ধ্বংসাত্মক ১০ বিষয়

আল্লাহতায়ালা মানুষকে সর্বশ্রেষ্ঠ সৃষ্টি জীব হিসেবে সৃষ্টি করে পৃথিবীতে পাঠিয়েছেন। মহান আল্লাহ ঘোষণা করেন, ‘আর তোমার রব যখন ফেরেশতাদের বললেন, আমি পৃথিবীতে একজন প্রতিনিধি পাঠাতে যাচ্ছি, তখন ফেরেশতারা বলল, তুমি কি পৃথিবীতে এমন কাউকে সৃষ্টি করবে যে দাঙ্গা-হাঙ্গামা সৃষ্টি করবে এবং রক্তপাত ঘটাবে? অথচ আমরা সবসময় তোমার গুণকীর্তন করছি এবং তোমার পবিত্র সত্তাকে স্মরণ করছি। তিনি বললেন, নিঃসন্দেহে আমি যা জানি, তা তোমরা জানো না।’ সুরা আল বাকারা : ৩০

এ ঘোষণা থেকেই স্পষ্ট বোঝা যায়, আল্লাহ মানুষকে যে ক্ষমতা তথা পারঙ্গমতা দান করেছেন অন্য কাউকে দেওয়া হয়নি। সুসভ্য তথা মানবিক জ্ঞানসম্পন্ন জাতি হিসেবে মানুষ বিশ্বে আল্লাহর দেওয়া বিধান অনুযায়ী সমাজ ও রাষ্ট্র পরিচালনা করবে এবং যাবতীয় সমস্যার সমাধান আল্লাহর নাজিলকৃত বিধান অনুযায়ী সম্পন্ন করবে এটাই সৃষ্টিকর্তার ইচ্ছা। মানুষকে জ্ঞান ও শক্তি দান করা হয়েছে। এর দ্বারা আল্লাহর শোকরিয়াস্বরূপ তার দাসত্ব ও আনুগত্য সর্বাবস্থায় স্বীকার করে মানবকল্যাণে নিজেদের জ্ঞান-গবেষণাকে নিয়োজিত করার মাধ্যমে মানুষ তার শ্রেষ্ঠত্বের যথার্থতা প্রমাণ করতে পারে। মহান আল্লাহ এ কারণেই মানুষ সম্পর্কে ঘোষণা করেছেন, ‘নিশ্চয়ই আমি আদম সন্তানকে মর্যাদা দান করেছি, আমি তাদের স্থলে ও জলে চলাচলের বাহন দান করেছি, তাদের উত্তম জীবনোপকরণ প্রদান করেছি এবং তাদের অনেক সৃষ্ট বস্তুর ওপর শ্রেষ্ঠত্ব দান করেছি।’ সুরা বনি ইসরাইল : ৭০

যে দশটি বিষয়কে পবিত্র কোরআনে কঠোরভাবে নিষিদ্ধ করা হয়েছে, তা আদি মানব ও প্রথম নবী হজরত আদম (আ.) থেকে শুরু করে পৃথিবীর সব নবী-রাসুলের শরিয়তেই বিধিবদ্ধ ছিল এবং কিয়ামত পর্যন্ত বাধ্যতামূলক থাকবে তাওহিদবাদী মানুষের জন্য। এ দশটি নিষিদ্ধ তথা হারাম কাজ মানুষের মানবিক গুণাবলিকে ধ্বংস করে, সৃষ্ট জীব হিসেবে মানুষের শ্রেষ্ঠত্বকে বিনাশ করে দেয়। মানুষকে যে উদ্দেশে আল্লাহ সৃষ্টি করেছেন তা বাস্তবায়ন তো হয়ই না বরং আল্লাহদ্রোহিতার তাণ্ডবলীলায় সমাজ ও রাষ্ট্র অন্ধকারের গহিন সাগরে নিমজ্জিত হয়। পৃথিবীর মাটি ও বাতাস হয়ে পড়ে কালিমাময় তথা পাপ পঙ্কিলের জঘন্যতম হায়েনার হিংস্র পরিবেশ। যে দশটি বিষয় কোরআনে করিমের সুরা আনআমে বর্ণনা করা হয়েছে তা এ রকম

শিরক : শিরককে আল্লাহ সর্বাবস্থায় সব সৃষ্টির জন্য হারাম করেছেন। প্রকাশ্য শিরক ও প্রচ্ছন্ন শিরক। প্রকাশ্য শিরক যাকে শিরকে জলি বলা হয়। এটা ইবাদত ও আনুগত্যের ক্ষেত্রে কাউকে অংশীদার মনে করা ও প্রচ্ছন্ন শিরক হলো ধর্মীয় ও পার্থিব বিষয় একমাত্র নির্বাহী মনে করা সত্ত্বেও অন্যকে এর সঙ্গে শরিক করা।

মাতা-পিতার অবাধ্যতা : মাতা-পিতার অবাধ্য না হওয়া। এটা মানবাধিকারের মধ্যে সবচেয়ে অপরিসীম অপরিহার্য বিষয়। সংসার জীবনের সবকিছু উজাড় করে এমনকি নিজের প্রাণাদি বিলিয়ে দিয়ে হলেও মাতা-পিতার চাহিদা পূরণ ও তাদের সন্তুষ্ট রাখার দায়িত্ব পালন করে যেতে হবে।

দরিদ্রতার ভয়ে সন্তান হত্যা : দরিদ্রতা তথা অভাবের আশঙ্কায় সন্তানসন্ততিকে হত্যা কিংবা তাদের জন্মরোধ করা। এটা মহান রাব্বুল আলামিনের ইচ্ছা বিরোধী কাজ।

অশ্লীলতা : অশ্লীলতা তথা নির্লজ্জতার ধারে কাছেও যেতে আল্লাহতায়ালা নিষেধ করেছেন এবং সমাজে নির্লজ্জতা, বেপর্দা ও ব্যভিচার ও বেহায়াপনা চালুর বিরুদ্ধে আল্লাহতায়ালা কঠোর হুঁশিয়ারি জারি করেছেন।

অন্যায়ভাবে মানুষ হত্যা : অন্যায়ভাবে মানুষ হত্যাকে আল্লাহতায়ালা অত্যন্ত কঠিন শাস্তিযোগ্য অপরাধ বলে ঘোষণা করেছেন। খুনখারাবি, মারামারি এগুলো যে মানবসমাজকে ধ্বংসের অতল গহবরে তলিয়ে দেয় তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না।

এ পাঁচটি বিষয় সম্পর্কে সুরা আনআমে আল্লাহতায়ালা ঘোষণা করেন, ‘(হে রাসুল আপনি) বলুন, এসো, আমি তোমাদের ওই সব বিষয় পাঠ করে শোনাই, যেগুলো তোমাদের প্রতিপালক তোমাদের জন্য হারাম করেছেন। তা এই যে, আল্লাহর সঙ্গে কোনো কিছুকে অংশীদার করো না, পিতা-মাতার সঙ্গে সদয় ব্যবহার করো, স্বীয় সন্তানদের দারিদ্র্যের কারণে হত্যা করো না, আমি তোমাদের ও তাদের আহার দেই, নির্লজ্জতার কাছেও যেও না প্রকাশ্য হোক কিংবা অপ্রকাশ্য, যাকে হত্যা করা আল্লাহ হারাম করেছেন তাকে হত্যা করো না, কিন্তু ন্যায়ভাবে তোমাদের এ নির্দেশ দিয়েছেন, যেন তোমরা বুঝ।’ সুরা আনআম : ১৫১

এতিমের সম্পদ অন্যায়ভাবে ভক্ষণ : সুরা আনআমে হারামকৃত ষষ্ঠ বিষয় হলো এতিমের ধনসম্পদ অবৈধভাবে ভক্ষণ করা। আল্লাহতায়ালা এতিম ও অসহায়দের মালসম্পদ যথাযথ সংরক্ষণের প্রতি জোর তাগিদ প্রদান করেছেন এবং তাদের ধনসম্পদ গ্রাস করার বিরুদ্ধে কঠোর হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেছেন।

ওজনে কম-বেশি : ওজন তথা পরিমাপের ক্ষেত্রে হেরফের করা। মাপে দেওয়ার সময় কম ও নেওয়ার ক্ষেত্রে বেশি নেওয়ার বিরুদ্ধে আল্লাহতায়ালা কঠিন বার্তা জারি করেছেন। সমস্ত নবী-রাসুল এ ব্যাপারে ন্যায়পরায়ণতার নীতি অনুসরণের জন্য আল্লাহর আদেশ মানুষের কাছে পৌঁছে দিয়েছেন। ব্যবসা-বাণিজ্যসহ সব প্রকার লেনদেনের ক্ষেত্রে সঠিক পন্থা পদ্ধতি মেনে চলার প্রতি মানুষের জন্য চিরস্থায়ী বিধান বাধ্যতামূলক করেছেন। পবিত্র কোরআনের অনেক জায়গাতেই এ সম্পর্কিত আয়াত অবতীর্ণ হয়েছে। কোরআনে করিমে একজন বিখ্যাত পয়গম্বর হজরত শোয়াইব (আ.) তার সম্প্রদায়কে এ সম্পর্কে সতর্ক করতে গিয়ে নিগৃহীত হয়েছিলেন এবং শেষ পর্যন্ত আল্লাহর নির্দেশক্রমে স্বীয় এলাকা ছেড়ে অন্যত্র চলে যান। আর তার অবাধ্য জাতি আল্লাহর কঠিন আজাবে নিপতিত হয়ে ধ্বংস হয়ে যায়। ব্যবসায়িক ক্ষেত্রে হোক, পারিশ্রমিকের ক্ষেত্রে হোক, কোনো নির্ধারিত দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে হোক, সামাজিক, রাষ্ট্রীয় তথা বিচার সম্পন্নের ক্ষেত্রে হোক, সব বিষয়ে ন্যায়পরায়ণতার সঠিক নীতি নির্দেশিকা মেনে আল্লাহর হুকুম যথাযথ বাস্তবায়নই হলোআসমানি মহাগ্রন্থের এ সংক্রান্ত আয়াতগুলোর আলোচ্য বিষয়।

ন্যায়বিচারে বাধা : ন্যায় ও সুবিচারের বিপরীত কার্যক্রম চালু, অনুমোদন, সমর্থন সবই হারাম ঘোষণা করা হয়েছে। এ বিষয়টি খুবই ব্যাপক। এটা পূর্ববর্তী বিষয়ের পরিপূরক তথা বিস্তারিত ব্যাখ্যাও বলা যেতে পারে। বিচারের ক্ষেত্রে সম্পূর্ণ নিরপেক্ষ ও ন্যায়সংগত নীতির অনুসরণ করা তথা সত্য কথা বলা ও সত্য সাক্ষ্য দেওয়া। যদিও সেটা ঘনিষ্ঠ আত্মীয় এমনকি সন্তানসন্ততি, মা-বাবাও হয়। এ জন্য উল্লেখ করা হয়েছে, ‘তোমরা যখন কথা বলবে, তখন ন্যায়সংগত কথা বলবে, যদি সে আত্মীয়ও হয়।’ মোট কথা, মিথ্যা সাক্ষ্য ও অসত্য ফয়সালা প্রতিরোধ করাই সুরা আনআমের এতদসংক্রান্ত আয়াতের উদ্দেশ।

আল্লাহর সঙ্গে ওয়াদা ভাঙা : আল্লাহর সঙ্গে কৃত ওয়াদার বরখেলাফকে হারাম করা হয়েছে। আল্লাহর সঙ্গে কৃত ওয়াদার দুটো অর্থ হতে পারে। প্রথমত : আলমে আরওয়ায় অর্থাৎ রুহের জগতে আল্লাহ মানুষের কাছে যে ওয়াদা নিয়েছিলেন সেটাও হওয়া স্বাভাবিক। যেমন, তিনি বলেছিলেন, আমি কী তোমাদের রব তথা পালনকর্তা নই? সমস্ত মানবাত্মা উত্তরে বলেছিল, হ্যাঁ; হে প্রভু! দ্বিতীয়ত: আল্লাহর দ্বীন তথা শরিয়তের যাবতীয় আদেশ নিষেধ মেনে চলার যে ওয়াদা তথা স্বীকৃতি আল্লাহর কাছে করা হয় সেটাই মূলত এ অঙ্গীকারের আসল অর্থ। যেমন একজন মানুষ লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু মুহাম্মাদুর রাসুলুল্লাহর স্বীকৃতি দিয়ে মুখে উচ্চারণ করে মুসলমান হিসেবে পরিচয় দেয়। এর আসল অর্থ হলো, একমাত্র আল্লাহকেই ইলাহ মানতে হবে এবং মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.) কে আদর্শ নেতা হিসেবে মেনে চলার অঙ্গীকার করা। আল্লাহর সঙ্গে কৃত ওয়াদার অর্থ হলো একনিষ্ঠভাবে তার ইবাদত তথা দাসত্বের অঙ্গীকার করা, যেমন আল্লাহ আদেশ করেছেন, দাসত্ব ও আনুগত্য একমাত্র আল্লাহর উদ্দেশেই নিবেদন করতে হবে। পাঁচ ওয়াক্ত নামাজে আমরা যেমন প্রতি রাকাতেই পড়ে থাকি, ‘ইয়্যাকা নাবুদু ওয়া ইয়্যাকা নাসতাঈন’ অর্থাৎ আমরা একমাত্র তোমারই ইবাদত করি এবং তোমার কাছেই সাহায্য কামনা করি। আল্লাহর সঙ্গে এটাও একটি কঠিন ওয়াদা যার খেলাফ করা মোটেই বৈধ নয়। এ ছাড়া মান্নত, নজর ও যেকোনো শরিয়তসম্মত ওয়াদা পালনের প্রতি জোর তাগিদ দেওয়া হয়েছে। এ প্রসঙ্গে হজরত আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত হাদিসে বলা হয়েছে, ‘যার আমানত নেই, তার ইমান নেই। আর যার ওয়াদা ঠিক নেই, তার কোনো দ্বীন নেই।’ মিশকাত

মনগড়া নিয়ম অনুসরণ : পবিত্র কোরআনের সুরা আনআমে দশম যে বিষয়টি নিষিদ্ধ করা হয়েছে, তা হলো দ্বীন ইসলাম নির্দেশিত সহজ সরল পথের বিপরীত চলা তথা উল্টো পথ বা মানুষের মন-মস্তিষ্ক উদ্ভাবিত নিয়ম পদ্ধতির অনুসরণ করা। পবিত্র কোরআনের সর্বপ্রথম সুরা আল ফাতিহায় আল্লাহতায়ালা তার বান্দাকে আল্লাহর কাছে যে বিষয় প্রার্থনা করতে বলেছেন তা হলো, সহজ সরল পথ তথা পন্থা-পদ্ধতি। এ সুরায় মানুষ আল্লাহর কাছে এভাবে প্রার্থনা করে, ‘ইহদিনাস সিরাতাল মুস্তাকিম’ (হে আল্লাহ! আমাকে সহজ সরল পথ প্রদর্শন করো)। সুরা ইয়াসিনে আল্লাহ আদম সন্তানদের উদ্দেশে ঘোষণা করছেন, ‘এবং আমার দাসত্ব করো, এটাই সঠিক সরল পথ।’ সুরা ইয়াসিন : ৬০

আল্লাহর হারামকৃত উপর্যুক্ত দশটি বিষয়ই মানবতা তথা এক প্রভুর দাসত্ব ও আনুগত্য ধ্বংসের বিষাক্ত অস্ত্র বৈ কিছু নয়। শেষ পাঁচটি বিষয় সম্পর্কে আল্লাহতায়ালা সুরা আনআমে ঘোষণা করেন, ‘এতিমদের ধন, সম্পদের কাছেও যেয়ো না, কিন্তু উত্তম পন্থায় যে পর্যন্ত সে বয়োপ্রাপ্ত না হয়। ওজন ও মাপ পূর্ণ কর ন্যায়সহকারে, আমি তার সাধ্যের অতিরিক্ত কাউকে কষ্ট দেই না। যখন তোমরা কথা বলো তখন সুবিচার করো। যদিও সে আত্মীয়ও হয়, আল্লাহর অঙ্গীকার পূর্ণ করো। তোমাদের এ নির্দেশ দিয়েছেন, যেন তোমরা উপদেশ গ্রহণ করো, নিশ্চিত এটি আমার সরল পথ, অতএব এ পথে চলো এবং অন্যান্য পথে চলো না, তা হলে সে সব পথ তোমাদের তার পথ থেকে বিচ্ছিন্ন করে দেবে, তোমাদের এ নির্দেশ দিয়েছেন, যাতে তোমরা সংযত হও।’ সুরা আনআম : ১৫২-১৫৩

এ বিষয়গুলো প্রত্যেক নবীর আমলেই হারাম ছিল। এ প্রসঙ্গে তাওরাত বিশেষজ্ঞ কাবে আহবারের (রা.) উক্তি উল্লেখ করা যায়। তিনি আগে ইহুদি ছিলেন, পরবর্তী সময়ে মুসলমান হয়ে সাক্ষ্য দেন আল্লাহতায়ালা হজরত মুসা (আ.)-এর ওপর এ দশটি বিষয়কে হারাম ঘোষণা করে অহি নাজিল করেন। প্রখ্যাত তাফসিরবিদ হজরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.) বলেন, হজরত আদম (আ.) থেকে শুরু করে শেষ নবী (সা.) পর্যন্ত সব পয়গম্বরের শরিয়তেই এসব আয়াত সম্পর্কে একমত। কোনো ধর্ম ও শরিয়তে এগুলোর কোনোটিই মওকুফ বা রহিত হয়নি। হজরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদসহ বহু সংখ্যক মুজতাহিদ সাহাবি থেকে আয়াতগুলোতে বর্ণিত দশটি হারাম বিষয় যে মানবতাবিধ্বংসী অস্ত্র তা জোরালোভাবে উল্লেখ করা হয়েছে। আল্লাহতায়ালা মুসলিম মিল্লাতকে মনুষ্যত্ব ধ্বংসকারী বিষাক্ত বিষয়াবলির ছোবল থেকে রক্ষা করুন।