ঢাকা শহরের জীবনযাপনের নানাবিধ সমস্যার মধ্যে অন্যতম একটি যানজট। সবচেয়ে কম যানজটের দিনেও এখানে মানুষজন নির্ধারিত সময়ের চেয়ে হাতে ন্যূনতম ৩০ মিনিট রেখে গন্তব্যে বের হন।
জীবনযাত্রায় এই যানজট এত বেশি প্রভাব রাখছে তারপরও কেন রাজধানীর মতো একটা জায়গায় যানজট কমানো যাচ্ছে না এই আলোচনা দীর্ঘদিনের। কিন্তু সমাধান মিলছে না বা মেলেনি। নানা সময়ে যখনই যানজটে জীবন অতিষ্ঠ হয়ে ওঠে তখনই আলাপ ওঠে আবার স্তিমিত হয়ে যায়।
সম্প্রতি ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের মেয়র আতিকুল ইসলাম যানজটের একটি ডেমো সমাধানের কথা বলেছেন। তিনি বলেছেন, ‘রাজধানীতে সড়কের নিয়ন্ত্রণ যদি সিটি করপোরেশন পায় তবে জোড় দিনে জোড় সংখ্যার নিবন্ধনের গাড়ি চলবে আর বিজোড় দিনে বিজোড় সংখ্যার।’
তবে, তার এই ডেমোর সমালোচনা করেছেন অনেকে। তারা বলছেন, যাদের টাকা আছে তারা দুটো করে গাড়ি কিনবেন। এসে সমস্যার সমাধান হবে না। বরং সমস্যা আরো বেড়ে যেতে পারে।
গত কয়েক দিন ধরেই ফের রাজধানীতে চিরাচরিত যানজটের দেখা মিলছে। এই যানজট বাড়ার অন্যতম কারণ হিসেবে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খোলার কথা জানিয়েছে ট্রাফিক বিভাগ।
যানজটের অবস্থা এমন দাঁড়িয়েছে ঘণ্টার পর ঘণ্টা গাড়িতেই কাটিয়ে দিতে হচ্ছে যাত্রীদের। গাড়ির চালক জ্যামে বসে ঘুমিয়েছে এমন দৃশ্যও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকের কল্যাণে দেখা যাচ্ছে।
আজ সোমবার রাজধানীর জ্যামের অবস্থা প্রায় অপরিবর্তিত। ৪০ মিনিটের রাস্তায় সময় লেগেছে স্থান বিশেষে দেড় ঘণ্টা থেকে দুই ঘণ্টা।
রাজধানীর মালিবাগ থেকে জাকির নামে এক চাকরিপ্রত্যাশী বাসে উঠেছেন কাঁটাবন সিগনালের উদ্দেশ্যে। অন্য সময়ে বড়জোর সময় লাগে ৩৫ থেকে ৪০ মিনিট। তিনি সকাল সাড়ে এগারোটায় উঠে গন্তব্যে নেমেছেন দুপুর দেড়টার দিকে।
শুধু মালিবাগ-শাহবাগ রুটেই নয়। রাজধানীর প্রায় রুটেই দেখা গেছে এই চিত্র।
আফতাবনগর থেকে কারওয়ান বাজার আসেন জলিল হোসেন নামের এক ব্যক্তি। হাতিরঝিলের ভেতরেও তীব্র যানজট পেয়েছেন তিনি। পরে এফিডিসি মোড় থেকে হেঁটে কারওয়ান বাজার পৌঁছেছেন। সব মিলিয়ে সময় লেগেছে প্রায় দেড় ঘণ্টা, যেখানে স্বাভাবিক সময়ে সর্বোচ্চ ৪৫ মিনিট লাগে। ওই সময় কাজী নজরুল ইসলাম অ্যাভিনিউতেও যানবাহনের তীব্র চাপ দেখেছেন তিনি।
মোহাম্মদপুরের সলিমুল্লাহ রোড থেকে নিয়মিত সাইকেলে কারওয়ান বাজার আসেন সাঈদ হাসান। তিনি বলেন, ফার্মগেটের আশপাশের এলাকায় তীব্র যানজট ছিল। স্বাভাবিক সময়ের তুলনায় আজ তার দ্বিগুণ সময় লেগেছে।
বিকেলে পান্থপথ এলাকাতেও ছিল তীব্র যানজট। সেখান থেকে সোনারগাঁও মোড় পর্যন্ত মোটরসাইকেলে আসতে এক আরোহীর প্রায় ৪০ মিনিট সময় লেগেছে, অন্য সময় ১০ মিনিটের মতো লাগে। তিনি বলেন, আজকের যানজট ভয়াবহ ছিল।
ভুক্তভোগী যাত্রীরা বলছেন, তারা যানজটের বিষয়ে কর্তৃপক্ষের একই বক্তব্য শুনতে চান না। এর সমাধান চান।
আজকের যানজট পরিস্থিতি সম্পর্কে জানতে চাইলে ঢাকা মহানগরের অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার (ট্রাফিক) মো. মুনিবুর রহমান বলেন, প্রায় দুই বছর পর শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খুলে দেওয়া এবং উন্নয়নমূলক কাজের জন্য কিছু রাস্তার প্রস্থ কমে যাওয়ায় যানজট বেড়েছে। পরিস্থিতি সহনীয় রাখতে ট্রাফিক পুলিশ সর্বোচ্চ চেষ্টা করে যাচ্ছে।
এমন পরিস্থিতি এক দিনে তৈরি হয়নি বলে মনে করেন নগরবিদেরা। তারা মনে করেন, অপরিকল্পিত নগরায়ণ, রাস্তার স্বল্পতা, ব্যক্তিগত গাড়ি বৃদ্ধি, ফুটপাত ও রাস্তা দখল, গণপরিবহনের অব্যবস্থাপনা এবং সমন্বয়হীনতা- প্রভৃতি প্যাকেজ সমস্যা মিলে এই যানজট পরিস্থিতি তৈরি হয়।
এ বিষয়ে নগর পরিকল্পনাবিদ অধ্যাপক আদিল মুহাম্মদ খান বলেন, শুধু মেট্রোর ওপর ভরসা না করে মূল সড়ক ও কমিউনিটিভিত্তিক সড়ক ব্যবস্থাপনার প্রতি জোর দিতে হবে, তবে সমাধান সম্ভব। মেট্রোর সঙ্গে মূল সড়কে উন্নত বাস সার্ভিস চালু করতে হবে। রিকশার বিকল্প হিসেবে কমিউনিটিভিত্তিক সেবা চালু করতে হবে। মিনিবাস, উন্নতমানের লেগুনা এর বিকল্প হতে পারে।