ভারতের অবস্থাও শ্রীলঙ্কার মতো হতে পারে, মোদীকে হুঁশিয়ারি

শুধু লোক দেখানো উন্নয়ন প্রকল্প নিলে ভারতের অবস্থাও শ্রীলঙ্কার মতোই হতে পারে বলে হুঁশিয়ারি দিয়েছেন ভারতের বেশ কয়েকজন উচ্চ পদস্থ সরকারি কর্মকর্তা।

সিনিয়র আমলাদের সঙ্গে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির এক ম্যারাথন বৈঠকে এই হুঁশিয়ারি দিয়েছেন ভারতের ওই কর্মকর্তারা।

তারা বেশ কয়েকটি রাজ্যের ঘোষিত জনপ্রিয় প্রকল্পগুলোর বিষয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন।

তাদের দাবি, অর্থনৈতিকভাবে টেকসই নয় এমন উন্নয়ন প্রকল্পগুলো ভারতকেও শ্রীলঙ্কার মতো একই পথে নিয়ে যেতে পারে।

বৈঠকে জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা অজিত দোভাল, প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব পিকে মিশ্র এবং মন্ত্রিপরিষদ সচিব রাজীব গৌবা সহ ভারতের কেন্দ্রীয় সরকারের অন্যান্য শীর্ষ আমলারাও উপস্থিত ছিলেন।

বৈঠকে মোদী আমলাদেরকে বড় উন্নয়ন প্রকল্প গ্রহণ না করার পেছনে ‘দারিদ্র্য’কে একটি অজুহাত হিসেবে খাড়া করার পুরানো অভ্যাস ছেড়ে দিতে এবং তাদেরকে একটি বৃহত্তর দৃষ্টিভঙ্গি গ্রহণ করতে বলেছেন।

কোভিড-১৯ মহামারী চলাকালীন সচিবদের টিমওয়ার্কের উল্লেখ করে মোদি বলেন যে, তাদেরকে কেবল তাদের নিজ নিজ বিভাগের সচিব হিসেবে নয় বরং ভারত সরকারের সচিব হিসেবে কাজ করতে হবে এবং একটি ঐক্যবদ্ধ টিম হিসেবে কাজ করতে হবে।

তিনি সচিবদেরকে তাদের নিজ মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে সম্পর্কিত নয় এমন সরকারি নীতির ত্রুটিগুলো নিয়েও মতামত দিতে আহ্বান জানান।

একটি রাজ্যে সাম্প্রতিক বিধানসভা নির্বাচনে ঘোষিত একটি জনপ্রিয় স্কিমের উল্লেখ করে দুই সচিব বলেন, প্রকল্পটি অর্থনৈতিকভাবে টেকসই নয়। আরও কিছু রাজ্যেও এমন কিছু উন্নয়ন প্রকল্প নেওয়া হয়েছে যেগুলো ওই রাজ্যগুলোকে শ্রীলঙ্কার মতো একই সংকটের পথে নিয়ে যেতে পারে।

শ্রীলঙ্কা বর্তমানে দেশটির ইতিহাসের সবচেয়ে খারাপ অর্থনৈতিক সংকটের মুখোমুখি হয়েছে। দেশটিতে চরম অর্থনৈতিক সংকটের কারণে তীব্র গণঅসন্তোষ সৃষ্টি হয়েছে। প্রতি দিন হাজার হাজার মানুষ সরকারবিরোধী বিক্ষোভ করছেন। প্রেসিডেন্ট রাজাপাকসের পদত্যাগের দাবি জানাচ্ছেন তারা।

এই সংকটের জন্য রাজাপাকসে সরকারের লোক দেখানো উন্নয়ন প্রকল্প তথা ঋণ নিয়ে রাস্তা-ঘাট, বন্দর ও অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্পগুলোকেই দায়ী করা হচ্ছে। এছাড়া সরকারে রাজাপাকসে পরিবারের একচেটিয়া নিয়ন্ত্রণ ও দূর্নীতিও এর জন্য দায়ী বলা হচ্ছে।

১৯৪৮ সালে যুক্তরাজ্যের কাছ থেকে স্বাধীনতা পাওয়ার পর সবচেয়ে কঠিন পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যাচ্ছে শ্রীলঙ্কা। ৭৪ বছরের মধ্যে সবচেয়ে বড় অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক সংকট পার করছে শ্রীলঙ্কা। বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে টান পড়ায় বাইরের দেশ থেকে জ্বালানি তেল আমদানি করতে পারছে না শ্রীলঙ্কার সরকার।

ফলে, ভয়াবহভাবে ব্যহত হচ্ছে দেশটির বিদ্যুৎ উৎপাদন এবং গত বেশ কিছুদিন ধরে ঘন্টার পর ঘন্টা বিদ্যুৎবিহীন অবস্থায় থাকতে বাধ্য হচ্ছেন শ্রীলঙ্কার সাধারণ মানুষ। বৃহস্পতিবার শ্রীলঙ্কার অধিকাংশ এলাকা ১৩ ঘন্টা বিদ্যুৎবিহীন ছিল।

বিদ্যুৎ ও জ্বালানি তেলের সংকটের কারণে দেশটির বেশ কিছু হাসপাতাল সার্জারি বন্ধ করে দিয়েছে। এমনকি সড়বাতিগুলোও জ্বালানো সম্ভব হচ্ছে না।

বিদ্যুৎ-জ্বালানি সংকটের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে দ্রব্যমূল্যোরর উর্ধ্বগতি। শ্রীলঙ্কার পরিসংখ্যান দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, মার্চ মাসে দেশটিতে খাদ্যপণ্যের মূল্য বেড়েছে ৩০ শতাংশেরও বেশি।

সংকট মোকাবিলায় সরকারের ব্যর্থতার প্রতিবাদ জানিয়ে গত বৃহস্পতিবার মধ্যরাতে শ্রীলঙ্কার রাজধানী কলম্বোয় প্রেসিডেন্টের বাসভবনের সামনে বিক্ষোভ শুরু করেন কয়েক শ মানুষ। এক পর্যায়ে বিক্ষোভকারীরা প্রেসিডেন্টের বাসভবনে ঢোকার চেষ্টা করেন। এ সময় নিরাপত্তারক্ষী বাহিনী গুলিবর্ষণ ও কাঁদানে গ্যাস ছুড়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে।

এরপর দেশজুড়ে জরুরি অবস্থা জারি করে প্রেসিডেন্ট গোতাবায়া রাজাপাকসের সরকার। শনিবার সন্ধ্যা ৬ টায় শুরু হয়ে কারফিউ চলে গতকাল সোমবার সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত। বিক্ষোভের শঙ্কায় দেশটির সব সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমও বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে।