প্রায়ই বলা হয় যে, পাকিস্তানের রাজনীতির তিনটি নিয়ামক আছে- আল্লাহ, সেনাবাহিনী এবং আমেরিকা। সিদ্ধান্ত থেকে শুরু করে দলত্যাগ, সবকিছুই এই তিন নিয়ন্ত্রণকর্তার মর্জি মাফিক হয়ে থাকে।
পাকিস্তানের চলমান রাজনৈতিক সঙ্কটে এই তিন নিয়ামকের দুটি- সেনাবাহিনী এবং আমেরিকার উপস্থিতি প্রায় স্পষ্টভাবেই দেখা যাচ্ছে।
সেনাবাহিনী যখন পাকিস্তানে রাজনৈতিক ঘটনাপ্রবাহের ওপর সক্রিয়ভাবে নজর রাখছে তখন আমেরিকা ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী ইমরান খান এবং তার শীর্ষ সহযোগীদের কাছ থেকে তাদের সরকারের পতনের পেছনে ষড়যন্ত্র করার অভিযোগের মুখোমুখি হচ্ছে।
এবং যদিও এই সঙ্কটে ধর্মের কোনো স্পষ্ট ভূমিকা ছিল না, ইমরান খানের বিরোধীরা প্রায়ই অভিযোগ করেছেন যে, তিনি প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তার শেষ দিনগুলোতে সমর্থন আদায়ের জন্য আল্লাহর নাম ব্যবহার করছিলেন।
এই তিন নিয়ন্ত্রণকর্তার বদৌলতে পাকিস্তানের কোনো প্রধানমন্ত্রী ক্ষমতার পূর্ণ মেয়াদ শেষ করতে পারেননি। ইমরানের খানের ভাগ্যেও তাই ঘটল। এছাড়া তিনিই দেশটির ইতিহাসের প্রথম অনাস্থা ভোটে হেরে প্রধানমন্ত্রীত্ব ছাড়তে বাধ্য হয়েছেন।
আল্লাহ
পাকিস্তান প্রতিষ্ঠিতই হয়েছিল ধর্মের ভিত্তিতে। ফলে সে দেশের রাজনীতিতে ধর্ম সবসময়ই একটি বড় ভুমিকা পালন করবে সেটাই স্বাভাবিক। এবং প্রধানমন্ত্রী হিসাবে ইমরানের ৩ বছর ৭ মাসের মেয়াদের বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই তা সত্য হয়েছিল।
সংসদে অনাস্থা ভোটের আগে ইমরান সরকার উগ্র ধর্মীয় জনতার দিক থেকেও একটি বড় চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হয়েছিল, যার সামনে সমগ্র রাষ্ট্রযন্ত্র নতজানু হয়ে পড়েছিল। গত বছরের নভেম্বরে কট্টরপন্থী ইসলামপন্থী নেতা এবং তেহরিক-ই-লাব্বাইক পাকিস্তানের (টিএলপি) প্রধান সাদ রিজভিকে তার অনুসারীদের কয়েক সপ্তাহের সহিংস বিক্ষোভ শেষ করার চুক্তির অংশ হিসেবে মুক্তি দিতে বাধ্য হয়েছিল পাকিস্তান সরকার।
ইসলামি কট্টরপন্থীরা কীভাবে পাকিস্তানে তাদের দাবি আদায়ে ধর্মকে ব্যবহার করছে এই ঘটনা তার একটি ছোট উদাহরণ মাত্র। প্রকৃতপক্ষে, পাকিস্তানের মূলধারার রাজনৈতিক দলগুলো এখন ক্রমবর্ধমানভাবে জঙ্গি গোষ্ঠীগুলোর সঙ্গে জোট গঠন করছে এবং তাদের রাজনৈতিক এজেন্ডাকে এগিয়ে নিতে ধর্মকে ব্যবহার করছে।
এমনকি ইমরান খানকে ক্ষমতা থেকে উৎখাতকারী বিরোধী দলগুলোর রংধনু জোটেও কিছু উগ্র ধর্মীয় গোষ্ঠী আছে।
ইমরান নিজেই তার ক্ষমতার শেষ দিনগুলোতে তার প্রায় সমস্ত বক্তৃতায় ‘আল্লাহ’কে ডাকছিলেন। বেশ কয়েকজন সংসদ সদস্যকে হারিয়ে বিপর্যস্ত এই নেতা প্রায়শই তার প্রতি আস্থা ধরে রাখার জন্য ধর্মের প্রতি ঝুঁকে পড়ছিলেন।
যদিও ধর্ম শেষ পর্যন্ত ইমরানের ক্ষমতাচ্যুতির কারণ হয়ে ওঠেনি, তবে এতে সন্দেহ নেই যে পাকিস্তানে সরকার পতনে ধর্মের ব্যাপক ক্ষমতা রয়েছে।
পাকিস্তানের সাবেক প্রেসিডেন্ট জিয়া-উল-হক যেমন এক সাক্ষাতকারে ইঙ্গিত দিয়েছিলেন, ‘পাকিস্তান থেকে ইসলামকে বের করে নিন এবং এটিকে একটি ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্রে পরিণত করুন; আর নয়তো এটি ভেঙে পড়বে’।
সেনাবাহিনী
পাকিস্তান নিজেকে একটি গণতান্ত্রিক সংসদীয় প্রজাতন্ত্র বলে অভিহিত করে। কিন্তু সবাই জানে যে তার সামরিক বাহিনী ক্ষমতার করিডোরে গুলি চালায়।
পাকিস্তানের ইতিহাসের বেশিরভাগ সময়ই প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে- সামরিক আইন, জরুরি অবস্থা বা প্রক্সির মাধ্যমে- দেশটি শাসন করেছে এর সেনাবাহিনী।
আনুষ্ঠানিকভাবে, সামরিক বাহিনী স্বাধীনতার পর থেকে ৩৬ বছর ধরে পাকিস্তান শাসন করেছে। যা দেশটির ইতিহাসের অর্ধেক সময়।
এমনকি সরাসরি শাসন না করলেও পাকিস্তানের শীর্ষ সেনা কর্মকর্তারা পর্দার আড়ালে থেকে কলকাঠি নাড়ানোর জন্য কুখ্যাত। এমনকি পাকিস্তানি মিডিয়া প্রায়ই ইমরানের সরকারকে ‘হাইব্রিড সরকার’ হিসেবে উল্লেখ করত।
ইমরানের কথাই ধরুন। একসময় তিনি সেনাবাহিনীর প্রিয় ছিলেন। কিন্তু সম্প্রতি বিরোধীদের আক্রমণের সময় সেনাবাহিনী কার্যত তাকে পরিত্যাগ করে। সেনাবাহিনীর সঙ্গে খানের সমস্যা কয়েক মাস আগে শুরু হয়েছিল, যখন তিনি আইএসআই প্রধানের নিয়োগের বিষয়ে সেনাপ্রধান কামার জাভেদ বাজওয়ার সঙ্গে বিবাদে জড়িয়েছেন।
সাম্প্রতিক রাজনৈতিক সঙ্কটের সময় ইমরান সেনাপ্রধান জেনারেল কামার জাভেদ বাজওয়ার সঙ্গে একাধিকবার দেখা করলেও, এটা স্পষ্ট হয়ে গেছে যে সেনাবাহিনী তার প্রতি সমর্থন প্রত্যাহার করেছে। যদিও সেনাবাহিনী জোর দিয়ে বলছিল যে, এতে তাদের কোন ভূমিকা নেই। কিন্তু সূক্ষ্ম ইঙ্গিতটি বেশ স্পষ্ট ছিল।
পাকিস্তানের সেনাবাহিনী দেশটির রাজনীতির টেবিলে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অবস্থান দখল করে রাখে। পাকিস্তানের সামরিক বাহিনী রাস্তা তৈরি করে, কারখানা চালায়, ব্যাংকের মালিক এবং এমনকি টিভি চ্যানেলও পরিচালনা করে। বিশ্বের আর কোনো গণতান্ত্রিক দেশে এমন সেনাবাহিনী নেই।
১৯৫৮ সালে পাকিস্তান প্রথম সামরিক শাসনের অধীনে আসে। সে বছর জেনারেল আইয়ুব খান ইস্কান্দার মির্জার কাছ থেকে প্রেসিডেন্ট পদ কেড়ে নেন। আনুষ্ঠানিকভাবে সামরিক আইন ৪৪ মাস স্থায়ী হয়েছিল। কিন্তু আইয়ুব খান ১৯৬৯ সালে ক্ষমতা ছাড়েন এবং জেনারেল ইয়াহিয়া খানকে তার উত্তরসূরি হিসেবে নিয়োগ দেন।
আইয়ুব খানের মতো ইয়াহিয়া খানও প্রধান সামরিক আইন প্রশাসক ছিলেন। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে বাংলাদেশ-ভারতের বাহিনীর কাছে পরাজয়ের পর ইয়াহিয়া খান তার উত্তরসূরি হিসেবে দেশের প্রথম সাধারণ নির্বাচনে জয়ী জুলফিকার আলী ভুট্টোকে প্রেসিডেন্ট হিসেবে নিয়োগ দিতে বাধ্য হন।
দ্বিতীয় সামরিক অভ্যুত্থান হয়েছিল ১৯৭৭ সালে। সেবছর জেনারেল জিয়া উল হক সংসদ ভেঙে দেন এবং ভুট্টোকে গৃহবন্দী করেন। ১৯৮৫ সালে মোহাম্মদ খান জুনেজোকে দেশের নতুন প্রধানমন্ত্রী হিসেবে বেছে নেওয়ার পর তিনি পদত্যাগ করেন। জিয়া উল হক ১৯৮৮ সালে বিমান দুর্ঘটনায় মারা যাওয়ার আগ পর্যন্ত প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
তৃতীয় এবং শেষ সামরিক অভ্যুত্থান ঘটে ১৯৯৯ সালে, যখন জেনারেল পারভেজ মোশাররফ নওয়াজ শরীফকে ক্ষমতাচ্যুত করেন। মোশাররফ ২০০৮ সালে পদত্যাগ করেন এবং আসিফ আলী জারদারি নতুন রাষ্ট্রপতি হন।
আমেরিকা
পাকিস্তানের সব সময়ের বন্ধু যুক্তরাষ্ট্র। তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এই দুই দেশের সম্পর্কে টানাপোড়েন সৃষ্টি হয়। সদ্য বিদায়ী প্রধানমন্ত্রী ইমারান খান প্রকাশ্যে একজন আমেরিকান কূটনীতিকের নাম উল্লেখ করে তার সরকারের পতনের পেছনে ‘বিদেশী ষড়যন্ত্র’ থাকার অভিযোগ করেন।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি ইমরানের শত্রুভাবাপন্ন দৃষ্টিভঙ্গি দেশটির প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকে আরও কঠোর হয়েছে। যার ফলে সেনাবাহিনীর সঙ্গেও তার সম্পর্কের অবনতি ঘটে। কারণ পাকিস্তানের সেনাবাহিনী মার্কিন সাহায্যের উপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল।
গত শতকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং পাকিস্তান শক্তিশালী কৌশলগত সম্পর্ক উপভোগ করত। ওয়াশিংটন ইসলামাবাদকে সোভিয়েত ইউনিয়নের বিরুদ্ধে একটি ইসলামিক শক্তি হিসেবে ব্যবহার করেছিল। যুক্তরাষ্ট্র ১৯৮০ এবং ৯০-র দশকে আফগানিস্তানে যুদ্ধের সময় সোভিয়েত রাশিয়ার বিরুদ্ধে পাকিস্তানকে ব্যবহার করেছিল এবং ২০১০ সাল পর্যন্ত অর্থনৈতিক ও সামরিক উভয় ক্ষেত্রেই সাহায্য অব্যাহত রাখে।
প্রকৃতপক্ষে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ঐতিহাসিকভাবে পাকিস্তানকেই সবচেয়ে বেশি সাহায্য করেছে।
তবে গত কয়েক বছরে পাকিস্তানের প্রতি আমেরিকান সাহায্য ব্যাপকভাবে কমে গেছে। বিশেষকরে, ২০১৯ সাল থেকে। তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সন্ত্রাস বন্ধে যথেষ্ট কাজ না করার জন্য পাকিস্তানকে কটাক্ষ করেছিলেন। অথচ ইমরান খান দাবি করেছিলেন যে, ট্রাম্পের সঙ্গে তার ভাল সম্পর্ক রয়েছে।
২০২০ সালে জো বাইডেন ক্ষমতায় আসার পর পাকিস্তানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্ক আরও হিমশীতল হয়ে ওঠে। বাইডেন প্রেসিডেন্ট হওয়ার পর ইমরান খানকে একবারের জন্যও ফোন করেননি।
চীনের সঙ্গে সম্পর্ক বাড়ানোর পর থেকেই পাকিস্তানের সঙ্গে আমেরিকার সম্পর্কও খারাপ হতে থাকে। চীন তার বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভের অধীনে পাকিস্তানে বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করে এবং ভারতকে মোকাবেলা করার ক্ষেত্রে পাকিস্তানেকে সব সময়ের মিত্র এবং মূল সমর্থক হিসেবে গণ্য করে।
পাকিস্তানের মিত্র হিসেবে চীনের গুরুত্ব পাকিস্তানের নতুন প্রধানমন্ত্রী শেহবাজ শরীফও স্বীকার করেছেন। উদ্বোধনী ভাষণেই চীনের সঙ্গে সম্পর্ক অটুট রাখার ঘোষণা দিয়েছেন তিনি।
তাছাড়া, আফগানিস্তান থেকে বেরিয়ে যাওয়ার পর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রও পাকিস্তানের প্রতি আগ্রহ হারিয়েছে। কারণ এখন আর পাকিস্তানের অত বেশি দরকার নেই। আফগানিস্তানের সঙ্গে সম্পর্ক রক্ষায় কাতার এখন তাদের প্রধান মধ্যস্থতাকারী।
পরিস্থিতি আরও খারাপ করেছে ইউক্রেনে রাশিয়ার আগ্রাসনের দিনে ইমরানের মস্কো সফর এবং প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের সঙ্গে ছবি তোলা।
ইমরান দাবি করেন যে, তার রাশিয়া সফরের পরই তার সরকারকে বিতাড়িত করার জন্য ‘বিদেশী ষড়যন্ত্র’ শুরু হয়েছে। তিনি বলেন যে, বাইডেন প্রশাসন তার সফরে অসন্তোষ প্রকাশ করেছিল এবং তাকে ক্ষমতা থেকে সরিয়ে দেওয়ার হুমকি দিয়ে চিঠি দিয়েছে।
তবে, আমেরিকা ইমরানের অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেছে এবং বলেছে, পাকিস্তানে যে সঙ্কট চলছে তাতে তাদের কোনো হাত নেই।
সত্য যাই হোক না কেন, আমেরিকা পাকিস্তানের রাজনীতিতে বড় নিয়ন্ত্রণকারী হয়েই থাকবে। ইমরান খানের অভিযোগের সময় সেনা প্রধান জেনারেল বাজওয়া আমেরিকার প্রতি বন্ধুত্বপূর্ণ অবস্থান নিয়েছিলেন। তিনি বলেছিলেন, চীন ছাড়াও পাকিস্তান আমেরিকার সঙ্গে দীর্ঘস্থায়ী কৌশলগত সম্পর্ক বজায় রাখবে।
ফলে এটা স্পষ্ট যে, চীনের সঙ্গে ক্রমবর্ধমান সম্পর্ক এবং যেই দলই ক্ষমতায় থাকুক না কেন তার মধ্যেও পাকিস্তানের জেনারেলরা ওয়াশিংটনের সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রাখতে চায়।