মাঝেমধ্যে মানুষের ওপর নানা প্রকার দুঃখ-দুর্দশা, দুর্ভোগ ও বিপর্যয় আসে; এগুলো মূলত তাদের কর্মফলের কিঞ্চিৎ বহিঃপ্রকাশ। কিন্তু আল্লাহতায়ালা মানুষের ওপর ন্যূনতম জুলুম করেন না, সাধ্যাতীত কোনো বিষয় চাপিয়েও দেন না। তবে তারা যখন ক্রমাগত আল্লাহর অবাধ্যতা ও নাফরমানিতে লিপ্ত হতে থাকে, তখন তিনি তাদের সাময়িক দুঃখ-কষ্ট ও বিপদের মুখোমুখি দাঁড় করান; যাতে তারা পুনরায় তার দিকে ফিরে আসে। পবিত্র কোরআনে এমন কিছু বর্ণনা এসেছে যেখানে প্রধানত মানুষের কৃতকর্মই তাদের দুর্ভোগ ও দুর্বিষহ জীবনের জন্য দায়ী। এখানে এমন কিছু দুর্ভোগের কারণ উল্লেখ করা হলো।
নামাজে উদাসীনতা : ইমানের পর মানুষের ওপর সর্বপ্রথম আবশ্যিকভাবে নামাজের হুকুম অর্পিত হয়। আল্লাহর সমীপে নিজেকে সঁপে দেওয়ার উৎকৃষ্টতম মাধ্যম নামাজ। নামাজ মুমিন জীবনের সফলতা ও মুক্তির চাবিকাঠি। কোরআন-হাদিসে নামাজের বহুবিধ কল্যাণ ও উপকারিতার কথা বর্ণিত হয়েছে। নামাজ মানুষকে যাবতীয় অশ্লীল ও মন্দকাজ থেকে বিরত রাখে, অশান্ত মনে স্বস্তি ও প্রশান্তি আনে। তবে তার জন্য পূর্বশর্ত নামাজ হতে হবে বিনয়-নম্রতা ও ধীর স্থিরতার সঙ্গে এবং যথাযথ নিয়ম মেনে। নামাজে অন্যমনস্ক ও উদাসীন ব্যক্তি, নামাজের প্রভূত কল্যাণ ও উপকারিতা থেকে বঞ্চিত হয়; অধিকন্তু এ নামাজ তার জন্য দুর্ভোগ ও দুর্দশার কারণ হয়ে দাঁড়ায়। আল্লাহতায়ালা বলেন, ‘অতএব, দুর্ভোগ সেসব নামাজির, যারা তাদের নামাজ সম্পর্কে বে-খবর; যারা তা লোক দেখানোর জন্য করে।’ সুরা মাউন : ৪-৬
সামনে-পেছনে নিন্দাকারী : নিন্দা ইসলামে অত্যন্ত গুরুতর অপরাধ; চাই তা পেছনে হোক কিংবা সামনে। সামনে ও পেছনে নিন্দাকারীদের শাস্তি সম্পর্কে আল্লাহতায়ালা বলেন, ‘দুর্ভোগ তাদের জন্য, যারা পশ্চাতে ও সম্মুখে লোকের নিন্দা করে। ... অবশ্যই তারা ‘হুতামাতে’ (জাহান্নামে) নিক্ষিপ্ত হবে। তুমি কি জানো হুতামা কী? তা আল্লাহর প্রজ্বলিত অগ্নি, যা হৃদয়কে গ্রাস করবে। নিশ্চয় বেষ্টন করে রাখবে, দীর্ঘায়িত স্তম্ভগুলো।’ সুরা হুমাজাা : ১-৯
কোরআনে করিমের অন্যত্র ইরশাদ হয়েছে, ‘যে অধিক শপথ করে, যে লাঞ্ছিত, আপনি তার আনুগত্য করবেন না। যে পশ্চাতে নিন্দা করে একের কথা অপরের কাছে লাগিয়ে বেড়ায়, যে ভালো কাজে বাধা দেয়, সে সীমালঙ্ঘন করে, সে পাপিষ্ঠ।’ সুরা আল কলম : ১০-১২
সামনে নিন্দাকারীদের সম্পর্কে হজরত রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘আল্লাহর বান্দাদের মধ্যে নিকৃষ্টতম তারা, যারা পরোক্ষ নিন্দা করে, বন্ধুদের মধ্যে বিচ্ছেদ সৃষ্টি করে এবং নিরপরাধ লোকদের দোষ খুঁজে ফিরে।’ সুনানে আহমাদ
মাপে কম দেওয়া : নিজের পাওনা বুঝে নেওয়া যেমন বিক্রেতার দায়িত্ব, তেমনি ক্রেতাকে তার প্রাপ্য বুঝিয়ে দেওয়ার বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ। এক্ষেত্রে অনেকে নানা মন্দ কৌশল ও ছলচাতুরীর আশ্রয় নিয়ে থাকে; যা কখনোই কাম্য নয়। ইসলামে এমন কাজ অবৈধ এবং এ জাতীয় কাজের সঙ্গে যারা জড়িত, তাদের ব্যাপারে কঠিন হুঁশিয়ারি উচ্চারিত হয়েছে। আল্লাহতায়ালা বলেন, ‘যারা মাপে কম করে, তাদের জন্য দুর্ভোগ, যারা লোকের কাছ থেকে যখন মেপে নেয়, তখন পূর্ণ মাত্রায় নেয় এবং যখন লোকদের মেপে দেয় কিংবা ওজন করে দেয়, তখন কম করে দেয়। তারা কী চিন্তা করে না যে, তারা পুনরুত্থিত হবে সেই মহা দিবসে, যেদিন মানুষ দাঁড়াবে বিশ্ব পালনকর্তার সামনে। এটা কিছুতেই উচিত নয়, নিশ্চয়ই পাপাচারীদের আমলনামা সিজ্জিনে আছে। আপনি জানেন, সিজ্জিন কী? এটা লিপিবদ্ধ খাতা।’ সুরা তাতফিফ : ১-৯
বর্ণিত আয়াতের ব্যাখ্যায় মুফাসসিররা বলেন, যদিও আলোচনায় মাপ বা ওজনে কম দেওয়ার বিষয়টি উঠে এসেছে, তবে বিষয়টি এর মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; যাপিত জীবনের সবকিছুই এর অন্তর্ভুক্ত। মানুষের প্রতি আল্লাহর দাবি, একজনের প্রতি আরেকজনের হক ও অধীনস্তদের অধিকারসহ জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে প্রাপককে তার ন্যায্য পাওনা ও অধিকার বুঝিয়ে দেওয়াই হলো আলোচ্য আয়াতের প্রতিপাদ্য বিষয়।
মিথ্যাবাদী পাপী : ইসলামে যে অপরাধগুলো গুরুতর মনে করা হয়, ‘মিথ্যা’ তার অন্যতম। তবে এ মিথ্যা যখন হয় জেদের বশে আল্লাহর কোনো আয়াত-নির্দেশকে উপেক্ষা ও ঠাট্টা করে, তখন সে মিথ্যা পরিণত হয় দণ্ডনীয় অপরাধে। এমন অপরাধের ফলে ব্যক্তিকে পার্থিব জীবন ও পরকালে কঠিন দুর্ভোগ, যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি ও লাঞ্ছনার মুখোমুখি হতে হবে। আল্লাহ বলেন, ‘প্রত্যেক মিথ্যাবাদী পাপাচারীর দুর্ভোগ। সে আয়াতগুলো শুনে, অতঃপর অহংকারী হয়ে জেদ ধরে, যেন সে আয়াত শোনেনি। অতএব, তাকে যন্ত্রণাদায়ক শাস্তির সুসংবাদ দিন। যখন সে আমার কোনো আয়াত অবগত হয়, তখন তাকে ঠাট্টারূপে গ্রহণ করে। এদের জন্য রয়েছে লাঞ্ছনাদায়ক শাস্তি।’ সুরা আল-জাসিয়া : ৭-৯
বাহ্যিকভাবে যেসব কাজ পার্থিব জীবনে দুঃখ-দুর্দশা, দুর্ভোগ ও বিপর্যয় ডেকে আনে এবং পরকালে মুক্তির সব পথ বন্ধ করে দেয়, এমন সব কাজ থেকে বিরত থাকা মুমিনের একান্ত কর্তব্য। তাছাড়া নামাজসহ প্রতিটি কাজে লৌকিকতা পরিহার করে আল্লাহর সন্তুষ্টি কামনা ইবাদতের মুখ্য উদ্দেশ্য। কেননা, লৌকিকতা ‘ইবাদত বিনষ্টের নীরব ঘাতক।’ হজরত আবু হুরায়রা (রা.) বর্ণিত, তিনি বলেন, হজরত রাসুলুল্লাহ (সা.) কিয়ামতের দিন ইবাদতে লৌকিকতা প্রদর্শনকারীদের একটি চিত্র তুলে ধরেছেন, যাতে একজন শহীদ, একজন কোরআনের শিক্ষক ও একজন দানবীরের আলোচনা এসেছে; যারা খ্যাতি ও সুনামের আশায় আল্লাহর রাস্তায় জেহাদে অংশগ্রহণ, কোরআন শিক্ষা দেওয়া ও দান করত। (সেদিন) তারা তাদের আমলের প্রতিদান থেকে বঞ্চিত হবে। আল্লাহ তাদের বলবেন, ‘তোমরা যা চেয়েছ, পৃথিবীতে তা পেয়েছ। সুতরাং আজ আমার কাছে তোমাদের কোনো প্রাপ্য নেই।’ সহিহ্ মুসলিম : ৩৫২৭
মনোযোগ ও একাগ্রতা ইবাদতের প্রাণ। ইবাদতে একাগ্রতা বাড়াতে মনে সবসময় এ কথা জাগরূক রাখতে হবে, মহান আল্লাহ সর্বদা আমাদের পর্যবেক্ষণ করছেন। হজরত আবু হুরায়রা (রা.) বর্ণিত এক হাদিসে হজরত রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘তুমি এমনভাবে আল্লাহর ইবাদত করো, যেন তুমি তাকে দেখতে পাচ্ছ। আর যদি দেখতে না পাও, তবে (ভাবো) তিনি তোমাকে দেখছেন।’ সহিহ্ বোখারি : ৫০