শিশু সুরক্ষা কাঠামো ও আমাদের বাস্তবতা

শিশু অধিকার বিষয়ে মানুষের প্রথম মনোযোগ আকৃষ্ট হয় প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর। ১৯৪৫ সালে ৫১টি রাষ্ট্র জাতিসংঘ সনদ স্বাক্ষর করার মাধ্যমে জাতিসংঘ প্রতিষ্ঠিত হয়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর লাখ লাখ এতিম, অনাথ হতভাগ্য শিশুর স্বার্থরক্ষার উদ্যোগ নেয় জাতিসংঘ। এরপর ১৯৪৮ সালের ১০ ডিসেম্বর জাতিসংঘের সাধারণ অধিবেশনে গৃহীত হয় শিশু অধিকার ও শিশু নিরাপত্তা সংক্রান্ত দুটি ধারা। এরপর থেকে বিশ্বব্যাপী পালিত হতে থাকে বিশ্ব শিশু দিবস।

বাংলাদেশ জাতিসংঘ শিশু অধিকার সনদের অন্যতম অনুস্বাক্ষরকারী দেশ। খেয়াল করা দরকার জাতিসংঘ ১৯৮৯ সালে শিশু অধিকার সনদ ঘোষণার বহু আগে ১৯৭৪ সালে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান শিশু আইন প্রণয়ন করেন। বঙ্গবন্ধু উপলব্ধি করতে পেরেছিলেন, শিশুর স্বাভাবিক বেড়ে ওঠার পরিবেশ নিশ্চিত করা গেলে আজকের শিশুই আগামী দিনের যোগ্য নাগরিক হয়ে দেশ ও জাতির কল্যাণে আত্মনিয়োগ করতে পারবে।

শিশুরা জাতির ভবিষ্যৎ, তারাই ভবিষ্যতে জাতিকে নেতৃত্ব দেবে এটা সম্ভবত সবচেয়ে বেশি উচ্চারিত এমন একটা বাক্য, যার বিপরীতে আমরা খুব কম জানি, আমাদের করণীয় কী। বাংলাদেশ ১৯৯০ সালে জাতিসংঘ শিশু অধিকার সনদে অনুস্বাক্ষর করার পর রাষ্ট্রীয়ভাবে কাঠামোগত অনেক উদ্যোগ নেওয়া হলেও সামাজিক চর্চায় শিশু অধিকারের বিষয়টি এখনো অনেকখানি উপেক্ষিত। এখনো আমাদের অধিকাংশের ধারণা, শিশুরা যেহেতু বয়সে ছোট, তাদের দাবি আদায়ের ক্ষমতা যেহেতু কম, তাদের সংগঠিত হওয়ার সুযোগ কম, অন্নবস্ত্র সবকিছু পরিমাণে তাদের কম লাগে বলে তাদের অধিকারগুলোও বোধ হয় মর্যাদায় তুলনামূলক ছোট এবং তা বাস্তবায়নে তেমন কোনো জবাবদিহি নেই।

কিন্তু জাতিসংঘ শিশু অধিকার সনদ জাতিসংঘের গৃহীত অন্য সব প্রধান সনদের মতো সমান গুরুত্বপূর্ণ, যার জন্য প্রতিটি রাষ্ট্রকে জবাবদিহি করতে হয়। বাংলাদেশ আনুষ্ঠানিকভাবে এ পর্যন্ত পাঁচবার শিশু অধিকার বাস্তবায়নে অগ্রগতি সম্পর্কিত প্রতিবেদন জাতিসংঘে জমা দিয়েছে। আমরা জানি, বাংলাদেশের মোট জনসংখ্যার ৪০ শতাংশের বেশি শিশু। তার মধ্যে ১৫ শতাংশের বেশি শিশু দরিদ্র। এই দরিদ্র শিশুদের মধ্যে রয়েছে শ্রমজীবী শিশু, গৃহকর্ম ও ঝুঁকিপূর্ণ কাজে নিয়োজিত শিশু, প্রতিবন্ধী শিশু, পথশিশু, বাল্যবিবাহের শিকার শিশু এবং চর, পাহাড় আর দুর্গম এলাকায় বসবাসরত শিশু। আমরা যখন ২০৩০ সালের মধ্যে টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের কথা বলি, তখন এই প্রান্তিক ও সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের জন্য কী ধরনের পরিকল্পনা গ্রহণ করছি, তা খুব গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। কেননা, এই বিশাল জনগোষ্ঠীকে বাদ দিয়ে কোনো রকম টেকসই উন্নয়ন সম্ভব নয়।

আমরা অধিকার আর সুবিধাকে এক করে দেখতে গিয়ে কোনো বিশেষ সুবিধা তৈরি করলে তাতে অধিকার অর্জিত হয়েছে বলে মনে করি। এক বেলা এতিমখানাতে বিশেষ খাবার দিয়ে ভাবি সারা বছরের দায়িত্ব শেষ। আমাদের দেশে এতিম শিশুর জন্য বিশেষ কোনো সুবিধা কিন্তু আমরা দিতে পারিনি। কোনো অভিভাবকহীন শিশুর আশ্রয়স্থলকে এতিমখানা আর লিল্লাহ বোর্ডিং নাম দিয়ে বিশেষায়িত করেছি তাদের দুরবস্থাকে। এছাড়াও পথশিশু, পথকলি নাকি টোকাই এসব নামকরণ বিতর্কে ব্যস্ত থেকেছি কিন্তু তাদের অবস্থার কোনো পরিবর্তন করিনি। হাসপাতালে দরিদ্রদের ফ্রি চিকিৎসার জন্য অস্থির হয়ে যাই আমরা। অথচ নামকরা স্কুলগুলোতে কেন প্রতি ক্লাসে এরকম হতদরিদ্র অন্তত দুজনকে পড়ানোর চেষ্টা করি না। স্বাভাবিক শিশুদের বেলাতেই আমরা এমন নির্দয়। যেসব শিশু প্রতিবন্ধী, অটিস্টিক, তাদের জন্য আমাদের চিন্তাতেই কোনো স্থান নেই। এছাড়া অটিস্টিক বাচ্চাদের জন্য ভালো স্কুলও নেই। এমনকি সরকারি কোনো ব্যয়বরাদ্দ নেই। ঢাকা শহরে শিশুদের খেলার জন্য বলতে গেলে কোনো মাঠ পর্যন্ত নেই। যেখানে রাজধানীর শিশুদের এই অবস্থা, সেখানে ঢাকার বাইরের শিশুদের কী অবস্থা সেটা তো বোঝাই যায়।

দীর্ঘ ৯ মাস সশস্ত্র যুদ্ধের মাধ্যমে স্বাধীনতা অর্জনের পর জাতির পিতা শিক্ষার উন্নয়নে সর্বোচ্চ গুরুত্বারোপ করেন। বিশেষ করে সদ্য স্বাধীন দেশের শিশুদের শিক্ষার জন্য বিভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহণ করেন। সব শিশু যাতে শিক্ষার সুযোগ গ্রহণ করতে পারে, সেজন্য একসঙ্গে লক্ষাধিক শিক্ষকের চাকরিসহ ৩৬ হাজার প্রাথমিক বিদ্যালয় জাতীয়করণ করেন। পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত শিক্ষার্থীদের বিনামূল্যে পাঠ্যপুস্তক প্রদান করেন। সংবিধানের ১৭ নম্বর অনুচ্ছেদে গণমুখী ও সর্বজনীন শিক্ষাব্যবস্থার প্রবর্তন করেন। একইসঙ্গে বাধ্যতামূলক প্রাথমিক শিক্ষার ব্যবস্থা করেন। মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় ধ্বংসপ্রাপ্ত ও বিধ্বস্ত স্কুলগুলো নতুনভাবে তৈরি ও সংস্কার করেন।

বাংলাদেশ জাতিসংঘ শিশু অধিকার সনদে অনুস্বাক্ষর করে ১৯৮৯ সালে, যার ১৫ বছর আগে জাতির পিতা ১৯৭৪ সালে শিশু আইন প্রণয়ন করেন। জাতির পিতার স্বপ্ন বাস্তবায়নের ধারাবাহিকতায় বর্তমান সরকারের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সরকার শিশুদের নিরাপদে বেড়ে ওঠা, সুষম বিকাশ ও সুরক্ষার বিষয় গুরুত্বের সঙ্গে বিভিন্ন আইন, নীতি ও উন্নয়ন পরিকল্পনায় অন্তর্ভুক্ত করেছে। একসঙ্গে ২৬ হাজার স্কুল এবং এক লাখ ২০ হাজার শিক্ষকের চাকরি জাতীয়করণ করেছে। সরকারের বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও বিভাগ শিশুকেন্দ্রিক বাজেট বাস্তবায়ন করছে। অষ্টম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা ও এসডিজিতে শিশুদের উন্নয়ন ও সুরক্ষায় যেসব লক্ষ্যমাত্রা রয়েছে, তা অর্জনে কার্যক্রম চলমান রয়েছে। মায়ের গর্ভাবস্থা থেকে তিন বছর পর্যন্ত মা ও শিশুর পুষ্টি চাহিদা পূরণ করতে মা ও শিশু সহায়তা কর্মসূচি চালু আছে। কন্যাশিশুর প্রতি বৈষম্য দূর করা এবং তাদের শিক্ষিত ও দক্ষ জনগোষ্ঠী হিসেবে গড়ে তুলতে ছাত্রী উপবৃত্তি প্রদানসহ নানামুখী কার্যক্রম অব্যাহত আছে।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার এসব উদ্যোগের ফলে প্রাথমিক বিদ্যালয়ে এখন ভর্তির হার প্রায় শতভাগ, যা এক দশক আগে ছিল মাত্র ৬১ শতাংশ। এর ফলে মাধ্যমিক, উচ্চ মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষার হার বেড়েছে বহুগুণ। শেখ হাসিনা গত এক যুগ ধরে সরকার পরিচালনাকালে শিশুদের অধিকার ও সুরক্ষা নিশ্চিত করতে যুগোপযোগী বিভিন্ন আইন, নীতি ও কর্মপরিকল্পনা প্রণয়ন করেছেন, যা দেশে শিশুদের উন্নয়ন ও বিকাশে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।

শিশুরাই জাতির ভবিষ্যৎ কর্ণধার। তারাই আগামী দিনে সমাজ ও রাষ্ট্র পরিচালনায় তারাই নেতৃত্ব দেবে। জ্ঞানচর্চা ও প্রযুক্তিতে সমৃদ্ধ হয়ে গড়ে তুলবে সবার জন্য কল্যাণকর নতুন বিশ্ব। তাই শিশুদের প্রতি আমাদের বিশেষভাবে যতœ নেওয়া উচিত। তারা যেন সৃজনশীল, মননশীল ও মুক্তমনের মানুষ হিসেবে গড়ে ওঠে, তা নিশ্চিত করার দায়িত্ব বিশ্বের প্রতিটি মানুষের। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে শিশু সুরক্ষার জন্য কার কী দায়িত্ব, তা নির্ধারণ করে দিয়ে এই দায়িত্বশীল প্রতিষ্ঠানগুলোর সমন্বয় ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা হয়। এই প্রক্রিয়ায় পরিবার, স্কুল, মিডিয়া এবং সামাজিক সংগঠনগুলো শিশু সুরক্ষার জন্য প্রতিরোধমূলক কর্মকাণ্ড ও ইতিবাচক চর্চাগুলো নিশ্চিত করে।

শিশু অধিকার লঙ্ঘনের ঘটনায় রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলো যেন অর্পিত দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করে সেটা নিশ্চিত করতে হবে। বাংলাদেশে সমন্বিত শিশু সুরক্ষা কাঠামো গঠন এখন সময়ের দাবি। সমন্বিত শিশু সুরক্ষা কাঠামোর মতোই সমান গুরুত্বপূর্ণ আরেকটি বিষয় হলো বাজেটে শিশুদের জন্য বিশেষ বরাদ্দ রাখা। বাংলাদেশে এখন শিশুদের জন্য ‘শিশু বাজেট’ নামে যে চর্চাটি রয়েছে, তা শিশুদের চাহিদা পূরণে তেমন কোনো ভূমিকা রাখতে পারছে না। কেননা, এই শিশু বাজেট মূলত বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও বিভাগে শিশুদের জন্য বরাদ্দকৃত অর্থের একটি সামগ্রিক চিত্র মাত্র। এতে করে প্রান্তিক ও সুবিধাবঞ্চিত শিশুর চাহিদাকে মাথায় রেখে তাদের জন্য যথার্থ পরিকল্পনা ও বাজেট করা হয় না। তাই এই বাজেট প্রণয়নের প্রক্রিয়ায় শিশু এবং শিশুদের নিয়ে কর্মরত বেসরকারি সংগঠনগুলোর মতামত গ্রহণ করা উচিত। এ ছাড়া বাল্যবিবাহ, শিশু নির্যাতন, শিশু পাচারসহ শিশু অধিকার লঙ্ঘনের নানা বিষয়ে আইনের যথাযথ প্রয়োগ হচ্ছে না বলে গণমাধ্যমসহ সামাজিক সংগঠনগুলো বারবার বলে আসছে। এ বিষয়ে আইনের যথাযথ প্রয়োগে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীসহ সংশ্লিষ্ট সবাইকে আরও দায়িত্বশীল ভূমিকা নিতে হবে।

তবে একই সঙ্গে পরিবার ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোয় শিশু সুরক্ষাবিষয়ক চেতনাগত পরিবর্তন দরকার। পরিবার ও স্কুলগুলোয় এখনো শাসনের নামে শারীরিক নির্যাতনের প্রচলন রয়েছে, যা শিশুর বিকাশে বড় ধরনের বাধা হয়ে দাঁড়াচ্ছে। সরকারি পরিপত্র থাকা সত্ত্বেও অনেক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে এখনো শারীরিক শাস্তি দেওয়া হয় এবং অনেক অভিভাবক তা প্রত্যাশাও করেন। এ কারণে সমাজে শিশুর প্রতি শারীরিক নির্যাতনের একটা সংস্কৃতি গ্রহণযোগ্য হয়ে উঠেছে। সময় এসেছে শিশু নির্যাতন মেনে নেওয়ার বা চুপ থাকার সংস্কৃতি ভাঙার। এ জন্য দরকার সামাজিক সচেতনতা। যেখানে সংবাদমাধ্যম, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও বেসরকারি সংগঠনগুলো অগ্রণী ভূমিকা রাখতে পারে।

আমরা চাই, বাংলাদেশ শুধু তার অর্থনৈতিক সূচক নয়, শিশু অধিকার রক্ষার মতো আর্থসামাজিক সূচকেও বিশ্বে দৃষ্টান্ত হয়ে উঠুক। তথ্যপ্রযুক্তির যুগেও মানবিক মূল্যবোধ সবার আগে দরকার। তাই পারিবারিক শিক্ষা শিশুর জন্য অপরিহার্য। সব ধরনের কুসংস্কারকে দূরে ঠেলে নতুন থেকে নতুনের দিকে এগিয়ে চলার যে শিক্ষা শিশুর মানসিক বিকাশে সহায়ক, সেই শিক্ষাই ছড়িয়ে দিতে হবে শিশুর অন্তরে।

লেখক গবেষক ও কলামনিস্ট

raihan567@yahoo.com