চাঁদার ভাগ যায় ৫ পকেটে

রাজধানীর ৫০টি থানা এলাকায় সক্রিয় চাঁদাবাজদের তালিকা তৈরি করেছে একটি গোয়েন্দা সংস্থা ও ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি)। এ তালিকা অনুযায়ী, ৫০০ গ্রুপ চাঁদাবাজি করছে। রোজা ও ঈদ সামনে রেখে গত মাসে করা ওই তালিকার সঙ্গে যে প্রতিবেদন দেওয়া হয়েছে তাতে বলা হয়, প্রতিদিন গড়ে ৫০ লাখ টাকা তোলা হচ্ছে। এর একটি অংশ চলে যাচ্ছে প্রভাবশালীদের কাছে। বাকিটা যায় থানা পুলিশ, বিভিন্ন সংস্থার সদস্য, স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও ক্ষমতাসীন দলের নেতাদের পকেটে।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, চাঁদাবাজদের তালিকাসহ প্রতিবেদন পুলিশ সদর দপ্তর হয়ে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে গেছে।

জানতে চাইলে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘চাঁদাবাজদের কোনো দল বা গোত্র নেই। তারা অপরাধী। হোক পুলিশ বা রাজনৈতিক নেতা। যারা এসব অপকর্ম করবে তাদের আইনের আওতায় আনা হবেই। ইতিমধ্যে চাঁদাবাজদের বিষয়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে কড়া বার্তা দেওয়া হয়েছে।’

পুলিশ ও ব্যবসায়ীসহ সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, এলাকার স্থায়ী-অস্থায়ী কাঁচাবাজার ও খাবারসহ বিভিন্ন দোকান, অবৈধ যানবাহন, বিপণিবিতান, রাস্তার পাশে ও ফুটপাতে বসানো দোকানপাট থেকেই দৈনিক হিসেবে টাকা তোলা হয়। একেক এলাকা কিংবা ব্যবসার ধরন অনুযায়ী টাকার অঙ্ক নির্দিষ্ট করে দেওয়া আছে। টাকা তোলার জন্য পুলিশ ‘লাইনম্যান’ ব্যবহার করে। একইভাবে স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও ক্ষমতাসীন দলের নেতাদের লোকেরা এসব দোকান থেকে টাকা তুলে নিয়ে যায়।

রাজধানীর মিরপুর, নিউ মার্কেট, গুলিস্তান ও উত্তরাসহ বিভিন্ন এলাকা সরেজমিন ঘুরে এ প্রতিবেদক দেখেছেন, ফুটপাত ও বিপণিবিতানের ব্যবসায়ী, রাস্তার পাশে ও ফুটপাতে বসা হকারদের কাছ থেকে টাকা তোলা হয়। ভ্রাম্যমাণ ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের কাছ থেকেও টাকা নেওয়া হয়। এসব ব্যবসায়ীর সঙ্গে কথা বলে যে ধারণা পাওয়া গেছে তাতে প্রতিদিন চাঁদাবাজির পরিমাণ পুলিশের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা অঙ্কের চেয়ে অনেক বেশি।

ডিএমপির কমিশনার মোহা. সফিকুল ইসলাম দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘পুলিশের কোনো সদস্য চাঁদাবাজি করছে এমন তথ্য-প্রমাণ পেলে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে। সবকটি থানার ওসিদের কড়া বার্তা দেওয়া হয়েছে। ফুটপাত হোক আর যেখানেই হোক, চাঁদাবাজি করলেই ব্যবস্থা নিতে হবে।’ তিনি আরও বলেন, ঈদের আগে চাঁদাবাজদের ধরতে মাঠে কাজ করছে পুলিশ। কোনো ব্যবসায়ীকে হয়রানি করা যাবে না। যদি কেউ হয়রানির শিকার হন তাহলে সংশ্লিষ্ট থানায় অভিযোগ করতে বলা হয়েছে।

সম্প্রতি সড়কে পণ্য পরিবহনে চাঁদাবাজির বিষয়ে কথা বলেছেন বাণিজ্যমন্ত্রী। এ চাঁদাবাজির কারণে ঢাকায় মাছ, সবজিসহ বাইরে থেকে আসা পণ্যের দাম বেশি পড়ছে। রাজধানীর ফুটপাত বা ভ্রাম্যমাণ দোকানেও চাঁদাবাজির কারণে পণ্যের দাম যে বেড়ে যায় উত্তরার এক ডাব বিক্রেতা সেটা স্পষ্ট করলেন। আবদুর রহমান নামে ওই ডাব বিক্রেতা দেশ রূপান্তরের কাছে দাবি করেন, একটি ডাব ৪০ টাকায় কিনে বিক্রি করতে হয় ১০০ টাকা। কারণ তাকে প্রতিদিন ১৫০ টাকা চাঁদা দিতে হয় লাইনম্যানকে। এছাড়া স্থানীয় রাজনৈতিক দলের নেতাদের চাঁদা দিতে হয়। না দিলে দোকান বসাতে পারবেন না।

সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, কিছু কিছু ক্ষেত্রে পুলিশ চাঁদাবাজির কৌশল পরিবর্তন করেছে। তারা স্থানীয় নেতাকর্মীদের চাঁদাবাজির কাজে ব্যবহার করছে। এছাড়া মোবাইল ফোন অ্যাপ হোয়াটসঅ্যাপ, ইমো, ভাইবার, টেলিগ্রাম ব্যবহার করেও চাঁদাবাজি করছে। যার কারণে অনেক সময় চাঁদা দেওয়ার তথ্য-প্রমাণ থাকছে না ব্যবসায়ীদের কাছে।

মাঝেমধ্যে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী অভিযান চালায়। চাঁদাবাজদের কেউ কেউ ধরাও পড়ে, যারা উল্লেখযোগ্য নয়। অবশ্য কিছুদিন যেতে না যেতেই জামিনে বের হয়ে আসে তারা। কিন্তু চাঁদাবাজি থামে না।

ফুটপাত দখল করে দোকান বসানোর বিষয়ে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট সাজিদ আনোয়ার দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘অনেক চেষ্টা করেও আমরা ফুটপাত দখলমুক্ত রাখতে পারছি না। তারপরও আমরা কাজ করে যাচ্ছি। যদি প্রত্যেকটা কমিউনিটি সচেতন হয় তাহলেই ফুটপাত দখলমুক্ত রাখা যাবে।’

সরেজমিন : গত এক সপ্তাহ ধরে মতিঝিলে বাংলাদেশ ব্যাংকের গলি, দৈনিক বাংলার মোড়, দিলকুশা, মৌচাক মার্কেট, আইডিয়াল স্কুল, নিউ মার্কেট, গুলিস্তান, উত্তরা, মিরপুর, শাহআলী, গাবতলী, কারওয়ানবাজারসহ অন্তত ৫০টি স্থানে সরেজমিন ঘুরে চাঁদাবাজির চিত্র দেখেছেন এ প্রতিবেদক। উত্তরার একজন লাইনম্যান নাম প্রকাশ না করার শর্তে দেশ রূপান্তরকে জানান, তিনি ১ হাজার টাকা তুললে ২০০ টাকা পান। বাকিটা পুলিশের। পুলিশ ছাড়াও দোকানপাটে চাঁদাবাজি করে স্থানীয় নেতারা।

মৌচাক মার্কেটের ব্যবসায়ী আনোয়ার হোসেন বলেন, ‘রোজায় স্থানীয় নেতাকর্মীদের চাঁদাবাজি বেড়ে গেছে। রমজানের শুরু থেকে এ পর্যন্ত কয়েকটি ইফতার পার্টির কথা বলে আমার কাছ থেকে বেশ কিছু টাকা নিয়েছে। অন্য সময়ও টাকা আদায় করে ওরা। তাদের সঙ্গে পুলিশ ও নেতাদের সখ্য আছে।’ কারওয়ানবাজারের সবজি বিক্রেতা মাহমুদ আলী জানান, চাঁদাবাজির কারণে বেড়েছে সবজির দাম। পাইকারি বাজার থেকে সবজি কিনে এলাকায় যাওয়ার পথেই একাধিক স্থানে টাকা দিতে হয়। এরপর বাজারে বিক্রি শেষে লাইনম্যানদের দিতে হয় টাকা।

পুলিশ ও সরেজমিন তথ্য বলছে, বৃহত্তর মিরপুর এলাকার ফুটপাতগুলোতে দোকান বসানোর জন্য ৪ বর্গফুট জায়গার জন্য এককালীন অগ্রিম দিতে হয় ৬০-৭০ হাজার টাকা। এ অঞ্চলে প্রায় ৩০ হাজার হকার রয়েছে। তাদের কাছ থেকে দৈনিক গড়ে ২০০ টাকা করে প্রতিদিন অন্তত ৬০ লাখ টাকা তোলা হয়।

অভিযোগ রয়েছে, মিরপুর-১০ নম্বর এলাকার ফুটপাত ও রাস্তার পাশের দোকান থেকে চাঁদাবাজি করে স্থানীয় ওয়ার্ড কাউন্সিলের লোকজন। মিরপুর-১০ নম্বর গোল চত্বর থেকে ডায়াবেটিক হাসপাতাল পর্যন্ত ফুটপাতে চাঁদা তোলেন সিদ্দিক ও জাফর। গ্রামীণ ব্যাংক ভবন পর্যন্ত ফুটপাতের দায়িত্বে আছেন জালাল। এছাড়া রিপন, রুবেল, ইমরান তালুকদার, মুসতাকিম ফয়সাল ও গালকাটা পারভেজসহ আরও কয়েকজনের নাম জানা গেছে।

পুলিশের তালিকা ও সরেজমিন চিত্র : একটি গোয়েন্দা সংস্থা ও ডিএমপি মিলে চাঁদাবাজদের যে তালিকা করেছে তাতে রাজনৈতিক নেতা, কাউন্সিলরসহ ক্ষমতাসীন দলের নেতা ও থানার কথা বলা হয়েছে। কাউন্সিলর ছাড়াও ওয়ার্ড পর্যায়ের নেতাদের নাম রয়েছে ওই তালিকায়।

সরেজমিন ঘুরে দেশ রূপান্তরের এ প্রতিবেদক বিভিন্ন এলাকায় টাকা তোলার দায়িত্বে থাকা বেশ কয়েকজন লাইনম্যানের নাম পেয়েছেন। মিরপুর-১ এলাকার বিভিন্ন স্থানে যে লাইনম্যানরা টাকা তোলেন তাদের মধ্যে রয়েছেন সুরুজ আলী, নয়ন, রুবেল, আনোয়ার, রবিউল, পল্টন মিয়া, ফুট কবির ওরফে বরিশাইলা কবির, আবুল কালাম, সেলিম, আকবর, নুরু, শাহ আলম, ফারুক ওরফে জি মার্ট ফারুক, ছোট করিম, রাজু, মাইনুদ্দিন, সৌরভ, দীপু ও সম্রাট।

মিরপুর-১ নম্বরের প্রতিটি ফুটপাতে নির্দিষ্ট মাপের জায়গার জন্য অগ্রিম দিতে হয় ৩০-৫০ হাজার টাকা। এখানে ভ্রাম্যমাণ বাদাম বিক্রেতাদেরও প্রতিদিন ৩০ থেকে ৫০ টাকা চাঁদা দিতে হয়।

মিরপুর থানার ওসি মোস্তাজিজুর রহমান থানার চাঁদাবাজির বিষয়টি অস্বীকার করে দেশ রূপান্তরকে বলেন, চাঁদাবাজদের বিরুদ্ধে পুলিশ কঠোর অবস্থানে আছে।

পুলিশের প্রতিবেদন বলছে, সায়েন্স ল্যাব মোড় থেকে নীলক্ষেত মোড় পর্যন্ত উভয় পাশের ফুটপাত ও মূল সড়কের অর্ধেক দখলে করে বসেছে স্থায়ী-অস্থায়ী মিলিয়ে প্রায় চার হাজার হকার। দোকানভেদে প্রতিদিন ৩০০-৫০০ টাকা করে দিতে হয় তাদের। দেশ রূপান্তর এই এলাকার কয়েকজন লাইনম্যানের নাম জানতে পেরেছে। তারা হলো শাহিন, শহীদ চাচা, সেলিম, আরিফ, মাইনুল, আমিনুল, আনিস, মিজান, শিপন, রানা, কালাম, রফিক, ইসমাইল, মজনু, বাচ্চু, আকবর, আলম, ইব্রাহিম, হোসেন, তাহের, মোর্শেদ, সিরাজ, মুসা মিয়া, আবদুস সাত্তার মোল্লা, শাহাদাৎ আবদুল জলিল খোকন, জনি। এলাকার একাধিক ব্যবসায়ী দেশ রূপান্তরকে বলেন, এলাকাভিত্তিক লাইনম্যান ছাড়াও রয়েছে একাধিক সহযোগী।

সরেজমিন জানা গেছে, উত্তরার আবদুল্লাহপুর বেড়িবাঁধ হয়ে উত্তরখানের রাস্তায় চলাচল করে অন্তত ৫০০ অটোরিকশা। প্রতিদিন রুহুল ও শুভ নামে দুই লাইনম্যান চালকদের কাছ থেকে ৫০ টাকা করে চাঁদা আদায় করে। তারা স্থানীয় কাউন্সিলর ও পুলিশের লোক বলে এলাকায় পরিচিত। হাউজ বিল্ডিং (মাসকট প্লাজা) এলাকায় টেম্পো ও ফুটপাতের দোকান থেকে টাকা তোলার জন্য পুলিশের লাইনম্যান আছে তিনজন। আছেন শ্রমিক লীগের দুই নেতা। সোনারগাঁও জনপদ রোডে দখল ও চাঁদাবাজি চলে আওয়ামী লীগের দুই নেতার নামে। থানা ও ট্রাফিক পুলিশের হয়ে দুজন লাইনম্যান টাকা ওঠায় নিয়মিত। রাজলক্ষ্মী ও জসিম উদ্দীন রোড এলাকায় চাঁদা তোলা হয় অন্তত পাঁচ নেতার নামে। শাহাজালাল অ্যাভিনিউ থেকে আজমপুর মোড়, আজমপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে পূর্বদিকে রেললাইন, ৭ নম্বর সেক্টরের ৩৫ নম্বর সড়ক, আমির কমপ্লেক্স থেকে এইচএম প্লাজা, গরীবে নেওয়াজ অ্যাভিনিউ, ময়লার মোড়, শাহ মখদুম অ্যাভিনিউর দোকান ও অটোস্ট্যান্ড চাঁদাবাজির বড় জায়গা। বিমানবন্দর ও আশপাশের এলাকায় একজন কাউন্সিলরের নামে চাঁদাবাজি চলে।

ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের (ডিএনসিসি) ৫১ নম্বর ওয়ার্ডের (উত্তরা মডেল টাউন ১১ থেকে ১৪ নম্বর সেক্টর ও বাইলজুড়ী আংশিক) কাউন্সিলর মোহাম্মদ শরীফুর রহমান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমার এলাকায় জায়গা দখল করে কেউ ব্যবসা-বাণিজ্য বা চাঁদাবাজি করতে পারে না।’

বিমানবন্দর থানার ওসি ফরমান আলী দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘কোনো লাইনম্যান পুলিশের নাম ব্যবহার করে ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে চাঁদা আদায় করলে তাদের চিহ্নিত করে গ্রেপ্তার করা হবে।’

মিরপুর ও গুলিস্তান এলাকার দুজন ব্যবসায়ী নাম প্রকাশ না করে দেশ রূপান্তরকে বলেন, শীর্ষ সন্ত্রাসীদের নামেও চাঁদা তোলা হচ্ছে। খিলগাঁওয়ের জিসান, মিরপুরের শাহাদাত ও লিটু, কারওয়ানবাজারের আশিক, বাড্ডার মেহেদী, মগবাজারের রনি, আদাবরের নবী, মোহাম্মদপুরের কালা মনির, শাহ আলীর গাজী সুমন, পল্লবীর মোক্তার, কাফরুলের শাহীন সিকদার, যাত্রাবাড়ীর ইটালি নাসির, জুরাইনের কচির নাম ব্যবহার করছে চাঁদাবাজ চক্র।

পুলিশের ওয়ারী ডিভিশনের উপপুলিশ কমিশনার শাহ ইফতেখার আহম্মেদ বলেন, ‘চাঁদাবাজির সঙ্গে কতিপয় অসাধু পুলিশ, রাজনীতিক ও প্রভাবশালী মহলের যোগসাজশ থাকলেও থাকতে পারে।’