পাকিস্তানের সম্ভাব্য নতুন প্রধানমন্ত্রী কে এই শাহবাজ শরীফ?

পার্লামেন্টে ইমরান খানের বিরুদ্ধে আনা অনাস্থা প্রস্তাব নাকচ করে যে সিদ্ধান্ত দিয়েছিলেন ডেপুটি স্পিকার তাকে ‘অসাংবিধানিক’ ঘোষণা করে বাতিল করে দিয়েছে পাকিস্তানের সুপ্রিম কোর্ট। ইমরান খানের আহ্বানে পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট আরিফ আলভি জাতীয় পরিষদ ভেঙে দেওয়ার যে ঘোষণা দিয়েছিলেন, তাও অবৈধ ঘোষণা করা হয়েছে গত বৃহস্পতিবারের সুপ্রিম কোর্টের ওই রায়ে। সেই রায়ে জাতীয় পরিষদ পুনরুজ্জীবিত করে অধিবেশন শুরুর পাশাপাশি আস্থা ভোটের ফয়সালা করার নির্দেশ দিয়েছে আদালত। আজ শনিবার সেই ভোট অনুষ্ঠিত হবে।

তার আগেই প্রধান বিরোধীদলীয় নেতা শাহবাজ শরিফ বলেছেন, তিনিই হচ্ছেন দেশের পরবর্তী প্রধানমন্ত্রী পদপ্রার্থী। বৃহস্পতিবারই শাহবাজ বলেন, শনিবারের অনাস্থা ভোটে ইমরান খানকে পরাজিত করা গেলে বিরোধী জোটের পক্ষ থেকে তিনিই দেশের নতুন প্রধানমন্ত্রী পদপ্রার্থী হবেন। তাকে এ পদে মনোনয়নও দেওয়া হয়েছে।

পাকিস্তানের পার্লামেন্ট পুনর্বহাল ও শনিবার অনাস্থা ভোটের নির্দেশ দিয়ে সুপ্রিম কোর্টের স্বপ্রণোদিত রুল জারির পর বৃহস্পতিবার বিরোধী জোট যৌথ সংবাদ সম্মেলন আয়োজন করেছিল। সেখানেই শাহবাজ তার এই প্রার্থিতার কথা জানান।

সুপ্রিম কোর্টের রায়কে বিরোধীরা তাদের বিজয় হিসাবেই দেখছে এবং শনিবার পার্লামেন্টেও তাদের বিজয় হবে অর্থাৎ, ইমরান খানকে প্রধানমন্ত্রীত্ব থেকে সরানো যাবে বলেই তারা মনে করছে।

পাকিস্তানে কোনও প্রধানমন্ত্রীই তার মেয়াদ পূর্ণ করতে পারেনি। আর ইমরানের দল ছেড়ে ভিন্নমতাবলম্বী আইনপ্রণেতারা চলে যাওয়ায় তার সংখ্যাগরিষ্ঠতার জন্য প্রয়োজনীয় নূন্যতম ১৭২ আসনেরও প্রায় এক ডজন আসন কম হয়ে গেছে।

পার্লামেন্টের নিম্নকক্ষে বিরোধীদলগুলোর জোটবদ্ধভাবে ১৬৩টি আসন আছে। তবে ইমরান খানের দলছুট এমপিরা অনাস্থা ভোটের মধ্য দিয়ে বিরোধীপক্ষে যোগ দিলে তারা সংখ্যাগরিষ্ঠ হয়ে যেতে পারে।

পার্লামেন্টে সমর্থনের যে হিসাব-নিকাশ দাঁড়িয়েছে, তাতে অনাস্থার লজ্জা নিয়ে ইমরানের প্রস্থান এখন অনেকটাই নিশ্চিত হয়ে গেছে। আর ইমরান সরে গেলে তার জায়গায় উত্তরসূরি হিসাবে শাহবাজের নামটাই ঘুরেফিরে আসছে সবার ওপরে।

শাহবাজ শুধুমাত্র পাকিস্তানের অন্যতম প্রধান বিরোধী রাজনৈতিক নেতা নন। তার আরও একটি পরিচয় হল, তিনি সাবেক পাক প্রধানমন্ত্রী নওয়াজ শরিফের ভাই। দেশের বাইরে শাহবাজ ততটা পরিচিত না হলেও দেশের ভেতরে প্রশাসনিক দক্ষতার জন্য তার সুনাম আছে।

এ মুহূর্তে পাক পার্লামেন্টের নিম্নকক্ষে বিরোধী দলনেতার পদে থাকা শাহবাজের এর আগে প্রশাসনিক প্রধানের দায়িত্ব সামলানোর অভিজ্ঞতা আছে। তিনবার পাকিস্তানের পাঞ্জাব প্রদেশের মুখ্যমন্ত্রীর পদে ছিলেন তিনি। এ পদে সবথেকে বেশি দিন থাকার কৃতিত্ব তারই আছে।

তাছাড়া, সাবেক পাক প্রধানমন্ত্রী নওয়াজ শরিফ দুর্নীতি সংক্রান্ত দুটি মামলায় দোষী সাব্যস্ত হয়ে লন্ডনে চলে যাওয়ার পরই তার দল পিএলএম-এন পরিচালনার দায়িত্ব পেয়েছিলেন শাহবাজ।

১৯৯৯ সালে জেনারেল পারফেজ মুশারফের নেতৃত্বে পাকিস্তানে সেনা অভ্যুত্থানের পর পাকিস্তান ছেড়ে চলে গিয়েছিলেন শাহবাজ শরিফ। ২০০০ সালে সৌদি আরবে নির্বাসনে থাকতে শুরু করেন তিনি। ২০০৭ সালে শাহবাজ আবার পাকিস্তানে ফেরেন তার রাজনৈতিক ক্যারিয়ার শুরু করতে। ২০০৮ সালে নির্বাচনে জিতে ফের পঞ্জাবের মুখ্যমন্ত্রী হয়েছিলেন তিনি।

ইমরান খানের প্রধানমন্ত্রীর পদে থাকা না থাকা নিয়ে চরম রাজনৈতিক সংকট মোকাবিলা করছে পাকিস্তান। ইমরানের দাবি, তাকে ক্ষমতা থেকে সরাতে বিরোধী রাজনৈতিক পক্ষ ও বিদেশিরা এক হয়ে ষড়যন্ত্র করছে। বিশেষত যুক্তরাষ্ট্রের দিকে অভিযোগের আঙ্গুল তুলেছেন ইমরানসহ অনেকেই।

এমনকি রাশিয়াও অভিযোগ করে বলেছে, যুক্তরাষ্ট্র ‘অবাধ্য’ প্রধানমন্ত্রী ইমরান খানকে শাস্তি দিতে চেয়েছে। তবে মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর ইমরান খানের বিরোধীদের অর্থায়ন করে অনাস্থা প্রস্তাবের মাধ্যমে তার সরকার পতনের অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেছে।

ইমরান খানের বিরোধীদের দাবি, ২০১৮ সালে সামরিক বাহিনীর সমর্থনে ক্ষমতায় এসেছেন ইমরান। এখন তাঁর মাথার ওপর থেকে শক্তিশালী সামরিক বাহিনীর ছায়া সরে গেছে। যদিও কোনো পক্ষই বিষয়টি স্বীকার করে না।

পাকিস্তানের জন্মলগ্ন থেকে কোনও প্রধানমন্ত্রীই নিজেদের ক্ষমতার পাঁচ বছরের পূর্ণ মেয়াদ সমাপ্ত করতে পারেননি। কখনও খুন হয়ে, আবার কখনও বিরোধী দলের অনাস্থার মুখে পড়ে ক্ষমতা ছাড়তে হয়েছে পাকিস্তানি প্রধানমন্ত্রীদের।