পুলিশ ও আসামির স্বজনের ঘুষ লেনদেনের ফোনালাপ ফাঁস!

গাইবান্ধায় আওয়ামী লীগ নেতার বাসায় নিহত জুতা ব্যবসায়ী হাসান আলী (৪৫) হত্যা মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা তৎকালীন গাইবান্ধা ডিবি পুলিশের ওসি ও বর্তমানে সুন্দরগঞ্জ থানার ওসি মো. তৌহিদুজ্জামান সঙ্গে এক আসামির ছেলের ঘুষ লেনদেনের পাঁচটি ফোনালাপ ফাঁস হয়েছে।

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ওই পাঁচটি ফোনালাপ ছড়িয়ে পড়েছে। প্রায় ১৭ মিনিটের পাঁচটি কল রেকর্ড এসেছে দেশ রূপান্তরের হাতে।

প্রথম কল রেকর্ড

আসামির স্বজন: আসসালামু আলাইকুম স্যার, এই যে বিষয়টা আমি ... জানাইলাম, বুঝছেন। তা উনি তো আসতে পারবে না। উনি ওনার।

পুলিশ: যেদিন আসতে পারবে, সেই দিন আসবে। সমস্যা নাই।

স্বজন: উনি তো বলছেন কাজ না হলে টাকা ফেরত দেবেন। তা উনি এখন টাকা ফেরত…।

পুলিশ: আমি ওনার সাথেই কথা বলবো।

স্বজন: উনি আপনার সাথে ফোনে কথা বলতে চাচ্ছেন।

পুলিশ: হোয়াটসঅ্যাপে ফোন দিতে বলো।

দ্বিতীয় কল রেকর্ড

পুলিশ: তোমারে যা মনে করছিলাম, তুমি তো পুরা চেঞ্জ করে ফেলাইলা চেহারা।

স্বজন: স্যার, আমি এখন কী বলবো? আপনিই বলেন।

পুলিশ: (অস্পষ্ট) শোনো তোমার তো একজন আসামি তো টোটালি ওটা তো নেওয়াই হয়েছে একজন আসামির জন্য। একজন আসামি বাদ দিলে এইটা ব্যাপারে তো কথা না, কথা হলো মূলধারা বাদ দিয়ে দেব। এইটা হলো মূল। ওর নামে দিছি ছয়টা ধারা আর তোমাগো নামে দেব দুইটা।

স্বজন: সেইটা তো স্যার আমি বুঝছি।

পুলিশ: (অস্পষ্ট) তোমাদের আমি কোনো ডিস্টার্ব করবো না।

স্বজন: হ্যাঁ, হ্যাঁ ওটা চাচ্ছি না আমরা। ওটা সমস্যা না।

পুলিশ: (অস্পষ্ট) আর তোমার যে মেইন আমি কাজ করে দিলাম। এত কিছু ফোনে বলবো না। তুমি একটা ফোন দিয়ে আসো।

স্বজন: আমি এখন স্যার বিপদে…।

পুলিশ: আমি বিপদ উদ্ধার করে দেব। …তোমার কোনো বিপদ নাই। আগে আমি কাজ করে নিই, কাজ করতে আরও ১০ ১২ দিন লাগবে।

স্বজন: সেটা তো ক্লিয়ার স্যার আমার একটা কথা শোনেন…।

পুলিশ: ওনার মাধ্যমেই হয়েছে। যা বলবো ওনার মাধ্যমেই বলবো। তুমি মাঝখানে তাঁকে নিয়ে আসছিলা সব ব্যাপারে।

তৃতীয় কল রেকর্ড

পুলিশ: তিন চার ডেটে খালাস হবে। খালাস না হলে তখন আমার কাছ থেকে পুরোটা নিয়ে যাইও, ঠিক আছে। আমার কাছে রইলো তোমাদের আমানত।

স্বজন: সেইটা ঠিক আছে। আমি এখন বেকায়দায় পড়ে গেছি। আমি তো হলাম মাধ্যম। আমাক ধরছে ঠিকমতো। এখন তুই ওনার থেকে কীভাবে নিয়ে আসবি নিয়ে আয়। আমি তো এখন স্যার বিপদে। গালিগালাজও শুনছি।

চতুর্থ কল রেকর্ড

পুলিশ: দুজন সাক্ষী দিয়া শেষ করে ফেলাব।

স্বজন: ওনারা এখন বলতেছে, আমরা প্রথম অ্যামাউন্ট দিছিলাম ওটা আমাদের দরকার নাই। পরে বাকি যেটা দিছি সাত লাখ টাকা, এটা পুরাটাই চাচ্ছে।

পুলিশ: তাহলে আমি ওই ধারা-ধুরা যা আছে সব দিয়ে দেব। ঠিক আছে নিয়ে যাও।

স্বজন: ওনারা বলতেছে, নাম না থাকার জন্য টাকা দিলাম। সেই নাম থাকতেছে। তাই এখন আমার ওপরে চাপ দিতেছে।

পুলিশ: আমার সরলতার সুযোগ নিচ্ছে আরকি তাইতো। তবে ওইটা হবে না।

স্বজন: কোনটা।

পুলিশ: তুমি যেটা এইমাত্র বললা, ওটা প্রশ্নই আসে না। আকাশ-পাতাল চেঞ্জ করে দিছি আমি।

পঞ্চম কল রেকর্ড

স্বজন: যেহেতু টাকাটা আমার হাত দিয়ে দিছি। আপনি টাকাটা আমাদের কোনদিন দেবেন, সেটা বলেন।

পুলিশ: তুমি রেকর্ড করার জন্য ফোন দিছো?

স্বজন: রেকর্ড করার জন্য ফোন দেই নাই স্যার। রেকর্ড করলে তো আগেই করতে পারতাম। বাড়ির লোকজন বলতেছে যদি টাকা না ওঠে এসপি, ডিআইজি, আইজি সব স্যারের কাছেই যাবে।

পুলিশ: হেসে হেসে এ ব্যাটা, আমারে ওই ভয় দেখাইয়া লাভ আছে?

স্বজন: আপনি তো বলছেন, কাজ না হলে টাকা ফেরত দেবেন।

পুলিশ: হ্যাঁ, অবশ্যই। এখনো তো আমি স্বীকার আছি। অবশ্যই দেব ফেরত।

স্বজন: আমাদের টাকাটা আপনি দিয়ে দেন।

পুলিশ: তুমি আসো, এসে সামনাসামনি কথা বলো।

স্বজন: ওখানে যাওয়া যাবে না স্যার।

ওই কল রেকর্ডে আরও কিছু সময় কথা হয় ওই পুলিশ কর্মকর্তার সঙ্গে। যেখানে ওই পুলিশ কর্মকর্তা রবিবার থেকে বৃহস্পতিবারের যেকোনো দিন বসার কথা বলেন। ভুক্তভোগীরা তৃতীয় একটি জায়গায় বসার প্রস্তাব দেন।

উল্লেখ্য, গত বছরের ১০ এপ্রিল সকালে আওয়ামী লীগ নেতা মাসুদ রানার (৪২) বাসা থেকে হাসানের লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। গাইবান্ধা সদর উপজেলার নারায়ণপুর এলাকার মাসুদের বাসা। ঘটনার পর তাকে দল থেকে বহিষ্কার করা হয়। তিনি জেলা আওয়ামী লীগের উপ-দপ্তর সম্পাদক পদে ছিলেন।

মাসুদ রানা একজন দাদন ব্যবসায়ী। দলীয় পরিচয় ব্যবহার করে দাদন ব্যবসা করতেন। প্রায় দুই বছর আগে রানার কাছ থেকে পাঁচ লাখ টাকা ঋণ নেন শহরের স্টেশন রোডের জুতা ব্যবসায়ী হাসান আলী। এই টাকা সুদাসলে ১৯ লাখে দাঁড়ায়। সুদের টাকা দিতে না পারায় গত ৬ মার্চ লালমনিরহাট থেকে হাসানকে মোটরসাইকেলে তুলে আনেন মাসুদ রানা।

তিনি হাসানকে নিজ বাসায় এক মাসের বেশি আটকে রেখেছিলেন। এ নিয়ে নিহতের স্ত্রী বিথী বেগম সদর থানায় মাসুদ রানাসহ তিনজনকে আসামি করে হত্যা মামলা দায়ের করেছেন।

অপর দুজন হচ্ছেন শহরের স্টেশন রোডের জুতা ব্যবসায়ী রুমেল হক ও খলিলুর রহমান।

প্রথমে মামলার তদন্ত করেন গাইবান্ধা সদর থানার তৎকালীন পরিদর্শক (অপারেশন) সেরাজুল ইসলাম। পরে গাইবান্ধা ডিবি পুলিশের তৎকালীন ওসি, বর্তমানে সুন্দরগঞ্জের কঞ্চিবাড়ী পুলিশ তদন্ত কেন্দ্রের উপপরিদর্শক মানষ রঞ্জন দাস দায়িত্ব পান। সর্বশেষ মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তার দায়িত্ব পান গাইবান্ধা ডিবি পুলিশের ওসি ও বর্তমানে সুন্দরগঞ্জ থানার ওসি মো. তৌহিদুজ্জামান।

হাসান আলীর (৪৫) লাশ উদ্ধারের ঘটনার নয় মাস ৬ দিন পর গত ১৬ জানুয়ারি আইও (তদন্তকারী কর্মকর্তা) আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল করেন। ফেব্রুয়ারির শেষের দিকে তা সংশোধনের জন্য তদন্তকারী কর্মকর্তার কাছে ফেরত পাঠানো হয়।

এদিকে ঘটনার বিচারের দাবিতে ব্যবসায়ী ‘হাসান হত্যার প্রতিবাদ মঞ্চ’ গড়ে ওঠে। বিচারের দাবিতে দুই মাসব্যাপী আন্দোলন করে এই মঞ্চ।

আন্দোলনের মুখে সদর থানার তৎকালীন ওসি মাহফুজার রহমান, পরিদর্শক (তদন্ত) মজিবর রহমান এবং উপপরিদর্শক মোশারফ হোসেনকে অন্যত্র বদলি করা হয়। ঘটনার দিনই মাসুদ রানাকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। তিনি বর্তমানে জেলা কারাগারে রয়েছেন।

গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জ থানার ওসি মো. তৌহিদুজ্জামান আসামির নাম বাদ দেওয়ার কথা বলে টাকা নেওয়ার অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। তিনি বলেন, অভিযোগ সঠিক নয়। এটা চাঞ্চল্যকর মামলা তাই টাকা নেওয়ার প্রশ্নই আসে না।

টাকা লেনদেনের প্রমাণ আছে বিষয়টি জানালে ওসি বলেন, টাকা লেনদেন নিয়ে তার কারো সঙ্গে কোনো কথাবার্তা হয়নি। এ ছাড়া তিনি কোনো আসামির নাম বাদ দেননি বলেও জানান।