পশ্চিমা গোয়েন্দারা বিশ্বাস করেন, রাশিয়ার নেতা ভ্লাদিমির পুতিন মানসিকভাবে তার নিজের তৈরি একটি বদ্ধ জগতে আটকা পড়েছেন। এবং এটিই তাদের উদ্বেগের সবচেয়ে বড় কারণ।
পুতিনের উদ্দেশ্যগুলো আরও ভালোভাবে বোঝার জন্য বছরের পর বছর ধরে তারা তার মনের ভেতরে প্রবেশ করতে চেয়েছেন।
রাশিয়ান সেনারা ইউক্রেনে আপাতদৃষ্টিতে আটকে থাকার কারণে এটি আরও বেশি প্রয়োজনীয় হয়ে উঠেছে, কারণ চূড়ান্ত মানসিক চাপের মধ্যে তিনি কীভাবে প্রতিক্রিয়া জানাবেন তা নির্ধারণ করার চেষ্টা করছেন তারা।
চলমান সংকটকে আরও বিপজ্জনক করে তোলা এড়াতে পুতিনের মনের অবস্থা বোঝা তাদের জন্য অত্যাবশ্যক।
রাশিয়ার এই নেতা মানসিক ভাবে অসুস্থ বলেও অনুমান করা হচ্ছে। তবে অনেক বিশ্লেষক বিশ্বাস করেন যে, তিনি আসলে বিচ্ছিন্ন এবং নিঃসঙ্গ হয়ে পড়েছেন এবং বিকল্প মতামতের জন্য নিজের মনের দরজা বন্ধ করে দিয়েছেন।
নানাজনের সঙ্গে বৈঠকে তার এই বিচ্ছিন্নতা আরও স্পষ্ট হয়েছে। যেমন তিনি যখন ফরাসি রাষ্ট্রপতি ইম্মানুয়েল ম্যাখোঁর সঙ্গে দেখা করেছিলেন তখন তিনি একটি লম্বা টেবিলের শেষ প্রান্তে বসেছিলেন। যুদ্ধের প্রাক্কালে পুতিনের নিজস্ব জাতীয় নিরাপত্তা দলের সঙ্গে বৈঠকেও একই চিত্র দেখা গেছে।
একজন পশ্চিমা গোয়েন্দা কর্মকর্তা বলেছেন, পুতিনের প্রাথমিক সামরিক পরিকল্পনাটি একজন কেজিবি অফিসার তৈরি করেছে বলে মনে হয়েছে। রাশিয়া বলে, গোপনীয়তার ওপর জোর দিয়ে একটি সীমিত ‘গোপন রাজনৈতিক পরিষদ’ এটি তৈরি করেছে। কিন্তু এর ফলাফল হল বিশৃঙ্খলা। রাশিয়ান সামরিক কমান্ডাররা প্রস্তুত ছিলেন না এবং কিছু সৈন্য তারা আসলে কী করতে যাচ্ছে তা না বুঝেই ইউক্রেনে যুদ্ধে গেছে।
একাকী সিদ্ধান্ত গ্রহণকারী
পশ্চিমা গোয়েন্দারা রাশিয়ার নেতৃত্বের ভেতরে থাকা অনেকের চেয়েও এই পরিকল্পনাগুলো সম্পর্কে আরও বেশি জানত। তবে এখন তারা একটি নতুন চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হয়েছে- রাশিয়ার নেতা পরবর্তীতে কী করবেন তা বোঝা; এবং এটা সহজ নয়।
‘মস্কোতে পুতিনই একক সিদ্ধান্ত গ্রহণকারী, ফলে ক্রেমলিনের চাল বোঝাটা এখন একটা বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে’, বলছেন জন সিফার, যিনি অতীতে সিআইএ-এর রাশিয়া অপারেশন পরিচালনা করেছেন। এবং যদিও পুতিন তার মতামত প্রায়শই প্রকাশ্য বিবৃতির মাধ্যমে স্পষ্ট করেন, কিন্তু তিনি কীভাবে সেসব নিয়ে কাজ করবেন তা বোঝা একটি কঠিন গোয়েন্দা চ্যালেঞ্জ।
ব্রিটেনের এমআই সিক্স এর সাবেক প্রধান জন সাওয়ারস বিবিসিকে বলেছেন, ‘রাশিয়ার নেতার মাথার ভেতরে কী ঘটছে সে সম্পর্কে জানাটা খুবই কঠিন। কারণ পুতিন এতটাই সুরক্ষিত সিস্টেমে কাজ করেন যে তার নিজের অনেক লোকই জানেন না এরপর কী ঘটতে যাচ্ছে’।
পশ্চিমা গোয়েন্দা কর্মকর্তারা বলছেন, পুতিন তার নিজের তৈরি করা বুদ্বুদের ভেতরে আটকা পড়েছেন, যেখানে খুব কমই বাইরের তথ্য প্রবেশ করে, বিশেষ করে এমন কোনো তথ্য যা তার চিন্তাভাবনাকে চ্যালেঞ্জ করতে পারে।
মনোবিজ্ঞানের অধ্যাপক এবং দ্য সাইকোলজি অফ স্পাইজ অ্যান্ড স্পাইং নামের আসন্ন একটি বইয়ের সহ-লেখক অ্যাড্রিয়ান ফার্নহ্যাম বলেন, ‘তিনি তার নিজের প্রচারণার শিকার, এই অর্থে যে তিনি শুধুমাত্র একটি নির্দিষ্ট সংখ্যক লোকের কথা শোনেন এবং অন্য সব মুখ বন্ধ করে রাখেন। এটি তাকে বিশ্বের একটি অদ্ভুত দৃষ্টিভঙ্গি দেয়’। এবং তিনি এমন একটি দল দিয়ে ঘেরা থাকেন যারা প্রত্যেকে শুধু তার দৃষ্টিভঙ্গিকেই আরও শক্তিশালী করে। তিনি ‘যদি এমন কোনো দল বা গোষ্ঠীর শিকার হয়ে থাকেন তাহলে আমাদের জানতে হবে যে যে দলটি কারা’।
পুতিন যাদের সঙ্গে কথা বলেন তাদের বৃত্ত কখনই বড় ছিল না। কিন্তু যখন ইউক্রেন আক্রমণ করার সিদ্ধান্ত আসে, তখন এটি কেবল আরও মুষ্টিমেয় কিছু লোকের মধ্যেই সংকুচিত হয়ে আসে, পশ্চিমা গোয়েন্দা কর্মকর্তাদের বিশ্বাস, এরাই হল পুতিনের ওপর ‘প্রকৃত ঈমানদার’ যারা পুতিনের মানসিকতা এবং কল্পনারও ভাগীদার।
পুতিনের অভ্যন্তরীণ বৃত্ত কতটা ছোট হয়ে উঠেছে তা বোঝা গিয়েছিল, ইউক্রেন আক্রমণের ঠিক আগে জাতীয় নিরাপত্তা সভায় তিনি প্রকাশ্যে তার নিজের বিদেশি গোয়েন্দা সংস্থার প্রধানের সঙ্গে যেভাবে কথা বলেন তার মধ্য দিয়ে। ওই সভায় পুতিন এমনভাবে দূরত্ব বজায় রেখেছিলেন, যেন কর্মকর্তাদের অপমানিত করার জন্যই এর আয়োজন করে হয়েছিল। কয়েক ঘণ্টা পরে তার বক্তৃতার মধ্য দিয়েও ইউক্রেন এবং পশ্চিমের প্রতি রাগান্বিত এবং আক্রোশে আচ্ছন্ন একজন পুতিনকেই দেখা গিয়েছিল।
যারা তাকে পর্যবেক্ষণ করেছেন তারা বলেছেন যে, পুতিন ১৯৯০-র দশকে রাশিয়ার অবমাননা কাটিয়ে ওঠার আকাঙ্ক্ষা দিয়ে তাড়িত এবং পশ্চিমারা রাশিয়াকে নিচে রাখতে এবং তাকে ক্ষমতা থেকে তাড়াতে বদ্ধপরিকর এমন চিন্তায় আক্রান্ত। পুতিনের সঙ্গে দেখা করেছেন এমন এক ব্যক্তি জানিয়েছেন, ২০১১ সালে লিবিয়ার ক্ষমতা থেকে উৎখাতের পর কর্নেল গাদ্দাফিকে হত্যা করার ভিডিওটি পুতিন বারবার দেখতেন এবং নিজের ক্ষমতা হারানো নিয়েও আতঙ্কিত হয়ে পড়তেন।
সিআইএ-র পরিচালক উইলিয়াম বার্নসকে যখন পুতিনের মানসিক অবস্থার মূল্যায়ন করতে বলা হয়েছিল, তখন তিনি বলেছিলেন যে, পুতিন ‘অনেক বছর ধরে অভিযোগ এবং উচ্চাকাঙ্ক্ষার একটি দাহ্য সংমিশ্রণে ডুবে যাচ্ছেন’ এবং তার মতামতগুলো আরও ‘কঠিন’ হয়ে উঠেছে বলে বর্ণনা করেছেন এবং তিনি অন্যান্য দৃষ্টিকোণ থেকে ‘অনেক বেশি উত্তপ্ত’ ছিলেন।
রুশ প্রেসিডেন্ট কি পাগল?
পশ্চিমের অনেকেরই প্রশ্ন এটা। কিন্তু খুব কম বিশেষজ্ঞই এই ধারণাকে সহায়ক বলে মনে করেন। এই বিষয়ে বিশেষজ্ঞ একজন মনোবিজ্ঞানী বলেন যে, এমনটি অনুমান করা ভুল হবে। কারণ আমরা ইউক্রেন আক্রমণের মতো সিদ্ধান্ত নিতে পারে এমন লোককে ‘পাগল’ বলেতে পারি না।
২০১৪ সালে জার্মানির রাষ্ট্রপ্রধান অ্যাঞ্জেলা মের্কেল মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামাকে বলেছিলেন যে পুতিন মানসিকভাবে এক ‘অন্য দুনিয়ায়’ বাস করছেন। সম্প্রতি ফরাসি প্রেসিডেন্ট ম্যাখোঁ যখন পুতিনের সঙ্গে আলোচনার টেবিলে বসেছিলেন, তখনো বলা হয়েছিল যে রাশিয়ান নেতাকে আগের তুলনায় ‘আরও কঠোর, আরও বিচ্ছিন্ন’ অবস্থায় পাওয়া গেছে।
কিছু কি বদলে গেছে? কারও কারও অনুমান, যদিও প্রমাণ ছাড়াই, পুতিন সম্ভবত মানসিকভাবে অসুস্থ বা ওষুধের প্রভাবে তার মধ্যে কোনো বদল ঘটেছে। কেউ কেউ আবার মনস্তাত্ত্বিক কারণগুলোর দিকে ইঙ্গিত করেছেন, যেমন রাশিয়াকে রক্ষা করা বা এর মহত্ত্ব পুনরুদ্ধার করার ক্ষেত্রে তিনি যে স্বপ্ন দেখেন তা পূরণ করার জন্য তার নিজের সময় ফুরিয়ে যাওয়ার অনুভূতিতে আক্রান্ত হওয়া। কোভিড মহামারী চলাকালীন রাশিয়ান নেতা দৃশ্যত নিজেকে অন্যদের থেকে বিচ্ছিন্ন করেছেন এবং এটির একটি মানসিক প্রভাবও থাকতে পারে।
‘পুতিন সম্ভবত মানসিকভাবে অসুস্থ নন, বা তিনি পরিবর্তিতও হননি, যদিও তিনি তাড়াহুড়ো করছেন এবং সাম্প্রতিক বছরগুলোতে সম্ভবত আরও বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছেন’, বলছেন কেন ডেকলেভা, যিনি একজন সাবেক মার্কিন সরকারি চিকিৎসক এবং কূটনীতিক এবং বর্তমানে মার্কিন-চীন সম্পর্কের জন্য জর্জ ডব্লিউ বুশ ফাউন্ডেশনের একজন সিনিয়র ফেলো।
কিন্তু এখনো একটি উদ্বেগের বিষয় হল যে, নির্ভরযোগ্য তথ্য এখনও পুতিনের বদ্ধ জগতে প্রবেশ করতে পারছে না। ইউক্রেন আক্রমণের আগে তার গোয়েন্দারা তাকে এমন কিছু বলতে চায়নি যা তিনি শুনতে চান না। তারা বরং ইউক্রেন আক্রমণ নিয়ে তাকে গালগল্প শুনিয়েছেন এবং যুদ্ধের আগেই কীভাবে রাশিয়ান সৈন্যদের সাদরে গ্রহণ করা হবে সেই দিবাস্বপ্ন দেখিয়েছেন। এবং এই সপ্তাহে একজন পশ্চিমা কর্মকর্তা বলেছেন যে, পুতিন এখনও ইউক্রেনে তার সৈন্যদের দিন কতটা খারাপ যাচ্ছে সে সম্পর্কে জানেন না, যতটা জানে পশ্চিমা গোয়েন্দারা। আর এ কারণেই, রাশিয়া বড় ধরনের কোনো খারাপ পরিস্থিতির মুখোমুখি হলে পুতিন কীভাবে প্রতিক্রিয়া দেখাবেন তা নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে পশ্চিমা বিশ্বে।
ম্যাডম্যান তত্ত্ব
পুতিন নিজেই ছোটবেলায় তার ইঁদুর তাড়ানোর একটি গল্প বলেছেন। পুতিন বলেন, যখন তিনি ইদুরটিকে তাড়িয়ে ঘরের একটি কোণে নিয়ে গেলেন, তখন ইঁদুরটি তাকে আক্রমণ করে প্রতিক্রিয়া দেখায়, আর এতে যুবক ভ্লাদিমির পুতিন পালিয়ে যেতে বাধ্য হন। পশ্চিমা নীতিনির্ধারকেরা যে প্রশ্নটি করছেন, তা হল, পুতিন এখন ওই ইঁদুরের মতো কোণঠাসা বোধ করলে কী করবেন?
একজন পশ্চিমা কর্মকর্তা বলেছেন, ‘প্রশ্ন হল যে, তিনি কি আরও বেশি বর্বরতার সঙ্গে দ্বিগুণ শক্তি নিয়ে হামলা করবেন এবং আরও ভয়ংকর অস্ত্র ব্যবহার করবেন, যেসব তিনি গত কয়েক বছরে বানিয়েছেন’। তিনি রাসায়নিক অস্ত্র বা এমনকি কৌশলগত পারমাণবিক অস্ত্রও ব্যবহার করতে পারেন, এমন উদ্বেগও রয়েছে।
‘সবচেয়ে দুশ্চিন্তার বিষয় হল, তিনি আবার পারমাণবিক বোমার বোতাম টিপে দেওয়ার মতো ভয়ানক কিছু করে বসেন কিনা’, বলছেন অ্যাড্রিয়ান ফার্নহ্যাম।
পুতিন নিজেও হয়তো উদ্দেশ্য প্রণোদিতভাবে তার নিজের সম্পর্কে এই ধারণা তৈরি করে পশ্চিমাদের সঙ্গে খেলে থাকতে পারেন যে, তিনি বিপজ্জনক বা অযৌক্তিক। এটি একটি সুপরিচিত কৌশল। এই কৌশলকে বলা হয় ‘ম্যাডম্যান’ থিওরি বা ‘পাগল ব্যক্তি’ তত্ত্ব। পুতিন হয়তো এমন আচরণ করছেন যাতে তার হাতে পারমাণবিক অস্ত্র আছে এই ভয়ে শত্রুরা পিছিয়ে যায়। যাতে শত্রুরা মনে করে পৃথিবীর সব মানুষ ধ্বংস হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা আছে এমনটা জানা সত্ত্বেও এই পাগল ব্যক্তি পারমাণবিক বোমার বোতাম টিপে দিতে পারেন।
পশ্চিমা গুপ্তচর এবং নীতিনির্ধারকদের জন্য পুতিনের উদ্দেশ্য এবং মন-মানসিকতা বোঝার গুরুত্ব এখনই সবচেয়ে বেশি। কারণ এর মধ্য দিয়ে তারা বুঝতে পারবেন পুতিনকে ঠিক কত দূর পর্যন্ত কোণঠাসা করা যাবে, এবং কতক্ষণ পর্যন্ত তিনি পারমাণবিক বোমা হামলার মতো ভয়ানক কিছু করবেন না। আর কোন সীমা অতিক্রম করলে তিনি পারমাণবিক বোমা হামলার মতো ভয়ানক কিছু করে বসবেন।
কেন ডেকলেভা বলেন, ‘পুতিনের মনে ব্যর্থতা বা দুর্বলতার জন্য কোনো জায়গা নেই। তিনি এই ধরনের জিনিসকে ঘৃণা করেন। একজন কোণঠাসা, দুর্বল পুতিন আরও বিপজ্জনক পুতিন। কখনও কখনও ভালুকটিকে খাঁচা থেকে বেরিয়ে বনে ফিরে যেতে দেওয়া ভালো’।