সিপিবি-বাসদের নেতৃত্বে বদল কী পরিবর্তন আনবে বাম রাজনীতিতে

বামপন্থী রাজনীতি বাংলাদেশে তাদের অবস্থান বেশি একটা সন্তোষজনক অবস্থায় তৈরি করতে পারেনি। দেশের বামপন্থী দলগুলোর মধ্যে দীর্ঘদিন একই নেতৃত্ব, কম জনসম্পৃক্ত সাংগঠনিক তৎপরতা এবং আর্থসামাজিক-ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে মূলত তাদের এমন নড়বড়ে অবস্থা বলে মনে করেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা।

দেশের বামপন্থী রাজনৈতিক সংগঠনগুলোর মধ্যে অন্যতম দুটো বাংলাদেশ কমিউনিস্ট পার্টি (সিপিবি এবং বাংলাদেশ সমাজতান্ত্রিক দল (বাসদ)। এই দল দুটির নেতৃত্বে সম্প্রতি পরিবর্তন এসেছে।

সিপিবির দীর্ঘ এক দশক ধরে দায়িত্বে ছিলেন মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম। তিনি ২০১২ সালে দলের কাউন্সিলের মাধ্যমে প্রথম সভাপতি নির্বাচিত হন এরপরে ২০১৬ সালেও একই পদে নির্বাচিত হন। এ বছরের ফেব্রুয়ারিতে হওয়া কাউন্সিলে তাকে তৃতীয়বারের মতো সভাপতি রাখতে প্রস্তাব রাখা হয় কিন্তু সেই প্রস্তাবনা নাকচ হয়। ফলে দায়িত্ব থেকে সরে আসেন তিনি। তার স্থলাভিষিক্ত হন তার সঙ্গে সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করা মোহাম্মদ শাহ আলম।

অন্যদিকে বাসদের জন্মের পর থেকেই দায়িত্বে ছিলেন খালেকুজ্জামান। ১৯৮০ সালে জাসদ ভেঙে বাসদ গঠন করা হলে তিনি প্রথম আহ্বায়ক হন। পরে ২০০৯ সালে কাউন্সিলের মাধ্যমে সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন। সম্প্রতি কাউন্সিলে তিনিও দায়িত্ব থেকে সরে আসেন। সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব গ্রহণ করেন বজলুর রশীদ ফিরোজ।

এই দুই বাম ঘরানার দলের নেতৃত্বের পরিবর্তনকে ঘিরে নানা জল্পনাকল্পনা তৈরি হয়। অনেকে ভাবছেন বাম রাজনীতির হয়তো ইতিবাচক কোনো পরিবর্তন হতে যাচ্ছে। এই সব আলাপ-আলোচনাকে ধরে দেশ রূপান্তর কথা বলেছেন কয়েকজন বিশিষ্ট বাম তাত্ত্বিক, রাজনৈতিক ব্যক্তির সঙ্গে।

তাদের কাছে জানতে চাওয়া হয়েছে, নেতৃত্বের এই বদল কতটা ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে। বা জনগণের কাছে গ্রহণযোগ্যতা বাড়িয়ে তুলবে কিনা।

এই সব বিষয়ে কথা বলতে যোগাযোগ করা হয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইমেরিটাস অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরীর সঙ্গে। তিনি এ বিষয়ে এখনই মন্তব্য করতে চাননি। তিনি বলেছেন, যারা নতুন দায়িত্বে এসেছেন তাদের সবাইকে চিনি, জানি। আপাতত অবজারভেশন করছি; তাদের কাজকর্ম, তৎপরতা লক্ষ করি, তারপরে মন্তব্য করব।

মন্তব্য করতে রাজি না হলেও তিনি নতুন নেতৃত্বকে স্বাগত ও শুভকামনা জানান।

একই ধরনের মতামত জানতে যোগাযোগ করা হয় অর্থনীতিবিদ ও জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক আনু মুহাম্মদের সঙ্গে। তিনি বলেছেন, নতুন নেতৃত্ব যেকোনো সংগঠনের জন্য ইতিবাচক বিষয়। এতে সংগঠনের গতিশীলতা বাড়ে। সিপিবি ও বাসদ যেহেতু রাজনৈতিক দল তাদের কাজের গতিশীলতা আরো বেশি জরুরি। নতুন যারা দায়িত্বে আসলেন তাদের বিষয়ে এখনই কোনো মন্তব্য করা ঠিক হবে না। তবে, আমরা আশা করব জনসম্পৃক্ত কর্মসূচি দিয়ে তারা দলকে আরো মানুষের কাছে পৌঁছে দেবেন। আর তাদের আগের নেতৃত্বরা বুদ্ধিবৃত্তিক পরামর্শ ও অভিজ্ঞতা শেয়ারের মাধ্যমে এগিয়ে নেবে। এমনটাই প্রত্যাশা করি।

তবে, ইতিবাচক পরিবর্তনের আলাপকে নাকচ করে দিয়েছেন জ্যেষ্ঠ বাম রাজনৈতিক হায়দার আকবর খান রনো।

তিনি জানান, শারীরিক অবস্থার কারণে তিনি সবকিছুর খোঁজ খবর রাখতে পারছেন না। সার্বক্ষণিক তাকে অক্সিজেন নিয়ে থাকতে হয়। বাসদের নতুন নেতৃত্বের কথা তিনি এখনো শোনেননি।

নতুন নেতৃত্ব নিয়ে তাকে অবগত করা হলে, তিনি বলেন, নতুন নেতৃত্বের ফলে বাম রাজনীতির কোনো ধরনের পরিবর্তন আসবে বলে আমি মনে করি না। এটা একটা স্বাভাবিক প্রক্রিয়া। বাসদের বিষয়টা জানি না। সিপিবির বদল হয়েছে কনস্টিটিউশন মেনেই। আর একই নেতৃত্ব বছরের পর বছর থাকলে একসময় দেখা যাবে কয়েকজন বুড়ো মিলে কমিটি দিয়ে বসে আছে। আর সব মিইঁয়ে গেছে। কাজেই নতুন ব্লাড দরকার। আমি মনে করি এই শতাব্দীতেই বাম রাজনীতি নতুন ফরম্যাটে পুনর্জীবন পাবে। সকলের জন্য শুভকামনা। তারা আরো বেশি জনসম্পৃক্ত কর্মকাণ্ডে নিয়োজিত থাকবে এমনটাই প্রত্যাশা।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ও রাষ্ট্রচিন্তাবিদ আবুল কাশেম ফজলুল হকের মন্তব্যও প্রায় একই রকমের। তবে তিনি জানান, আহামরি কোনো পরিবর্তন করতে না পারলেও নতুন নেতৃত্ব যদি ভালো কিছু করে তবে আমরা আনন্দিত হব। রাজনৈতিক প্রোগ্রাম কর্মসূচিতে তাদের গতিশীলতা যদি বাড়ে, মানুষের আগ্রহ তৈরি করতে সক্ষম হয় তবে এটি হবে আমাদের জন্য আনন্দের।

তিনিও নতুন নেতৃত্বকে স্বাগত জানান।

 

 

নতুন নেতৃত্বের কাছে কী ধরনের প্রত্যাশা, কেন তাদের হাতে দায়িত্ব দিলেন এমন বিষয়ে জানতে সিপিবির গত কমিটির সভাপতি মুজাহিদুল ইসলাম সেলিমের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে, তিনি দেশ রূপান্তরকে এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য দিতে রাজি হননি।

একই বিষয়ে বাসদের বিদায়ী সাধারণ সম্পাদককে ফোন করা হলে তিনি জানান তিনি একটি মিটিংয়ে আছেন, পরের দিন কথা বলবেন।

সিপিবির নতুন নেতৃত্বে এসেছেন মোহাম্মদ শাহ আলম। ২০১৬ সালের একাদশ কংগ্রেসের সাধারণ সম্পাদক আবু জাফর আহমদ মারা গেলে পার্টির সাধারণ সম্পাদক হন তিনি।

তিনি ছাত্র ইউনিয়নের চট্টগ্রাম জেলা সংসদের সভাপতি ছিলেন। মুক্তিযুদ্ধেও সক্রিয়ভাবে অংশ নিয়েছিলেন। সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পর কমিউনিস্ট পার্টির যে কয়জন কেন্দ্রীয় নেতা দল রক্ষার পক্ষে ছিলেন, শাহ আলম তাদের অন্যতম। পরে তিনি চট্টগ্রাম জেলা সিপিবির সাধারণ সম্পাদক ও সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন। গণসংগঠন কৃষক সমিতিতে দীর্ঘদিন কাজ করার পর সিপিবির প্রেসিডিয়ামে আসেন তিনি, পরে সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পান।

তার কাছে জানতে চাওয়া হয়েছে, দীর্ঘ সময় মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। এখন আপনি দায়িত্ব নিলেন। আপনার মাধ্যমে কী ধরনের বদল ঘটবে, দলের বা কী ধরনের কার্যক্রম গ্রহণ করবেন। আরো বেশি মানুষকে সম্পৃক্ত করতে নতুন নেতৃত্বের পরিকল্পনা কী?

এসব প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, আমরা একটু নীতিগত জায়গায় পরিবর্তনের চিন্তা করেছি। আগের মতো ৫০-৬০ জন নিয়ে কর্মসূচি পালনের কোনো ইচ্ছে নেই। মানুষের সব ধরনের অধিকার নিয়ে সক্রিয় থাকব। শ্রমিকদের নিয়ে, কৃষকদের নিয়ে, ছাত্রদের নিয়ে আমরা কাজ করার কথা ভাবছি। এ ধরনের ভাবনাগুলো আগে থেকেই ছিল; কিন্তু কথায় আর সীমাবদ্ধ থাকব না। এখন মাঠে নেমে কাজ করব। ক্ষমতার চেয়ে মানুষের অধিকার আদায়ের লড়াইটাকে ত্বরান্বিত করাই আমাদের মুখ্য এজেন্ডা। ইতিমধ্যে আমরা ১০ মার্চ থেকে ১৬ মার্চ পর্যন্ত দ্রব্যমূল্যের দাম বৃদ্ধির বিষয়ে কর্মসূচি গ্রহণ করেছি। আশা করছি, আমরা মানুষের পক্ষে, মানুষের চাওয়াটাকে বাস্তবায়ন করতে পারব। মানুষ পরিবর্তন চায়, কিন্তু উপযুক্ত প্ল্যাটফর্ম পাচ্ছে না, আমরা মানুষের ভরসার জায়গাটা তৈরি করতে চাই।

একই বিষয়গুলো নিয়ে জানতে চাওয়া হয়েছে বাসদের নতুন কমিটির সাধারণ সম্পাদক বজলুর রশীদ ফিরোজের কাছে।

দলের শুরু থেকেই খালেকুজ্জামান নেতৃত্বে ছিলেন, এবার তিনি আসলেন, তার কাছে প্রত্যাশাটা কেমন রাখা যেতে পারে? এমন প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, দলের প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন খালেকুজ্জামান। তিনি অনেক দিন ধরেই নেতৃত্বের পরিবর্তন চাচ্ছিলেন। শুরুতে আহ্বায়ক ছিলেন, পরে সাংবিধানিকভাবে দলের সাধারণ সম্পাদক পদ তৈরি হলে তিনি দায়িত্ব গ্রহণ করেন। এরপর একাধিকবার নেতৃত্বের পরিবর্তন করতে চাইলেও ভাঙনের কারণে সেটি সম্ভব হয়নি। আমরা এর মধ্যে জেলা উপজেলা বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে দলকে সংগঠিত করতে কাজ করেছি। ২০২২ সালে এসে মনে হয়েছে এখন কাউন্সিল দেয়া যায়। তাই আমরা কাউন্সিল দিয়ে নতুন নেতৃত্বকে নির্বাচন করি।

তিনি আরো বলেন, বাসদ অন্য কোনো বামপন্থা দলের মতো নয়। মার্কসবাদকে আদর্শ হিসেবে মেনে আমরা দেশের ভেতরে এর প্রয়োগ যেমন হওয়া দরকার তেমনভাবে তৈরি করেছি। সংগঠনের গতিশীলতা আমাদের ধারাবাহিকভাবে আছে। সেটিকে আরো শক্তিশালী করার বিষয়ে কাজ করব। খালেকুজ্জামান আগে যেমন সক্রিয় ছিলেন এখনো তেমনি সক্রিয় থাকবেন।