মামলার গোনাগুনি

চট করে বানিয়ে বলার বুদ্ধি আমার ছিল না কোনোকালে। কুড়িগ্রাম থেকে বদলি হয়ে সবে এসেছি নীলফামারীতে। উপজেলা আদালতগুলো তখন উঠে এসেছে জেলা সদরে। আমার ছিল সৈয়দপুর সহকারী জজ আদালত। জেলা জজের খাস কামরায় ডাক পেয়ে বসে আছি আমরা সব সিনিয়র সহকারী জজ আর সবেধন সাবজজ ভাই। সেটা ১৯৯৪ সালের কথা। অতিরিক্ত জেলা জজ আদালতই ছিল না তখন সেখানে, সাবজজ একজনই। আলোচনা হচ্ছিল কী যেন এক প্রসঙ্গে! আচমকাই জেলা জজ জিজ্ঞেস করলেন, ‘আপনার আদালতে কয়টা মামলা আছে?’ গত মাসের মাসিক স্টেটমেন্টটা দেওয়া হয়ে গেছে, এ-মাসেরটার দিন কয়েক এখনো বাকি আছে। মামলার সংখ্যা মনে ছিল না আমার। সরলভাবেই বললাম, ‘স্যার, সংখ্যাটা ঠিক মনে আসছে না এখন, স্টেটমেন্টে আছে।’ বকুনি খেয়ে বসে রইলাম বিরসবদনে। আমার আগে একই প্রশ্ন করেছিলেন একই সঙ্গে বদলি হয়ে আসা আমার আগের ব্যাচের সিনিয়র সহকারী জজ সদরকে। ঝটপট জবাবে তিনি চটপট বলে গেলেন, ওসি স্যুট (আদার ক্লাস, অনেকখানে ‘অন্য প্রকার’ বলে, আদতে সেটা খাঁটি দেওয়ানি), পারিবারিক, মিস কেস, রেন্ট কন্ট্রোল, জারি কেসের সংখ্যা একে একে। ‘খাঁচা’ থেকে বের হয়ে আসার পথে জিজ্ঞেস করি, ভাই, মামলার সংখ্যা এত সব মনে রাখেন কী করে! বললেন, ‘দূর! মনে রাখা যায় নাকি! বানিয়ে বলে দিয়েছি আন্দাজে। হুজুরেরও কি মনে থাকবে কোনটা কত বলেছি!’ আন্দাজেই দেওয়া চলছিল মামলার স্টেটমেন্ট কুড়িগ্রামের চিলমারী সহকারী জজ আদালতে। ধরা পড়ল গুনতে গিয়ে। সেটাই ছিল আমার প্রথম কর্মস্থল। গেছি ১৯৮৯-এর জুলাইয়ের শেষ দিকে। মাসের শুরুতে কোন মামলা কত ছিল, সারা মাসে নতুন কয়টা ঢুকল, দোতরফা-একতরফা নিষ্পত্তি কোনটা কত গেল, সাক্ষী কতটা হলো, মাস শেষে কোনটার কয়টা পড়ে থাকল, তিন মাস, ছয় মাস, এক বছর, তিন বছর, দশ বছরের পুরাতন কয়টা কী আছে সবের ফিরিস্তি করে মাসে মাসে স্টেটমেন্ট দিতে হয় নির্ধারিত ছকে। মামলার আরও সব বিবরণ দিতে হয় ত্রৈমাসিক, ষাণ¥াসিক, বার্ষিক স্টেটমেন্টে। জেলা জজ নিজের মন্তব্য দিয়ে সেগুলো পাঠান হাইকোর্টে। নিষ্পত্তির পর্যাপ্ততা তখন মাপা হতো ত্রৈমাসিকে। পর্যাপ্ত নাকি অপর্যাপ্ত হলো মেপে জেলা জজ পাঠাতেন হাইকোর্টে, জানাতেন নিষ্পত্তিকারী জজকে। অপর্যাপ্ত হলে বিপত্তি নিষ্পত্তিকারীর, কৈফিয়ত তলব হাইকোর্ট থেকে। কতটা মামলা নিষ্পত্তি করলে একজন জজের ঠিকমতো গতর খাটানো বোঝাবে সেটাকেই বলে পর্যাপ্ততা, নীতি-মান বাঁধা হয় হাইকোর্ট থেকে। অপর্যাপ্ত হলে ‘বাঁশ’ যাবে এসিআরে, আটকাবে পদোন্নতিতে। সেকালে সহকারী জজদের নিষ্পত্তির পর্যাপ্ততা বাঁধা ছিল ৮টা না পারলে অবশ্যই ৬টা খাঁটি দেওয়ানির দোতরফা নিষ্পত্তিতে। সঙ্গে আর সব কাজের ফিরিস্তিও গোনার নীতি ছিল কাগজে (সিআরও ৮১৫ বিধি এবং ২৮ নভেম্বর ১৯৮৮-র হাইকোর্ট সার্কুলার-১)। গণৎকারদের নীতি তার চেয়েও বড়, গুনতিতে ধরত শুধু ওই ৬টা খাঁটি দেওয়ানির দোতরফা।

অক্টোবরেই এসে গেল জেলা জজের মাপ, ১৯৮৯-এর তৃতীয় ত্রৈমাসিকের নিষ্পত্তি অপর্যাপ্ত। পরের জানুয়ারিতেও পেলাম ১৯৮৯-এর চতুর্থ ত্রৈমাসিকের নিষ্পত্তিও অপর্যাপ্ত। তলব এলো কৈফিয়তের। নিষ্পত্তিতে নবীন, অভিজ্ঞতাহীন এই সব বলে-কয়ে নাকে খত দিয়ে কৈফিয়ত পাঠিয়ে কোমর বেঁধে নামলাম মাসে ৬টা খাঁটি দেওয়ানির দোতরফা নিষ্পত্তিতে। না হলে তো আবার উৎপাত কৈফিয়তের, এসিআরে ‘বাঁশ’ তো দেবেই পরে! না, হলো না কিছুতেই। জানুয়ারিতে হলো মোটে ৩টি, ফেব্রুয়ারিতে কমে হলো ২টি। আবার তো মরেছি! প্রতি মাসে মামলা গোনাগুনি করে সেরেস্তাদার বানায় স্টেটমেন্ট, তাতে দেখি সব মিলে মোট মামলা নাকি ১১৫টি। টেনেটুনেও দিনে ২ ঘণ্টার বেশি কাজ থাকে না এজলাস-চেম্বারে। দিনে দুটো চারটা করে রেখেও সাত দিনের পরে আর দিন রাখার মামলা পাই না ডায়েরিতে। লম্বা তারিখ হয় না বলে উকিল সাহেবরা মন খারাপ করে! আমার মাথা গেল খারাপ হয়ে! দিনের কাজ শেষে একদিন সেরেস্তায় গিয়ে নথি ধরে মামলা গুনতে লেগে গেলাম একটা একটা করে। শুমার করে দেখি মোটে ৫৩টি সর্বসাকুল্যে। বাকি মামলা গেল কই! সেরেস্তাদার আমতা আমতা করে। তদন্তে বের হলো, মামলার দাখিলটা সে ফাইলিং রেজিস্টারে তোলে (মামলা নম্বর দিয়ে বখশিশ পাওয়ার খুশিতে) শুধু, নিষ্পত্তিটা নোট দেয় না স্যুট রেজিস্টারে (একটুখানি বকাও পাওয়া যায় না বলে)। স্টেটমেন্ট বানায় সে মনের আন্দাজে, আর হুজুরেরা স্বাক্ষর দিয়ে যান চোখ বন্ধ করে। চোখ খুলে দেখি খাঁটি দেওয়ানি ৫৩টি নয় আছে মোটে ৩৮টি। পারিবারিক ১০টি নয়, মোটে ৪টি। মিস কেস ৫৬টি নয়, মোটে ১০টি। আর জারি মাত্র ১টি। এই মোটে ৫৩টি। সেরেস্তাদারের কৈফিয়ত তলব শেষে সতর্ক করে ছেড়ে দিলাম (তার বেশি আর সাধ্য নাই নিজের, পাঠাতে হবে ওপরে, ওপরওয়ালা দয়াল বাবা)। মামলার বয়স গুনে দেখলাম, দু-এক বছরের পুরাতন ৪-৫টি বাদে সবই ছ-মাস, তিন-মাস, তার চেয়েও কমের। আগের জেলা জজ বদলি হয়ে এলেন নতুন জন, এসেই মামলার ‘মঙ্গা’ দেখে বললেন এখানে খালি খালি বসে না থেকে যান রাজারহাটের খালি আদালতে। লিখে দিলেন মন্ত্রণালয়ে। দাখিল আর নিষ্পত্তি শেষে চিলমারীতে ২৯টি দেওয়ানি, ৪টি পারিবারিক, আর ৫টি মিস কেস মিলিয়ে মোট ৩৮টি মামলা রেখে ১৯৯০-এর মে-র শেষ দিকে এলাম রাজারহাটে। সঙ্গে চিলমারীতে সপ্তাহে একদিন সার্কিট ডিউটিও লাগানো ছিল।  কৈফিয়ত ঠিকই তলব পড়ল হাইকোর্ট থেকে, ১৯৯০-এর ওই ৫ মাসের নিষ্পত্তি অপর্যাপ্ত বলে। মামলা গোনাগুনির সেই কাহিনী বিনিয়ে অল্প বয়সী অপর্যাপ্ত মামলার কারণে মাসে ৩-৪টার বেশি ওঠেই না সাক্ষীতে বলে জান ছেড়ে চেষ্টা করেও নিষ্পত্তি ৬টা খাঁটি দেওয়ানির দোতরফা হয়নি বটে তবে, গুনে গুনে এত এত একতরফা-খারিজ-আপস, নিষেধাজ্ঞা, আর এত সাক্ষী হয়েছে বলে দর্শালাম জেলা জজের মাধ্যমে। ছাড় পেয়েছিলাম বোধ করি তার সুপারিশে। এসিআরে বিরূপ কিছু আসেনি সেবার। তারপরে ১৯৯১-এর শেষ পর্যন্ত আর মামলা গোনাগুনি লাগেনি। মামলা মোটামুটি ছিল তখন রাজারহাটে। কপালে সুখ সইল না বেশি দিন। নিষ্পত্তির চোটে অল্প অল্প করে মামলা নেমে এলো স্বল্পতে ১৯৯২-এর মার্চের পরেই। গুনতিতে সব মিলে মোটে আবার সেই ৩৮। দেওয়ানি ২৫, পারিবারিক ২, আর মিস কেস ১০টি। দু-এক বছরের পুরাতন ৪-৫টি বাদে সবই ছ-মাস, তিন-মাস, তার চেয়েও কমের। সেই জেলা জজ গেলেন বদলি হয়ে, এলেন নতুন জন নতুন নীতি ধরে। লেগে গেল ল্যাঠা, আবার সেই কৈফিয়ত তলব আর দর্শানো ১৯৯২ আর ১৯৯৩ সালের কাজের।

১৯৯৩-তে আবার মামলার টানাটানির সঙ্গে লাগল জায়গার টানাটানি। ১৯৯৩-এর শুরুতে উপজেলা আদালত উঠিয়ে আনা হলো কুড়িগ্রাম সদরে। রেডি হয়ে পড়ে আছে জেলা জজ আদালত নতুন ভবন, প্রধানমন্ত্রী আসবেন বলে (এমন গৃহ-প্রবেশানুষ্ঠান করাবার বায়নাক্কাওয়ালাদের গুনি কী করে)। সাড়ে তিন মাস পর এপ্রিলের মাঝামাঝিতে এসে তিনি লাল ফিতা কাটলেন। জুটল চেম্বার-এজলাস। কিন্তু, মামলা বাড়ে না, বরং কমে নিষ্পত্তিতে। কৈফিয়ত তলব তবু পিছু ছাড়ে না। আমি গুনি মামলা, তারা নিষ্পত্তি গোনেন ৬টি। সাক্ষীতে তোলার মতো ৬টা মামলাই না থাকলে দেওয়ানি দোতরফা ৬টা নিষ্পত্তি হয় কী করে! হাইকোর্টের সার্কুলার, সিআরও-র বিধি তুলে দর্শালাম, দোতরফা যে কটা হয়েছে তার সঙ্গে একতরফা-খারিজ-আপস, নিষেধাজ্ঞা নিষ্পত্তি আর সাক্ষী নেওয়া কাজগুলো ধরলে আমার কাজ অপর্যাপ্ত নহে। ১৯৯২ সালের সব ত্রৈমাসিকের কৈফিয়ত ‘সন্তোষজনক’ পেয়েও দেখি এসিআরে ঠিকই ‘বাঁশ’ দিয়েছে, ‘কোয়ান্টিটি অব ওয়ার্ক ডিসপোসড অব- ইনঅ্যাডেকুয়েট’। শুধু ১৯৯২-এরটাতে নয়, দিয়েছে ১৯৯৩-এরটাতেও। সেই ‘বাঁশ’ দুটো আর বের করা যায়নি। কাজ হয়নি আর হাইকোর্টকে হাইকোর্ট দেখিয়ে। জানা গেল ‘১৯৯২ এবং ১৯৯৩ সনের বার্ষিক গোপনীয় প্রতিবেদনের বিরূপ মন্তব্য কর্তনের জন্য অত্রকোর্টে যে আবেদন করিয়াছিলেন অত্রকোর্ট বিবেচনা করত উহা নামঞ্জুর (রিজেক্টেড) করিয়াছেন।’ মর্মে পত্রখানা পেয়ে। ১৯৯৩-এর নভেম্বরের শেষের দিকে মামলা ‘মঙ্গা’-র কুড়িগ্রাম ছেড়ে ৮ মাস নীলফামারী হয়ে সোজা বদলি একেবারে দক্ষিণবঙ্গের নড়াইল সদরে। বাঁচলাম মামলা গোনাগুনির যন্ত্রণা থেকে। মামলা অজস্র, শত নয় ছাড়িয়েছে সহস্র। নথির আর গুনব কী! আগের মাসের স্টেটমেন্টে আছে আড়াই হাজারের ওপরে। ডায়েরিতে প্রতিদিন আংশিক শুনানির ১০টা, নতুন শুনানির ১০টা, আরও ১০টার ওপরে শুনানির দিন ধার্যে (এসডি) রেখেও পরের তিন মাসের পাতা ভরতি। আহ, কী ফুরতি! উকিল সাহেবে করতে চায় না যেটা সেটা ছেড়ে করতে চায় যেটা সেটা ধরো। তিন মাস পরে তারিখ পেয়ে উকিল সাহেবও মহাখুশি! এমাসে নিষ্পত্তির ইরাদা রাখা কোনটা বেমক্কা দরখাস্তে ফসকিয়ে গুনতির সেই ৬টায় টান পড়লে পরের মাসে আরেকখানা নিষ্পত্তি বেশি দিয়ে অপর্যাপ্ত সামলাও। ‘কৈফিয়ত কি কৈ বাত নেহি’! অপর্যাপ্ততার উৎপাত নেই। খাও শুধু নিষ্পত্তির দুধভাত। এরপরে মামলা ‘মঙ্গার’ অঞ্চলে আর পড়িনি কপালগুণে। বুঝলাম অবশেষে, অগুনতি মামলায় বিচারকের শান্তি বেশুমার! না-চাইতেও লম্বা সময় পেয়ে আইনজীবী শান্ত। হাতেগোনা মামলাতেই বিপত্তি!

২০০৩ সালটা ছিলাম সলিসিটর উইংয়ে ডেপুটেশনে। সেখানে আবার লাগল মামলা গুনতে। সংসদের অধিবেশন বসলেই তথ্য তালাশ পড়ত বিচারে পড়ে থাকা মামলার। মামলা বেড়ে কমে কতটা কী পড়ে আছে কত বছর ধরে সেসবের তথ্য জানান আইনমন্ত্রী। বানাবার কাজটা এসে নামত শেষে সলিসিটর উইংয়ে সিভিলের এই সিনিয়র সহকারী সচিবের হাতে। জেলাগুলো থেকে মাসে মাসে স্টেটমেন্ট এসে এসে জমা থাকে হাইকোর্টে। আমি বলি, সেখান থেকে কপি এনে আন্দাজ করে দিলেই হয়। ডিএস বলেন, আন্দাজে হবে না, টেলিফোন করে নিতে হবে সরাসরি জেলা থেকে। অগত্যা টেবিলে কাগজ রেখে এক হাতে কলম আর হাতে টেলিফোন নিয়ে দুদিন ভর জেলা জজদের প্রশাসনিক কর্মকর্তার কাছ থেকে তথ্য নিয়ে লিখি। তাদের বানানো সংখ্য তথ্য কতখানি গোনাগুনির আর কতখানি আন্দাজের! নথি ধরে গোনা ধরলে পাওয়া যাবে তো ঠিক চল্লিশ লাখ!

লেখক অবসরপ্রাপ্ত সিনিয়র জেলা জজ ও দুদকের সাবেক মহাপরিচালক

moyeedislam@yahoo.com