১৯৫৮ সালে ফরাসি শিল্পী ইভেস ক্লেইন প্যারিসের একটি গ্যালারিতে ‘দ্য ভয়েড’ শিরোনামে একটি শিল্প প্রদর্শনীর আয়োজন করেছিলেন। প্রদর্শনীতে গ্যালারির একটি খালি ঘরে শুধু একটি বড় ক্যাবিনেট স্থাপন করেছিলেন ক্লেইন। যেখানে কোনো দৃশ্যমান শিল্পকর্ম ছিল না। হাজার হাজার মানুষ টাকা দিয়ে টিকিট কেটে প্যারিসের ওই গ্যালারিতে উপস্থিত হয়েছিলেন সেই অদৃশ্য শিল্পকর্ম দেখার জন্য!
ওই শো-এর সাফল্যের পর ইভেস ক্লেইন তার ধারণাটিকে আরও এক ধাপ এগিয়ে নিয়ে যান। শিল্প সংগ্রাহকদেরকে তিনি বাস্তব অস্তিত্বহীন এবং সম্পূর্ণ ধারণাগত অদৃশ্য জায়গাকে শিল্প কর্ম হিসেবে কেনার আহ্বান জানান! তাও আবার বিশুদ্ধ সোনার বিনিময়ে! মুষ্টিমেয় কিছু ক্রেতা তার সেই প্রস্তাবে লুফেও নেন!
ক্লেইনের মৃত্যুর প্রায় ৬০ বছর পরে সম্প্রতি তার সেই অদৃশ্য শিল্পকর্মের মালিকানা প্রমাণ করার জন্য তিনি যে রসিদ লিখেছিলেন তার একটি বিক্রির জন্য নিলামে তোলা হচ্ছে। নিলাম হাউস সোথেবির অনুমান যে, এর দাম ৫ লাখ ইউরো (৫,৫১০০০ ডলার) পর্যন্ত উঠতে পারে!
৮ ইঞ্চিরও কম চওড়া রসিদটি ক্লেইনের কাল্পনিক স্থানগুলোর একটির মালিকানার দলিল। ক্লেইন তার ওই শিল্পকর্মকে নাম দিয়েছিলেন ‘অবস্তুগত চিত্র সংবেদনশীলতার অঞ্চল’। রসিদটিকে একটি ব্যাঙ্কের চেকের মতো করে ডিজাইন করা হয়েছে। এতে শিল্পী ক্লেইনের স্বাক্ষরও রয়েছে। যা ৭ ডিসেম্বর, ১৯৫৯ তারিখে ইস্যু করা হয়।
রসিদটি মূলত প্রাচীন জিনিসপত্রের ডিলার জ্যাক কুগেলকে দেওয়া হয়েছিল। যে কয়েকটি রশিদ টিকে থাকার কথা ভাবা হয়েছিল তাদের মধ্যে এটি একটি। এক প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে জানিয়েছে নিলাম হাউস সোথেবি।
ক্লেইন তার গ্রাহকদের বলেছিলেন, তারা তাদের রসিদটি সংরক্ষণ করে রাখতে পারেন বা পুড়িয়েও ফেলতে পারেন।
আরা যারা সেটি পুড়িয়ে ফেলবেন তারাই তার ধারণাগত শিল্পকর্মের ‘নিশ্চিত মালিক’ হিসেবে বিবেচিত হবেন। ক্লেইন তার পারফরম্যান্স শিল্প কর্মের অংশ হিসেবে প্যারিসের সেইন নদীতে অর্ধেক স্বর্ণ ডুবিয়ে দেওয়ার পর সাক্ষীদের উপস্থিতিতে রসিদগুলো পুড়িয়ে ফেলতেন।
কিন্তু কুগেল তার রসিদটি রেখে দিয়েছিলেন। তার এই রসিদ লন্ডনের হেওয়ার্ড গ্যালারি এবং প্যারিসের সেন্টার পম্পিডো সহ ইউরোপ জুড়ে প্রধান প্রধান শিল্প প্রতিষ্ঠানে প্রদর্শিত হয়েছে। লোয়িক ম্যাল্লে নামের এক শিল্প উপদেষ্টা এবং সাবেক শিল্প গ্যালারি মালিক এটিকে নিলামে তুলেছেন। তিনি তার ব্যক্তিগত সংগ্রহ থেকে ১০০টিরও বেশি আইটেম সম্প্রতি নিলামে তুলেছেন।
ক্লেইনের ধারণাকে এনএফটি-র সঙ্গে তুলনা করে নিলাম হাউস সোথেবি বলেছে যে, তারা এর জন্য ক্রিপ্টোকারেন্সির মাধ্যমে পেমেন্ট গ্রহণ করবে।
নিলামের ক্যাটালগে বলা হয়েছে, ‘কেউ কেউ ক্লেইনের অদৃশ্য শিল্প কর্মের ধারণাকে এনএফটির পূর্বপুরুষ হিসেবে অভিহিত করেছেন। কারণ এনএফটিও অবস্তুগত জিনিসের বিনিময় করে থাকে। বর্তমানের বিপ্লবী ধারনা ‘ব্লকচেইন’ এর সঙ্গেও ক্লেইনের ধারনার মিল রয়েছে’।
সোথেবি এক প্রেস রিলিজে এটাও নিশ্চিত করেছে যে, রসিদটির নিলাম বিজয়ী ‘এই ঐতিহাসিক রসিদের মালিক হওয়ার পাশাপাশি ক্লেইনের অদৃশ্য শিল্পকর্মেরও মালিক হবেন’।
১৯৬২ সালে না ফেরার দেশে চলে যাওয়া ইভেস ক্লেইন ন্যুভ রিয়ালিজম (নতুন বাস্তববাদ) আন্দোলনের একজন প্রধান ব্যক্তিত্ব। এই আন্দোলনের মানুষরা বাস্তবতা সম্পর্কে দর্শকদের ধারণাকে উল্টে দেওয়ার জন্য শিল্পকে ব্যবহার করেছিলেন। ১৯৫৭ সালে তিনি মিলানে আকৃতি, ছায়া এবং আকারে অভিন্ন ১১টি নীল ক্যানভাস সমন্বিত একটি প্রদর্শনী করেন। তবে তার সবচেয়ে বিখ্যাত কাজ হল ১৯৬০ সালের ফটোগ্রাফ ‘লিপ ইন দ্য ভয়েড’, যেটিতে শিল্পীকে একটি উঁচু প্রাচীর থেকে লাফ দিতে দেখা যায়। সেটি আসলে দুটি পৃথক চিত্রের সম্মিলন ছিল।