্দর থেকে অলভিয়া বন্দরের উদ্দেশে ছেড়ে যায়। গত ২২ ফেব্রুয়ারি এমভি বাংলার সমৃদ্ধি ইউক্রেনের অলভিয়া বন্দরে পৌঁছে। এর মধ্যে রাশিয়া ইউক্রেন যুদ্ধ শুরু হলে পরিকল্পনা বাতিল করা হয়। পরে ছাড়পত্র পেতে দেরি হওয়ায় আন্তর্জাতিক জলসীমা যেতে ব্যর্থ হলে জাহাজটি আটকা পড়ে অলভিয়া বন্দরে। সেই সঙ্গে জাহাজে আটকা পড়েন ক্যাপ্টেন জি এম নুর ই আলম, চিফ ইঞ্জিনিয়ার ওমর ফারুকসহ ২৯ বাংলাদেশি নাবিক। ইউক্রেনে হামলা শুরুর সপ্তম দিনে বাংলাদেশি জাহাজটিতে গোলার আঘাতের ঘটনা ঘটল। সমুদ্রগামী জাহাজ বাংলার সমৃদ্ধি ২০১৮ সালে বিএসসির বহরে যুক্ত হয়।