দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি ও দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে আজ সোমবার জাতীয় সংসদে সরকার ও বিরোধী দলের সদস্যদের মধ্যে পাল্টাপাল্টি বিতর্ক হয়েছে।
জাতীয় পার্টির মহাসচিব মুজিবুল হক চুন্নু নিজে বাজার যাওয়ার দাবি করে বলেছেন, জিনিসপত্রের দাম অনেক বেড়েছে। জবাবে তথ্য ও সম্প্রচারমন্ত্রী হাছান মাহমুদ বলেন, জাতীয় পার্টির মহাসচিব বাজারে না গিয়ে বাজার যাওয়ার দাবি করছেন।
সংসদে পয়েন্ট অব অর্ডারে অনির্ধারিত বিতর্কে এই বিতর্ক হয়। এ সময় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সংসদের বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন। এর আগে বিকেলে স্পিকার শিরীন শারমিন চৌধুরীর সভাপতিত্বে সংসদের বৈঠক শুরু হয়।
দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ নিয়ে মুজিবুল হক চুন্নু নিজে বাজার যান উল্লেখ করে বলেন, ‘জিনিসপত্রের দাম অনেক বেড়েছে। সরকারের উদ্যোগ তেমন কোনো কাজে আসছে না। মনে হয় না সরকারের কোনো নিয়ন্ত্রণ আছে।'
এর জবাবে তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রী হাছান মাহমুদ বলেন, সরকারের পদক্ষেপে সয়াবিন তেল ও পেঁয়াজসহ বিভিন্ন জিনিসের দাম কমতে শুরু করেছে। জাতীয় পার্টির মহাসচিব বাজারে না গিয়ে বাজার যাওয়ার দাবি করেছেন। তিনি অসত্য বক্তব্য দিয়েছেন।
এ ছাড়া ওয়ার্কার্স পার্টির সভাপতি রাশেদ খান মেনন, বিএনপির যুগ্ম-মহাসচিব হারুনুর রশীদ এবং বিএনপির সংরক্ষিত আসনের সদস্য রুমিন ফারাহানা দুর্নীতি, আইনশৃঙ্খলা ও দ্রব্যমূল্য নিয়ে বক্তব্য রাখেন।
মুজিবুল হক চুন্নু পয়েন্ট অব অর্ডারে দাঁড়িয়ে বলেন, ‘সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রী বলেছেন দেশে যে উন্নয়ন হচ্ছে, যারা দেখে না তাদের চোখ নষ্ট। তাদের ডাক্তার দেখাতে হবে। প্রধানমন্ত্রীকে আশ্বস্ত করছি, আমরা দেখতে পাচ্ছি। উন্নয়ন হচ্ছে অনেক কিছুর। কিন্তু আমরা আরও দেখতে পাচ্ছি দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধির কারণে মানুষের হাহাকার অবস্থা। আমাদের বাণিজ্যমন্ত্রী বলেছিলেন নিত্যপণ্য আমাদের অনেক আছে। অভাব নেই। তারপরও সব জিনিসপত্রের দাম অনেক বাড়ছে।’
তিনি বলেন, ‘শুধু তাই নয় খাদ্যমন্ত্রী বলেছেন এযাবৎকালের সর্বোচ্চ খাদ্য প্রায় ২০ লাখ টন খাদ্য মজুত আছে। তারপরও চালের মূল্য এত বেশি বেড়ে গেল কী কারণে? আমি নিজেও বাজারে যাই। বাজারে গেলে মনে হয় না, সরকার আছে। মনে হয় না সরকারের কোনো প্রকার নিয়ন্ত্রণ আছে।’
এ সময় বিদ্যুৎ প্রতিমন্ত্রীর দৃষ্টি আকর্ষণ করে এই সংসদ সদস্য বলেন, ‘এই যে বিদ্যুতের বিষয়টি আমার এলাকা করিমগঞ্জ-তারাইলে গত কয়েক দিন ধরে ২৪ ঘণ্টার মধ্যে মাত্র ৫ ঘণ্টা বিদ্যুৎ থাকে। বাকি ১৮ ঘণ্টা বিদ্যুৎ নেই। এই গরমে অসম্ভব কষ্টের মধ্যে আছি। বিদ্যুৎ মন্ত্রীকে বলব আমার কথা নোট করেন, দেখেন সত্য কী না?’
চুন্নুর বক্তব্যের জবাবে তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রী ড. হাছান মাহমুদ দাবি করেন ১ কোটি কার্ড বিতরণের পর বাজারে জিনিসপত্রের দাম কমেছে। চুন্নু সংসদে অসত্য বক্তব্য দিয়েছেন দাবি করে তাকে উদ্দেশ্য করে তথ্যমন্ত্রী বলেন, ‘আপনি বাজারে যান বলেছেন। আপনি আসলে বাজারে যান না। আমি বাজারে যাই। এই এক কোটি মানুষকে কার্ড বিতরণের পর অনেক পণ্যের দাম কমে গেছে। তেলের দাম কমেছে প্রতি লিটারে ১০ টাকা। পেঁয়াজের দাম বেড়ে গিয়েছিল। এখন কমে হয়েছে ৩০ টাকা। আপনি এখানে অসত্য ভাষণ দিয়েছেন।’
হাছান মাহমুদ বলেন, ‘জাতীয় পার্টির মহাসচিব দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি নিয়ে যে বক্তব্য রেখেছেন আজকে করোনার কারণে এবং রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে সারা বিশ্বে খাদ্যপণ্য, ভোগ্যপণ্যের দাম বৃদ্ধি পেয়েছে। ইউরোপে খাদ্য ও ভোগ্য পণ্যের মূল্য গত কয়েক দশকের মধ্যে সর্বোচ্চ পর্যায়ে গেছে। রুটির দাম ৮০ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। বাংলাদেশেও কিছু কিছু খাদ্য পণ্যের দাম বৃদ্ধি পেয়েছে। সেই বৃদ্ধি পাওয়ার পর প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনায় ১ কোটি পরিবারকে কার্ড দেওয়া হয়েছে এবং সেই কার্ডের ভিত্তিতে প্রতি পরিবারে ৫ জন করে ৫ কোটি মানুষকে স্বল্পমূল্যে খাদ্য সামগ্রী বিক্রি করা হচ্ছে। এতে করে খাদ্যপণ্যের দাম অনেক কমে গেছে।’
এর আগে পয়েন্ট অব অর্ডারে দাঁড়িয়ে বিএনপির সংসদ সদস্য হারুনুর রশীদ দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির কঠোর সমালোচনা করেন।
তিনি বলেন, ‘সরকার টিসিবির মাধ্যমে সারা দেশে নিত্যপণ্য বিতরণের ব্যবস্থা নিয়েছে। কিন্তু সেখানে চাল, ডাল, খেজুর, তেল ও চিনি এসব পণ্য একই সঙ্গে নেওয়া বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। কিন্তু একজন গরিব মানুষের খেজুর বা ছোলা দরকার না থাকলেও তাকে কিনতে বাধ্য করা হচ্ছে। এই কাজে সরকারের মাঠ প্রশাসন এত বেশি ব্যস্ত হয়ে পড়েছে যে তারা স্বাভাবিক কার্যক্রমে মনোনিবেশ করতে পারছে না।’