প্রতিটি গল্পই জাদুকর বানশালির

শতবর্ষী বলিউডে গুণী ও সফল নির্মাতার সংখ্যা অগণিত। হালের নির্মাতাদের এমনই একজন সঞ্জয় লীলা বানশালি। নব্বই দশকে মাসালা সিনেমার রমরমা যুগে অভিষেকেই ভিন্ন ধারার গল্প ও নির্মাণ নিয়ে আলোচনায় আসেন। পরবর্তীতে একের পর এক চমকে দেওয়া কনটেন্ট ও বিশাল ক্যানভাসের নির্মাণ তাকে দেয় স্থায়ী আসন। নয়টি নান্দনিক সিনেমা উপহার দেওয়ার পর নিজের দশম সিনেমা ‘গাঙ্গুবাই কাঠিয়াওয়াড়ি’ দিয়ে আবারও সাফল্য ও প্রশংসায় ভাসছেন এই জাদুকর।

বানশালির সিনেমা এক স্বপ্নের জগতের নিয়ে যায় দর্শকদের, যা স্বপ্ন হলেও জীবনের অংশ হয়ে উঠতে সময় নেয় না। তার প্রতিটা সিনেমা যেন এক-একটি নান্দনিক শিল্পকর্ম। অ্যাকশন, থ্রিলার বা সাসপেন্স নির্ভর ইন্ডাস্ট্রিতে তিনি নিজস্ব ঘরানায় অনুগামী। তার নির্মাণ মনে করিয়ে দেয় ভি শান্তারাম, রাজ কাপুর, গুরু দত্ত, কে আসিফ, মনমোহন দেশাই বা বিমল রায়ের মতো অগ্রজদের। বানশালি সেই ঐতিহ্যের সঙ্গে নিজের বিরল সৃজনশীলতার মেলবন্ধন ঘটান।  

বানশালির সিনেমায় মানবিক সম্পর্ক, জাতপাত, ফেলে আসা সময়, সংস্কৃতির সঙ্গে নারীর দৃষ্টিকোণ দিয়ে জীবনের টানাপোড়েন ওঠে আসে। তার ট্রেডমার্ক ব্যয়বহুল সেট, নজরকাড়া কস্টিউম, ফ্রেমিং, অসাধারণ সংগীত, চোখ ধাঁধানো কোরিওগ্রাফি ও দক্ষ অভিনয়শিল্পীদের নিয়ে বিয়োগান্ত পরিণতি! এ ক্যারিশমাটিক জার্নি সোনালি অক্ষরে লেখার মতো।

তার প্রতিটি সিনেমার পেছনে আছে বাস্তব বা কল্পনা নির্ভর কোনো না কোনো উপন্যাস। যা সেলুলয়েডে এতই জীবন্ত হয়ে ওঠে যে একান্ত বানশালির গল্প হয়ে যায়। জাদুকর বানসালির! 

তার সিনেমায় ইতিহাস বিকৃতি নিয়েও অনেক সময় অভিযোগ উঠে, সিনেমার নাম পরিবর্তন, সেটে রক্ষণশীল গোষ্ঠীর আক্রমণ বা সিনেমার মুক্তিতে বাধা দিতে উচ্চ আদালতে মামলা, অভিনয়শিল্পীদের মাথা কেটে আনতে জন্য পুরস্কার ঘোষণা— কত কিছুই তো বলা যায়। তবে বানশালি বরাবরই বলেছেন, তিনি সিনেমা বানান ফিকশন হিসেবে। এখানে ইতিহাস বদলের কিছু নাই আর ফিকশনে নির্মাতার স্বাধীনভাবে গল্প উপস্থাপনের সুযোগ থাকা উচিত।

১৯৬৩ সালের ২৪ ফেব্রুয়ারি ভারতের মুম্বাইয়ে জন্ম সঞ্জয় লীলা বানশালির। তার বাবা চলচ্চিত্র নির্মাতা নবীন বনশালি ও মাতা লীলা বনশালি। নিজের নামের ’লীলা’ অংশটি মায়ের কাছ থেকে নিয়েছেন সঞ্জয়। তার কর্মজীবন শুরু পরিচালক বিধু বিনোদ চোপড়ার সহকারী হিসেবে। কাজ করেন বিধুর পারিন্দা, ১৯৪২: এ লাভ স্টোরি ও কারিব সিনেমায়। ১৯৯৬ সালে ‘খামোশি: দ্য মিউজিক্যাল’ দিয়ে পরিচালক হিসেবে আবির্ভূত হন সঞ্জয় লীলা বানশালি।

‘বিয়ন্ড সাইলেন্স’ নামক উপন্যাস অবলম্বনে ‘খামোশি’ নির্মাণ করেছিলেন নির্মাণ করেছিলেন তিনি। অন্ধ ও বধির বাবা-মা (নানা পাটেকর ও সীমা বিশ্বাস) এবং তাদের কন্যা (মনীষা কৈরালা)-র গল্প নিয়েই এই সিনেমা। সঙ্গে ছিলেন বন্ধু সালমান খান। নানা, মনীষা ও সীমার অসাধারণ অভিনয় সিনেমাটিকে আলাদা মাত্রা দেয়। ‘আজ ম্যায় উপার’-এর মতো স্মরণীয় এ ছবির প্রাণ। বক্স অফিসে সফল না হলেও সমালোচকদের প্রশংসা পেয়েছিল সিনেমাটি।

দ্বিতীয় সিনেমা ১৯৯৯ সালের এপিক লাভ স্টোরি ‘হাম দিল দে চুকে সানাম’, যা বানশালিকে ক্যারিয়ারে আনে রাজসিক উত্থান। এই সিনেমা দিয়ে ঐশ্বরিয়া রাই বচ্চন জনপ্রিয়তার শিখরে পৌঁছে যান। নিজেদের সেরাটা দিয়েছেন সালমান খান ও অজয় দেবগন। সব মিলিয়ে এই সিনেমা বানশালির অন্যতম সেরা কাজ।

শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের অমর উপন্যাস ‘দেবদাস’ নিয়ে এর আগে বলিউডে দুটি ক্ল্যাসিক কাজ হলেও বানশালি ২০০২ সালে ইন্ডাস্ট্রির সবচেয়ে ব্যয়বহুল সিনেমা নিয়ে হাজির হন। অনেকের মতে, ৬০ কোটি রুপি ব্যয়ে নির্মিত ‘দেবদাস’ এখন পর্যন্ত বানসালির সেরা সিনেমা। শাহরুখ, ঐশ্বরিয়া ও মাধুরীর ‘দেবদাস’ও পেয়ে যায় ক্ল্যাসিকের স্বীকৃতি। বক্স অফিস, সাধারণ দর্শক থেকে সমালোচক সবার মন জয় করে ছবিটি। কান ফিল্ম ফেস্টিভ্যালেও প্রদর্শিত হয় এই ম্যাগনাম ওপাস।

হেলেন কিলারের আত্মজীবনী ‘দ্য স্টোরি অব মাই লাইফ’ অবলম্বনে ২০০৫ সালে রানি মুখার্জি ও অমিতাভ বচ্চনকে নিয়ে বানশালি বানালেন ‘ব্ল্যাক’। না, এই সিনেমায় তার ট্রেডমার্ক গান, কস্টিউম বা প্রেম কাহিনি নেই; আছে এক অন্ধ এবং এক বোবা মেয়ের কাহিনি। নির্মাতা হিসেবে বানশালির কারিশমা তুলে ধরে ছবিটি। বলিউডের তথাকথিত বাণিজ্যিক সিনেমার গতিতে যোগ করে এক ভিন্নধারা।

ফিওদর দস্তয়েভস্কির ছোটগল্প ‘হোয়াইট নাইটস’ অবলম্বনে ২০০৭ সালে বানশালি নির্মাণ করেন ‘সাওয়ারিয়া’। বলিউডের দুই প্রভাবশালী পরিবারের নতুন প্রজন্মের সদস্য রণবীর কাপুর ও সোনম কাপুর অভিষেক ছবি এটি। তবে আইডেনটিক্যাল ব্লু সেট এবং গল্প পুরোপুরিভাবে রিলেট না করার কারণে দর্শকের কাছে এই সিনেমা গ্রহণযোগ্যতা পায়নি। বানশালির ক্যারিয়ারের সবচেয়ে দুর্বল সিনেমা বলা হয় একে। তবে রানি মুখার্জির শক্তিশালী উপস্থিতি সিনেমার একমাত্র প্রশংসিত দিক। চমক হিসেবে ছিলেন সালমান খান।

১৯৮১ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত ‘হুজ লাইফ ইজ ইট অ্যানিওয়ে’ থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে ২০১০ সালে হৃতিক রোশন ও ঐশ্বরিয়া রাইকে নিয়ে বানশালি বানালেন ‘গুজারিশ’। প্যারাপ্লেজিকে আক্রান্ত এক সময়ের জনপ্রিয় জাদুকরের চরিত্রে হৃতিক অসাধারণ অভিনয় করেন। সঙ্গে সুন্দরী নার্স হিসেবে ঐশ্বরিয়াও মাথা ঘুরিয়ে দেন। দুঃখজনকভাবে শৈল্পিক সিনেমাটি এখন অনেকের কাছে ক্ল্যাসিক হিসেবে সমাদৃত হলেও বক্স অফিসে ছিল ফ্লপ। তবে এটাই সঞ্জয়ের শেষ ফ্লপ।

২০১৩ সালে উইলিয়াম শেক্সপিয়ারের বিখ্যাত নাটক ‘রোমিও অ্যান্ড জুলিয়েট’-এর আধুনিক রূপায়ণ ‘গোলিয়ো কি রাসলীলা— রামলীলা’ মুক্তি পায়। স্টারডমের শীর্ষে ওঠার আগে দীপিকা পাড়ুকোনের প্রথম অভিনয় সমৃদ্ধ সিনেমা এটি। সঙ্গে রণবীর সিং-এর মধ্যে বলিউড পেয়ে যায় আরেক তারকার সন্ধান। জুটি হিসেবে তাদের সফল যাত্রার শুরু, যা পরবর্তীতে প্রেম ও পরিণয়ে গড়ায়। দুই পরিবারের শত্রুতা, অস্ত্র ব্যবসা, প্রেম ও বিয়োগান্ত পরিণতি সবকিছুই ছিল এই সুপারহিট সিনেমায়। আর দীপিকার মা চরিত্রে সুপ্রিয়া পাঠক ছিলেন বাড়তি চমক।

নাগনাথ এস ইনামদারের ‘রাউ’ উপন্যাস মাথায় রেখে মারাঠা সাম্রাজ্যের বীর পেশওয়া বাজিরাও বল্লার এবং তার দ্বিতীয় স্ত্রী মাস্তানির প্রেমের গল্প তুলে ধরা হয়েছে ‘বাজিরাও মাস্তানি’ সিনেমায়। ২০১৫ সালের এ সিনেমায় আবারও জুটি রণবীর-দীপিকা। বাজিরাওয়ের প্রথম স্ত্রী কাশীবাঈয়ের ভূমিকায় ছিলেন প্রিয়াঙ্কা চোপড়া ও মায়ের চরিত্রে তানভী আজমি। এক কথায় সবাই ছিলেন অনবদ্য। এই ছবি নিয়েও বাজিরাওয়ের অনুসারী শুরুতে আপত্তি তোলেন।

২০১৮ সালে মালিক জ্যায়সীর লোকগাথা নির্ভর কবিতা ‘পদ্মাবতী’ অবলম্বনে সঞ্জয় লীলা বানশালি উপহার দেন আরেক ম্যাগনাম ওপাস ‘পদ্মাবত’। শুরুতে ছবির নাম ‘পদ্মাবতী’ থাকলেও রাজপুতদের আপত্তিতে নাম পরিবর্তন হয়। রণবীর-দীপিকা এবং বানশালির এ হ্যাটট্রিক সিনেমায় আরও ছিলেন শহীদ কাপুর। মহারানা রাওয়াল রতন সিং চরিত্রে শহীদ, তার দ্বিতীয় স্ত্রী মহারানি পদ্মাবতী চরিত্রে দীপিকা  সুলতান আলাউদ্দিন খিলজি চরিত্রে রণবীর সেলুলয়েডে যে মহাকাব্য রচনা করেছিলেন তার আবেদন এখনো অটুট। অবশ্য শুরুতে ঝামেলা তৈরি করা ব্যক্তিরা এই গল্পে বিকৃতি না পেলেও ইতিহাসবিদরা খিলজির বিকৃত চরিত্রায়ণ নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। এই সিনেমার মধ্য দিয়ে দীপিকা সহশিল্পীদের থেকে বেশি পারিশ্রমিক নিয়ে রেকর্ড গড়েন।

‘পদ্মাবত’ রিলিজের পর করোনায় বারবার পিছিয়ে তিন বছরের বিরতি শেষে গত ২৫ ফেব্রুয়ারি মুক্তি পায় সঞ্জয় লীলা বানশালির দশম সিনেমা ‘গাঙ্গুবাই কাঠিয়াওয়াড়ি’। গুজরাট থেকে প্রেমিকের হাত ধরে পালিয়ে আসা ও পরিস্থিতির স্বীকার হয়ে দেহ ব্যবসায় নাম লেখানো গঙ্গা কাহিনি এ ছবি। এ সময় দেহ ব্যবসায় জড়িত নারী ও তাদের সন্তানদের অন্ধকার জীবনে আলো হয়ে আসে গঙ্গা। বিখ্যাত আজাদ ময়দানে রাজনৈতিক নেতাদের মাঝে নিজের দাবি জানিয়ে ভাষণ দেওয়া থেকে কামাথিপুরার ম্যাডামজি গাঙ্গু হওয়ার গল্প আলিয়া ভাট  এতটাই প্রাণবন্ত ভাবে তুলে ধরলেন যে, প্যান্ডামিকের পরে বলিউডে চাঙা করার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা এই সিনেমার। পঞ্চাশ ও ষাট দশকের প্রেক্ষাপটে সত্য কাহিনি অবলম্বনে নির্মিত এই সিনেমার মূল আকর হুসেন জাইদির বই ‘মাফিয়া কুইনস অব মুম্বাই’। স্বজনপোষণসহ নানা ইস্যু নিয়ে দুই ভাগ হওয়া ইন্ডাস্ট্রিতে সকল প্রশ্নের জবাব ছিল এ ছবি।

বানশালির প্রতিটা সিনেমাই আমাদের জীবনের ভিন্ন দিক দেখিয়েছে বারবার। প্রেম বা সম্পর্কের নানা সমীকরণ বিশ্বাসযোগ্যভাবে পর্দায় উপস্থাপন করেন তিনি। অশ্লীলতা বা কোনো রকম ভায়োলেন্স তার সিনেমায় জায়গা করতে পারেনি। নারী চরিত্রের অনালোকিত দিকগুলো তুলে এনেছেন তিনি। যাদের অভিব্যক্তি, চাহনি, সংলাপ তৈরি করেছে স্বতন্ত্র অবস্থান। তবে তাই বলে অভিনেতাদের ক্ষেত্রেও ডাইমেনশন রাখেননি তা বলতে পারবেন না তার ঘোর শত্রুও।

বদলে যাওয়া সময়, দর্শকদের রুচি বা ভিন্ন ভিন্ন ঘরানার কাজের ভিড়েও বানশালি বলিউডের ঐতিহ্যকে নিজের ট্রেডমার্কের ভেতর যেভাবে ধারণ করেছেন তা অবিশ্বাস্য। যা তাকে অমর করবে বলিউডের ইতিহাসে।