ইউক্রেনের যুদ্ধে রাশিয়ানদের জয় পাওয়ার সম্ভাবনা কমছে এবং তারা এতে হেরেও যেতে পারে। রাশিয়ান নেতা ভ্লাদিমির পুতিনের জন্য কোনটিই ভাল নয়, যা তিনি স্নায়ু যুদ্ধের একজন অভিজ্ঞ সৈনিক এবং রাশিয়ান ইতিহাসের ছাত্র হিসেবে খুব ভালো করেই জানেন।
রাশিয়ানরা শেষবার যুদ্ধে হেরেছিল ১৯৮০-র দশকে, আফগানিস্তানে। ১৯৭৯ সালে আক্রমণের পর প্রথমে দ্রুত বিজয় পেলেও পরে রুশ সেনারা আফগানিস্তানে দেশব্যাপী বিদ্রোহের মুখোমুখি হয়েছিল। প্রথমে ওই বিদ্রোহ রাশিয়ার কিছুই করতে পারেনি। কারণ রাশিয়ানরা আফগান আকাশ সম্পূর্ণরূপে নিজেদের নিয়ন্ত্রণে রাখতে পেরেছিল।
মার্কিন রাষ্ট্রপতি জো বাইডেন আজ যেভাবে দ্বিধাদ্বন্দ্বের মুখোমুখি হচ্ছেন তখনো সেভাবেই রিগ্যান প্রশাসনও সোভিয়েতদের সঙ্গে সম্ভাব্য পারমাণবিক সংঘর্ষের আশঙ্কা করেছিল এবং প্রাথমিকভাবে আফগান বিদ্রোহীদের বিমান-বিধ্বংসী অস্ত্র দিতে অনিচ্ছুক ছিল।
জিন্তু ১৯৮৬ সাল নাগাদ আফগানদেরকে অস্ত্র দিতে প্রেসিডেন্ট রিগ্যানের কর্মকর্তাদের অনীহা বাষ্পীভূত হয়ে গিয়েছিল। এরপর সিআইএ আফগানদেরকে স্টিংগার এন্টি-এয়ারক্রাফ্ট ক্ষেপণাস্ত্র দেয়। যার ফলে আফগান আকাশে সোভিয়েতদের নিয়ন্ত্রণের অবসান ঘটেছিল। এবং যুদ্ধক্ষেত্রে সোভিয়েত বাহিনীর উল্লেখযোগ্য ক্ষয়ক্ষতি করার জন্য আফগানদের ক্ষমতা ব্যাপকভাবে বেড়ে গিয়েছিল।
যুদ্ধে হেরে যাচ্ছে বুঝতে পেরে সোভিয়েতরা ১৯৮৯ সালের ফেব্রুয়ারিতে আফগানিস্তান থেকে সেনা প্রত্যাহার করে এবং কাবুলে একটি পুতুল আফগান কমিউনিস্ট সরকারকে ক্ষমতায় বসায়। সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের তিন বছর পর সেই আফগান কমিউনিস্ট সরকারেরও পতন ঘটে।
নয় বছরেরও বেশি সময় ধরে চলা আফগান যুদ্ধের সময় রাশিয়ার সরকারী হিসাবে সোভিয়েত সেনা নিহতের সংখ্যা ছিল প্রায় ১৫ হাজার। সম্প্রতি সিএনএনকে দেওয়া ন্যাটোর ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের অনুমান অনুসারে বলা যায় যে, ইউক্রেনে মাত্র এক মাসেই রাশিয়ানরা ইতিমধ্যেই ১৫ হাজার সৈন্য হারিয়েছে। আর এই সংখ্যা পুতিনকে ঝুঁকিতে ফেলে দিয়েছে।
১৯৮৯ সালে সোভিয়েত সামরিক বাহিনী আফগানিস্তান ছাড়ার পর ইউরোপের দেশগুলোর জনগণের মনে প্রশ্ন উঠে, ভীত সোভিয়েত সেনাবাহিনী যদি আফগান গেরিলা বাহিনীর বিরুদ্ধে তার নিজের সীমান্তেই যুদ্ধে জিততে না পারে, তাহলে পূর্ব জার্মানি, হাঙ্গেরি এবং পোল্যান্ডের ভাগ্য নিয়ন্ত্রণ করবে কীভাবে?
আফগানিস্তানে সোভিয়েত যুদ্ধের ব্যর্থতা সোভিয়েত সাম্রাজ্যের কফিনে একটি বিশাল পেরেক ঠুকে দেয়। এর মাত্র কয়েক মাস পরেই বার্লিন প্রাচীরের পতন ঘটে। সোভিয়েত জোয়াল ঝেড়ে ফেলে পূর্ব ও পশ্চিম জার্মানি এক হয়ে যায়।
পুতিন তখন যুবক বয়সী এবং পূর্ব জার্মানিতে কেজিবির গোয়েন্দা অফিসার হিসেবে কর্মরত ছিলেন। পুতিন যখন সোভিয়েত সামরিক ইউনিটের কাছ থেকে তার কী করা উচিত সে সম্পর্কে নির্দেশনা চেয়েছিলেন, তখন তাকে বলা হয়েছিল, ‘মস্কো নীরব’। তারপর থেকেই পুতিন রাশিয়ার পুরোনো গৌরব যতটা সম্ভব পুনরুদ্ধার করার লক্ষ্য নিয়ে মস্কোর নীরবতা উল্টানোর চেষ্টা করছেন।
সোভিয়েতরা যেমন আফগান যুদ্ধে তাদের পরাজয়ের মাধ্যমে পূর্বাবস্থায় ফিরে গিয়েছিল, তেমনি ২০ শতকের গোড়ার দিকে এক সামরিক পরাজয়ের মাধ্যমে রোমানভ রাজতন্ত্রেরও পতন ঘটেছিল। রাশিয়ার উপর রোমানদের তিনশ বছরের রাজত্বের অবসান ঘটিয়েছিল ওই পরাজয়।
জার দ্বিতীয় নিকোলাস এর নির্বোধ নেতৃত্বে ১৯০৫ সালের রুশো-জাপানিজ যুদ্ধে রাশিয়ার বিপর্যয়ের মধ্য দিয়ে আধুনিক যুগে প্রথমবারের মতো একটি এশিয়ান শক্তির হাতে কোনো ইউরোপীয় শক্তির পরাজয় ঘটেছিল। এরপর প্রথম বিশ্বযুদ্ধে পরাজয়ের ফলে শীঘ্রই রুশ-জাপানি যুদ্ধের ক্ষতি আরও বেড়ে যায় রাশিয়ার। অন্যান্য কারণের সঙ্গে সেই ক্ষতিগুলো ১৯৭১ সালে দ্বিতীয় নিকোলাসকে ক্ষমতা থেকে উৎখাত করে এবং পরবর্তীতে সোভিয়েতদের উত্থান ঘটায়।
বিপরীতে, জোসেফ স্টালিন দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ থেকে বিজয়ী হয়ে আবির্ভূত হন। যদিও আনুমানিক আড়াই কোটিরও বেশি রাশিয়ান নিহত হওয়ার মতো বিশাল মূল্য দিতে হয়েছিল রাশিয়াকে। রাশিয়ায় ‘মহান দেশপ্রেমিক যুদ্ধ’ হিসাবে পরিচিত এই বিজয় স্ট্যালিনকে একজন খুনি স্বৈরশাসক হিসেবে তার শাসন চালিয়ে যেতে সাহায্য করেছিল।
চলতি মাসের শুরুর দিকে দ্য ইকোনমিস্টের একটি সংস্করণে ‘রাশিয়ার স্ট্যালিনাইজেশন’ শুরু হয়েছে বলে ঘোষণা করা হয়, যা নিশ্চিতভাবে পুতিনের লক্ষ্য। কিন্তু নব্য-স্ট্যালিনবাদী হওয়া কঠিন হবে যদি পুতিন পরাজিত হন। এবং পুতিনের জন্য ইউক্রেনকে হারানো প্রশ্নের বাইরে নয়।
তবে মার্কিন কর্মকর্তারা সতর্ক করে রেখেছেন যে, কোণঠাসা হয়ে পড়লে পুতিন রাসায়নিক বা জীবাণু অস্ত্র ব্যবহার করতে পারেন।
মঙ্গলবার সিএনএন-এর ক্রিশ্চিয়ান আমানপুরের সঙ্গে কথা বলার সময় পুতিনের প্রধান মুখপাত্র দিমিত্রি পেসকভ রাশিয়ার পারমাণবিক অস্ত্র ব্যবহারের সম্ভাবনাকেও উড়িয়ে দেননি। তিনি বলেছেন, অস্তিত্বের সংকটে পড়লে রাশিয়া পারমাণবিক অস্ত্রও ব্যবহার করবে।
ইউক্রেনে পুতিনের পছন্দের যুদ্ধ তাকে এমন এক পর্যায়ে নিয়ে যেতে পারে যেখানে তিনি গণবিধ্বংসী অস্ত্র ব্যবহার করবেন। এবং তারপরেও, তিনি এই যুদ্ধ হেরে যেতে পারেন।
পুতিন যেভাবে রাশিয়ার গৌরব পুনরুদ্ধারের স্বপ্ন দেখেছিলেন তা নিশ্চয়ই এমন ছিল না। তার এই স্বপ্ন দ্রুত ছাইয়ে পরিণত হচ্ছে। ঠিক যেভাবে পুতিন ইউক্রেনের মারিওপোল শহরকে ছাইয়ে পরিণত করেছেন।