‘তিন চারে নব্বই’ লিখে ভোলানাথ ভুল অঙ্কের স্থায়ী প্রতিনিধি হয়ে আছে। ভেবেছিলাম ভোলানাথরা শুধু ছড়া-কবিতাতেই থাকেন, কিন্তু দুঃখভরে দেখি কবিতার বা আদি যুগের ভোলানাথরা আজও সদর্পে ঘুরে বেড়াচ্ছেন। এবং ভোলানাথের মতোই, ‘লিখেছিনু ঢের বেশি’ এই গর্ব তাদেরও। নইলে কেনইবা এই যুগে যখন ভুলটা বোঝার বা শোধরাবার হাজারও উপকরণ চারদিকে ছড়িয়ে, তখন ভুলের মালা গলায় ঝুলিয়ে রাখব। সত্যি বললে, ভুলই এখন আমাদের ক্রিকেটীয় অলঙ্কার এবং ভোলানাথ প্রায় আদর্শিক গুরু। ঘুরিয়ে-ফিরিয়ে ক্রিকেটে ভোলানাথের অঙ্কই করে চলছি আমরা সবাই।
১১ বছর আগে দেশের মাটিতে প্রথম বিশ্বকাপ। প্রত্যাশামতো ফল হচ্ছে না। প্রভাবশালী এক কর্তা এক সন্ধ্যায় মিরপুর স্টেডিয়ামের পেছনের করিডরে আফসোস করেই চলছেন। ইস! অমুক যদি এই কাজটা না করত! তমুক খেলোয়াড় যদি কথা শুনত!
অবাক হয়ে বললাম, ‘এতটা যখন বুঝতে পারছেন তখন ব্যবস্থাটা নিচ্ছেন না কেন? আপনাদের হাতেই তো ক্ষমতা।’
প্রভাব খসে গিয়ে বিপন্ন দেখায় কর্মকর্তাকে, ‘কী করব, এত পপুলার হয়ে গেছে যে বলারও কিছু নেই।’
সন্ধ্যার পর যদিও কিন্তু ফ্লাডলাইটের আলোয় উজ্জ্বল চারদিক। তবু যেন একটা ধেয়ে আসা ঘোর অন্ধকার দেখলাম। জনপ্রিয়তার কারণে যদি কাউকে শৃঙ্খলার মধ্যে না রাখা যায়, তাহলে সেই দিন আসতে বাধ্য যেদিন কেউ কিছু মানবে না। নৈরাজ্যের স্পষ্ট আওয়াজ।
মোটের ওপর সাকিব বা সাকিবরা পারফরম্যান্স সূত্রে যে তারকাখ্যাতি বা অশেষ জনসমর্থন পেয়েছেনসেটা দুইরকম ক্ষতিকর প্রভাব ফেলে গেছে। একদিকে তারা এটাকে মনে করেছেন যেমন খুশি তেমন চলার লাইসেন্স। আরেক পক্ষ, মানে কর্তৃপক্ষের কাছে এটা আবার প্রবেশ নিষেধের মতো সাইনবোর্ড; দেখেও না দেখার ভান করতে হবে। তখন যে কাগজে কাজ করি, আমরা অনেক ভেবে ঠিক করলাম, কালোকে কালো বলবই। মূলনীতি ওটাইযা চিরন্তন ক্রীড়া বা ক্রিকেট সংস্কৃতি আমাদের শিখিয়েছ, টিম গেমে দলের চেয়ে ব্যক্তি বড় নন। বড়দের বাড়তি মর্যাদা দিতে গিয়ে ছোটরা যে তলে তলে হতাশ হচ্ছে, তাদের দ্বিতীয় শ্রেণির নাগরিক মনে করা যে সেরাটা ঢেলে দেওয়ার ক্ষেত্রে দেয়াল হয়ে দাঁড়াচ্ছে সেটাও চোখে পড়ছে না। এরা তারকা নয় বলে মুখ ফুটে বলে না। বলে না বলে মনে চেপে থাকে। চেপে থাকে বলে পাথর হয়ে পুরো নিবেদনে বাধা হয়ে দাঁড়ায়। খুব যে সফল হলাম এমন নয়। ওই যে ভোলানাথের অঙ্ক। পাল্টা সব যুক্তিঅমুক আমাদের অত ম্যাচ জিতিয়েছেন, তিনি বিশ্বের বুকে আমাদের পরিচিত করিয়েছেন, তার জন্ম হয়েছে বলেই...। কোনো কিছুই মিথ্যা নয়। সেই শ্রদ্ধা থাকা এক জিনিস, আর তাতে অন্ধ হয়ে যাওয়া ক্ষতিকর জিনিস। প্রথম আর দ্বিতীয়টার মধ্যে ভারসাম্য থাকা উচিত। অন্ধত্বে ভারসাম্যের রেখাটা বিলীন হয়ে গেছে বলে ক্ষতিগ্রস্ত সবাই। প্রথম হচ্ছে সেই তারকারাজিগিররত জনস্রোত, মুগ্ধ মিডিয়া এবং পলায়নমুখী কর্তারা যাদের বলে চলেছেন, ‘তুমিই সেরা, যা করবে তা-ই ঠিক।’ এবং তাতে ভুলে আলো আর আঁধারের পার্থক্য করার ফুরসতই তারা করে উঠতে পারেননি।
ব্যক্তি স্বাধীনতা বা প্রতিভাবানদের ভিন্ন মনস্তাত্ত্বিকতার সঙ্গে দ্বিমত করি না। তারা কেউ কেউ খেয়ালি হবেন স্বাভাবিক। ক্রীড়া বিজ্ঞান তো বটেই, সামগ্রিকভাবে প্রতিভাপাঠেও তাদের ব্যতিক্রমী জীবনাচরণের একটা অনুমোদন আছে; ঐশ্বরিক ক্ষমতাবানরা আমাদের মতো সাধারণ হবেন না। দুয়েকটা অন্য কা- করবেন, যেটা অনেক ক্ষেত্রেই আমরা বুঝব না। আবার কিছু ক্ষেত্রে উল্টা হয়, তারা যে আমাদের মতো সাধারণ মানুষ, জীবন ও পরিবার আছে, সেটাও আমরা ভুলে যাই। যন্ত্র ধরে নেই। অথচ তারা সুইচ টেপা পুতুল নন, সুখ-দুঃখ, লাভ-লোভ মিলিয়ে আমাদের মতোই মানুষ। কিন্তু ততক্ষণ পর্যন্ত সব ঠিক আছে যতক্ষণ পর্যন্ত সেটা তাদের পারফরম্যান্সকে বিঘিœত করে না। শিল্পেই শিল্পীর পরিচয়-অস্তিত্ব, যখন খেয়ালি আচরণ শিল্পের জন্যই বাধা, তখন বাধা না দেওয়ারা মোটেও আর শুভাকাক্সক্ষী নন।
টিম গেমে ব্যক্তি বা বড় খেলোয়াড়ের কা- যখন টিমের জন্য সমস্যা মনে হবে সেখানেই দাঁড়ি টানতেই হবে। গত কয়েক সিরিজ ধরে সাকিব খেলবেন কি খেলবেন না, ফোকাস এখানে এসে বাংলাদেশের ক্রিকেটটাকে কি দ্বিতীয় বিষয় বানিয়ে দিচ্ছে না! তাকে মডেলিং বা অন্য কারণে ছুটি দিতে গিয়ে টিম রুলটাই যে অন্যভাবে লেখা হচ্ছে সেটা যদি সমস্যা না মনে করেন, তাহলে আপনি এখনো ভোলানাথের অঙ্কেই আছেন। তবে, হ্যাঁ, এটাও ঠিক সাকিবের বয়স হয়েছে, পরিবার বিদেশে থাকে, অবসাদ বা ক্লান্তি অস্বাভাবিক নয়। তাই মনে হয়, মাঝামাঝি একটা জায়গাও আছে, যে জায়গাটা হলো এই বয়সে পরিবারবিচ্ছিন্নতায় সাকিবের পক্ষে সম্ভব নয় সব পর্যায়ে ক্রিকেট খেলা। বেছে বেছে খেলতে হবে এবং সমঝোতার মাধ্যমে। যে জনস্রোত বিনাপ্রশ্নে তাকে সমর্থন করে গেছে, তাদের কাছে প্রশ্নবিদ্ধ হওয়ার আগে সাকিবের এই পথে আসা উচিত। এবং আমাদের সাকিববিহীন অথবা সীমিত সাকিবকেন্দ্রিক জীবনের কথা ভাবা উচিত। আরও ভাবা উচিত, সাকিবকে সামলানোয় যে ভুল হলো সেই ভুল যেন পরের ভুল ঠেকানোর শিক্ষা হয়। সেজন্য সবচেয়ে জরুরি নিয়ন্ত্রকদের নির্ভয় থাকা। জনস্রোতকে শ্রদ্ধা করবেন। তাতে ভেসে যাবেন না।
সাকিবের আবির্ভাব ২০০৬ সালে। মাশরাফি এরও আগে। পা-বদের বাকিরা একটু আগে-পরে। পরের ১৫ বছরে এরচেয়ে ভালো ক্রিকেটার আমরা তৈরি করতে পারিনি, কাজেই কীভাবে ক্রিকেট আগাবে! ক্রিকেট তো এগোয় ভালো ক্রিকেটার তৈরির মাধ্যমে। সহজ ব্যাকরণ। কেউ কেউ কালজয়ী থাকবেন, তাদের রিপ্লেসমেন্ট হবে নাএটা যেমন ঠিক, কিন্তু প্রজন্মের চেয়ে পরের প্রজন্মের ক্রিকেটার তো এগিয়ে থাকবেন। বাংলাদেশের মতো অগ্রসরমান দেশে সেটা আরও বেশি হওয়ার কথা। হয় না। আর কী আশ্চর্য, আমাদের সেই ভ্রুক্ষেপ নেই। আগের এরা খুব ভালো, নতুনরা পারে নাএরকম সব বক্রোক্তিতেই আটকে আছে ক্রিকেটচিন্তা। কিন্তু এই জিনিসটাও বোঝার সময় এসেছে যে, আমাদের বদ্ধ ক্রিকেটবোধ ওদের পথ আটকে রাখছে কি না। সরলীকৃত চিন্তার কারণে খালি চোখের দেখাটাকেই শেষ দেখা মনে করি। ফাঁকটা নজর এড়িয়ে যায়। ক্রীড়াবিজ্ঞানে কোথাও কোথাও স্টার বার্ডেন বলে একটা তত্ত্ব আছে। যেমন ধরা যাক একজন সিনিয়র খেলোয়াড় দলে থাকলে তিনি স্বভাবতই তার কমফোর্ট জোনে থাকতে চাইবেন। একজন হয়ত, টানা নতুন বলে বল করে যেতে চান, কারণ বল পুরনো হলে তার বল আর অত কার্যকর নয়। তাহলে পুরনো বলে তার ঘাটতিটা মেটাতে হবে একজন তরুণকে। তারকা হয়ত ওই সময় বল করলে একটু বেশি রান দিতেন, গড় খারাপ হতো, এখন তিনি না করায় যাকে দেওয়া হবে, সে অনভিজ্ঞতায় আরও বেশি রান দেবে। দিন শেষে আপনি দেখবেন, তারকা খেলোয়াড়টি কত কম রান দিলেন, তরুণটি বেশি দিল। দেখলেন না সেই তারকাটি যদি ঐ কঠিন সময়ে বল করতেন তাতে তার গড় খারাপ হলেও, তরুণটির চেয়ে তিনি কম রান দিতেন, দল লাভবান হতো। আবার কারও নির্দিষ্ট নম্বরে ব্যাট করাতে বাধ্য থাকা বা নির্দিষ্ট ধরনের ব্যাটসম্যান এলে বল না করার ইচ্ছা থাকে। সিনিয়র এবং তারকা হলে এসব দাবি মানতে হয়। কখনো আবার অনেক ক্ষেত্রে পুরনো অভ্যাসের জেরে তরুণরা সিনিয়ররা থাকলে অবচেতনের এক ধররের দায়হীনতা বোধ করেন। উনি আছেন, সবসময় করছেন, আজও করে দেবেনএই ভাবনার সঞ্চার তার শতভাগ বের করার ক্ষেত্রে বাধাও। আমাদের দেশে এমন হয় বলছি না, কিন্তু সিনিয়রদের ওপর অতি নির্ভরতা এই পাঠকে সামনে নিয়ে আসে। আরও সামনে আসে যখন দেখতে পাই, নিউজিল্যান্ডে তরুণদের দল অবিশ্বাস্য কা- করে বসে। আর তাই মনে হয়, সময় এসেছে ক্রিকেট ভাবনা আর বোধকে পুনর্বিন্যস্ত করারও। তলিয়ে দেখা জরুরি যে, সিনিয়রদের প্রতি অতি নির্ভরতা পরের প্রজন্মের বিশ্বাস তৈরির ক্ষেত্রে দেয়াল হয়ে দাঁড়াচ্ছে কি না।
আবার ভোলানাথে ফিরি। ‘তিন চারে নব্বই’ লেখার পরের লাইন হলো, ‘কাটা গেল সর্বই’। মাস্টার ঠিক ছিলেন বলে ভুলটা ধরেছেন কিন্তু আমাদের ভুল ঠিক করার সাহসী মাস্টার কোথায়! তাই ‘তিন চারে বারো’র জায়গায় ‘নব্বই’তেই চলছে। চাহিবামাত্র বিশ্রাম মেলে, তিন সংস্করণের চুক্তিও চলে।
আসলে আমরা সব সত্যিই ভোলানাথ। ভুলের মালাই আমাদের অলঙ্কার। অতএব, তিন চারে নব্বই-ই ঠিক!