ময়মনসিংহের ত্রিশালে ৩৫ দিন বয়সী এক কন্যাশিশুর মরদেহ উদ্ধার করেছে পুলিশ। এ নিয়ে ত্রিশাল থানায় অজ্ঞাত আসামি করে একটি মামলাও হয়েছে।
তবে, শিশুটির মৃত্যুর বিষয়ে কাউকে দায়ী করতে চান না পরিবার। শিশুটির পরিবার বলছে, শিশুটিকে জিনে মেরে ফেলেছে। জিনে মেরে ফেলার প্রমাণ হিসেবে তারা জানিয়েছে, শিশুটির জন্মের সাত আট মাস আগে থেকেই জিন শিশুটির বিষয়ে তাদের অবগত করেছে। শিশুটিকে মেরে ফেলার হুমকি তখন থেকেই।
অবশ্য আইনের ভেতর দিয়েই যেতে হচ্ছে পুলিশকে। তারা শিশুটির মাকে গ্রেপ্তার করেছে। জিজ্ঞাসাবাদের জন্য রিমান্ডও চেয়েছেন।
গত বুধবার (২৩ মার্চ) দুপুর আনুমানিক ১২টার দিকে পুকুর থেকে শিশুটিকে উদ্ধার করে হাসপাতালে নেয়া হলে কর্তব্যরত চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন।
পারিবারিক সূত্র জানায়, উপজেলার মঠবাড়ী ইউনিয়নে মঠবাড়ী গ্রামে শিশুটির মা সোনিয়া আক্তার তাকে ঘুম পাড়িয়ে রান্না করতে যান। এ সময় শিশুটির কাছে রেখে যান নয় বছর বয়সী তার আরেক সন্তানকে। নয় বছর বয়সী শিশুটি পাশের রুমে মোবাইল আনতে গিয়ে ফিরে দেখেন শিশুটি বিছানায় নেই। পরে পরিবার বিষয়টি জানলে খোঁজাখুঁজির কিছুক্ষণ পর তার নিথর দেহ পাওয়া যায় পুকুরে।
এ রহস্যজনক শিশু মৃত্যুর ঘটনায় ছায়া তদন্তে মাঠে নেমেছে পিবিআই। ময়মনসিংহের পিবিআই ইন্সপেক্টর মো. দেলোয়ার হোসাইন বলেন, আমরা ময়মনসিংহের একটি ক্রাইম সিন টিম ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে ছায়া তদন্ত করেছি।
এ ঘটনা নিয়ে এলাকায় জিন আতঙ্ক বিরাজ করছে। নিহত শিশুটি একই গ্রামের সুমন মিয়ার মেয়ে তুবা (৩৫ দিন)। সুমন মিয়া স্থানীয় পোড়াবাড়ী বাজারের ওষুধ ব্যবসায়ী।
এ বিষয়ে মঠবাড়ী ইউনিয়ন আ. লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক ও শিশুটির পরিবারের লোক আব্দুল বারেক মেম্বার বলেন, এক থেকে দেড় বছর আগে এখানে থাকা নারিকেল গাছ কাটার পর থেকে জিনের অত্যাচারটা বেড়ে গেছে। আমার এক চাচি জিনের আক্রমণে আহত হয়েছিলেন। অনেক চিকিৎসার পর সুস্থ হয়েছেন। বাচ্চার মা যখন আট মাসের গর্ভবতী ছিল তখন জিন যখন আছর করত তখন বলত তর বাচ্চা দিয়ে দিতে হবে, তর বাচ্চা আমরা নিয়ে নেব। এ কথা জানার পর বিভিন্ন জায়গায় কবিরাজ-মলনার কাছে বাচ্চার মাকে নিয়ে যাওয়া হলেও জিন হাজির হয়ে একই কথা বলত। আমাদের বাচ্চা মাইরা ফালাইছে নারিকেল গাছ কাইট্টা। বাচ্চা আমরা নিয়েই নেব। সবার সম্মতিতে এ রকম অবস্থায় বাচ্চার মাকে নিরাপত্তার জন্য তার বাপের বাড়িতে কিছুদিনের জন্য পাঠিয়ে দেওয়া হয়। বাচ্চা হওয়ার কিছুদিন পরে সে বাচ্চাকে নিয়ে বাড়িতে আসলে এ ঘটনাটি ঘটে।
সরেজমিন কথা বললে প্রতিবেশী হারুনুর রশীদ, সাইদুল ইসলাম, মাহমুদা আক্তারসহ আরও কয়েকজন একই ধরনের বর্ণনা দেন।
মামলার অভিযোগ থেকে জানা যায়, গত বুধবার (২৩ মার্চ) সকাল ৯টায় সুমন তার স্ত্রী সোনিয়া আক্তার, ছেলে হামিম ও নিহত নবজাতক তুবাকে তাদের বাড়িতে রেখে পোড়াবাড়ী বাজার ওষুধের দোকানে আসলে দুপুর ১২টায় সুমনের মায়ের নম্বর থেকে কল আসে তুবাকে পাওয়া যাচ্ছে না। খবর পেয়ে সুমন দ্রুত বাড়ি রওনা হলে পথিমধ্যে সুমনের ছোট ভাই শফিকুল ইসলাম আবারো মোবাইল ফোনে সুমনকে কল দিয়ে জানান শিশুটি বাড়ির পশ্চিমপাশে পুকুরে হাঁটু পানিতে পাওয়া গেছে। পরে সুমন তাড়াহুড়া করে বাড়িতে গিয়ে শিশু তুবাকে চিকিৎসার জন্য ত্রিশাল উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে আসলে কর্তব্যরত চিকিৎসক শিশুটিকে মৃত ঘোষণা করেন। পরে থানা-পুলিশ লাশ উদ্ধার করে থানায় নিয়ে আসে।
এ বিষয়ে ত্রিশাল থানার অফিসার ইনচার্জ মাইন উদ্দিন বলেন, মামলাটি একেবারেই প্রাথমিক পর্যায়ে রয়েছে। শিশুটির লাশ উদ্ধার করে ময়নাতদন্ত শেষে পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। আর শিশুর মাকে জেলহাজতে প্রেরণ করা হয়েছে। জিজ্ঞাসাবাদের জন্য রিমান্ডও চাওয়া হয়েছে।
শিশুর বাবা সুমন মোবাইল ফোনে কাঁদতে কাঁদতে বলেন, আমরা সবাই নির্দোষ, আমার ওয়াইফেকে অযথাই ধইরা নিয়া গেছে। আমার ওয়াইফের কোনো দোষ নাই। আমার বাচ্চা স্ত্রীর পেটে আসার ৭/৮ মাস থেকেই জিনে বলছে আমাদের বাচ্চা নাই, বাচ্চা আমাদের দিয়া দে। আমরা নিয়া পালবাম। না দিলে তর বাচ্চা খেয়ে ফেলবো। আমরা অনেক কবিরাজ দেখাইছি। আমার স্ত্রীর কোনো দোষ নাই। একেবারে নির্দোষ। স্বতঃস্ফূর্তভাবে আমরা কোনো মামলা-ই করব না।
তিনি জানান, পরে পুলিশ বলে, ‘আমরা আইনের বাইরে যেতে পারব না, এটা মামলার ধারা। আমার সন্তানরে হারাইলাম বউয়েরেও হারাইলাম। আমার বউ একবারে নির্দোষ। আমাগোরে হুদাই একটা মামলা দিছে, আমরা মামলা করতাম না। কী পরীক্ষা আল্লাহ নিচ্ছ, এমনে করে আল্লাহ পরীক্ষা নেয়! আমার স্ত্রী থাকে জেলখানায় আমি থাকি বাড়িতে। আমরা কত কইছি দারোগারে, দারোগা হুনেই না, বলে আমরা আইনের বাইরে কিছুই করবার পাইতাম না, এইযে বুঝাইছি কিছুই বুঝে না তারা।