বাজেট নিয়ে সিপিডির সুপারিশ

ঋণ ও করখেলাপিদের ছাড় নয়

করোনা মহামারী, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ, পণ্যমূল্য বৃদ্ধিসহ বিভিন্ন কারণে সাম্প্রতিক সময়ে চ্যালেঞ্জের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে দেশের অর্থনীতি। বিশেষ করে বহির্খাতের চাপ বাড়ছে। চলতি অর্থবছরের প্রথম ৮ মাসে বাণিজ্য ঘাটতি ২২ বিলিয়ন ডলার। জুন পর্যন্ত অর্থাৎ পুরো বছরে যা ৩০ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে যাবে। এটি অর্থনীতির জন্য বিশাল চাপ। এ অবস্থায় অর্থনীতির সক্ষমতা বাড়াতে সরকারের রাজস্ব আয় বাড়ানোর কোনো বিকল্প নেই। সেক্ষেত্রে নির্বাচনকে সামনে রেখে রাজনৈতিক বিবেচনায় ঋণখেলাপি ও করফাঁকিবাজদের ছাড় দেওয়া উচিত নয়। এছাড়া করোনার কারণে চলতি বছর ব্যক্তি ও করপোরেটে যে করহার কমানো হয়েছিল, তা আগের জায়গায় নিয়ে যাওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়লগ (সিপিডি) ব্রিফিংয়ে গতকাল মঙ্গলবার এসব কথা বলা হয়।

সিপিডির কার্যালয়ে এ ব্রিফিংয়ে বক্তব্য রাখেন সংস্থাটির বিশেষ ফেলো ড. মোস্তাফিজুর রহমান, নির্বাহী পরিচালক ড. ফাহমিদা খাতুন, গবেষণা পরিচালক ড. খোন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম এবং সিনিয়র রিসার্চ ফেলো তৌফিকুল ইসলাম খান। এ সময় বক্তারা বলেন, এবারের বাজেটে মূল ফোকাস হওয়া উচিত জনগণের কল্যাণ এবং মানুষের ক্রয়ক্ষমতা বাড়ানো। বিশেষ পিছিয়ে পড়া দরিদ্র মানুষের কাছে আয়ের পুনর্বণ্টন জরুরি। এছাড়া ব্যক্তি শ্রেণির করদাতাদের করমুক্ত আয়সীমা বাড়িয়ে সাড়ে ৩ লাখ টাকা করার সুপারিশ করেছে সিপিডি। তাদের মতে, শ্রীলঙ্কার অর্থনৈতিক বিপর্যয়ের সঙ্গে এখনই বাংলাদেশের সঙ্গে তুলনা করা যায় না। কিন্তু এই ঘটনা থেকে আমাদের শিক্ষণীয় রয়েছে।

ড. মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, একটি রাজনৈতিক সরকার নির্বাচনের সময়ে জনগণের ওপর নির্ভর করে। সেক্ষেত্রে স্বল্পসংখ্যক করখেলাপি ও ঋণখেলাপি অসন্তুষ্ট হবে, সেদিকে গুরুত্ব দেওয়া উচিত নয়। বরং তাদের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স অবস্থান নেওয়া হলে জনগণ খুশি হবে। আর এই বিষয়টি অত্যন্ত সহজে যেকেউ বুঝবে। তিনি বলেন, বাজেটে কিছু কিছু প্রাতিষ্ঠানিক পদক্ষেপের কথা বলা হয়েছে। ফলে ঋণ ও করখেলাপিদের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স বাস্তবায়নের পথনকশা আমরা এবারের বাজেটে প্রত্যাশা করছি। আর এটিই নির্বাচনের আগে সরকারের জন্য বড় পদক্ষেপ হওয়া উচিত। কিন্তু আমরা সেক্ষেত্রে উল্টো দেখছি। করখেলাপিদের কালো টাকা সাদা করার সুযোগ দেওয়া হচ্ছে। ঋণখেলাপিদের ঋণ পরিশোধে অর্থ জমা দেওয়ার সময় পিছিয়ে দেওয়া হচ্ছে। এটি বাজারে বিপরীতমুখী বার্তা দিচ্ছে। করখেলাপিদের ধরার বিষয়টি রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত বলে মনে করেন মোস্তাফিজুর রহমান।

এখন শ্রীলঙ্কার বিষয়টি সামনে এসেছে। দেশটির মানুষ অনেক বেশি শিক্ষিত। তাদের অর্থনীতিতেও অনেক শক্তির জায়গা ছিল। কিন্তু কিছু ভুল সিদ্ধান্তে ইতিমধ্যে দেশটি অর্থনৈতিকভাবে পঙ্গু হয়ে গেছে। মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, শ্রীলঙ্কা কখনই স্বল্পোন্নত দেশের তালিকায় (এলডিসি) ছিল না। ১৯৭১ সালে ২৫টি দেশ নিয়ে এলডিসি ক্যাটাগরি করা হয়, সেখানে শ্রীলঙ্কার নাম আসেনি। তবে অর্থনৈতিকভাবে খারাপ হওয়ার পর এবার এলডিসিতে আসতে পারে। তিনি বলেন, শ্রীলঙ্কার অর্থনৈতিক বিপর্যয়ের অন্যতম কারণ হলো দেশটি ঋণ নিয়ে বড় বড় প্রজেক্ট করেছে। আবার প্রজেক্টের সময় বাড়িয়েছে। এতে ব্যয়ও বেড়েছে। এ অবস্থায় প্রজেক্ট শেষ না হলেও ঋণ পরিশোধের সময় চলে এসেছে, যা দেশটির বিপদের কারণ। তিনি বলেন, এখান থেকে বাংলাদেশের শিক্ষা নেওয়ার আছে। আমাদের বড় বড় প্রকল্পগুলো যাতে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে শেষ হয়, সেটি বিবেচনায় রাখতে হবে। দুর্নীতির মাধ্যমে প্রকল্পের ব্যয় ও সময় বাড়ানো উচিত নয়।

ড. ফাহমিদা খাতুন বলেন, এবারের বাজেটে আমাদেরকে রাজস্ব আয়ের কাঠামোতে জোর দিতে হবে। বিশেষ করে করোনার পর এ বছরের বাজেটে অগ্রাধিকারে কিছু পরিবর্তন আনা জরুরি। এক্ষেত্রে মানুষের ক্রয়ক্ষমতা বাড়াতে পদক্ষেপ নিতে হবে। তিনি বলেন, বর্তমানে দেশের মানুষের করমুক্ত আয়সীমা ৩ লাখ টাকা। এটি বাড়িয়ে ৩ লাখ ৫০ হাজার টাকা করতে হবে। অন্যদিকে করোনার বিবেচনায় চলতি অর্থবছরের বাজেটে ব্যক্তি খাতে সর্বোচ্চ করহার কমিয়ে ২৫ শতাংশ করা হয়েছিল। আগামী বাজেটে তা আগের জায়গায় অর্থাৎ ৩০ শতাংশে নিয়ে যেতে হবে। এছাড়া করোনার কারণে বেশ কিছু খাতে করপোরেট কর কমানো হয়েছিল। এগুলো আবার আগের জায়গায় নেওয়া উচিত।

তিনি বলেন, আমাদের বৈদেশিক ঋণ নেওয়ার প্রবণতা বেড়েছে। ঝুঁকিপূর্ণ বৈদেশিক ঋণ কমিয়ে আনতে হবে। ফাহমিদা খাতুন বলেন, কর ফাঁকি রোধে সামগ্রিকভাবে প্রতিষ্ঠানকে শক্তিশালী করতে হবে। যতক্ষণ পর্যন্ত প্রতিষ্ঠানগুলো সংস্কারের মাধ্যমে শক্তিশালী হয়ে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত থেকে সিদ্ধান্ত নিতে না পারবে, ততক্ষণ পর্যন্ত তাদের ওপর চাপ ও তদবির থাকবে। তার মতে, সংস্কারের একটি অংশ হলো প্রযুক্তি। এই প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়লে রাজনৈতিক চাপেও অনেক কিছু করা কঠিন হয়ে পড়বে। ফাহমিদা খাতুন আরও বলেন, জিনিসপত্রের দাম অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে গেছে। কিন্তু মূল্যস্ফীতির সরকারি তথ্যে প্রকৃত চিত্র আসছে না। এ বিষয়ে সরকারকে নজর দিতে হবে। এছাড়া মুদ্রার বিনিময় হার স্থিতিশীল রাখতে পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি। প্রবাসী আয় (রেমিট্যান্স) বাড়াতেও প্রয়োজনীয় উদ্যোগ জরুরি। না হলে চলতি হিসাবের ভারসাম্যে বড় ধরনের সমস্যা হবে। ফাহমিদা খাতুন আরও বলেন, দেশের সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো বছরের পর বছর লোকসান দিয়ে যাচ্ছে। এসব প্রতিষ্ঠানকে অর্থনৈতিক জোনের আওতায় দেওয়া যেতে পারে। এছাড়া শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ যথেষ্ট নয় বলে মনে করেন তিনি।

ড. খোন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম বলেন, আমাদের সামনে চারটি মাইলফলক রয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে ২০২৬ সালে এলডিসি উত্তরণ, ২০৩০ সালে এসডিজি বাস্তবায়ন, ২০৩১ সালে উচ্চ মধ্যম আয়ের দেশে পদাপণ এবং ২০৪১ সালে উচ্চ আয়ের দেশে উন্নীত হওয়া। এক্ষেত্রে নীরবে আমাদের কাছ থেকে সময় চলে যাচ্ছে। এ অবস্থায় শুধুমাত্র সামষ্টিক অর্থনীতি দিয়ে এই লক্ষ্য পূরণ করা যাবে না। এর সঙ্গে সামাজিক ও অর্থনৈতিক নতুন অর্ডার প্রয়োজন। টেকসই প্রবৃদ্ধি, পরিবেশবান্ধব জ্বালানি, সামাজিক নিরাপত্তা, শ্রমিকের অধিকার, স্বাস্থ্যসম্মত জীবন এবং সামগ্রিকভাবে পরিবেশের উন্নয়ন জরুরি। কিন্তু এই অর্ডারের ক্ষেত্রে বড় ধরনের ঘাটতি রয়েছে।

তিনি বলেন, লক্ষ্যে পৌঁছাতে হলে মধ্যমেয়াদি যে ধরনের পদক্ষেপ দরকার, সেসব পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে না। এক্ষেত্রে দেশের অর্থনীতির জন্য আমরা ৮টি বিষয়কে চিহ্নিত করেছি। এগুলো হলো ঋণ ও দায় ব্যবস্থাপনা, ভর্তুকি ব্যবস্থাপনা, বাজার ব্যবস্থাপনা, সরকারি ব্যয়ের সুশাসন, খাতভিত্তিক সুশাসন, সরকারি প্রতিষ্ঠানের সংস্কার, রাজস্ব কাঠামো তৈরি এবং কর আদায়ের ব্যবস্থাপনা। সরকারের বাজেট কাঠামোতে দ্রুত এগুলোকে অন্তর্ভুক্ত করতে হবে।

খোন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম আরও বলেন, নির্বাচনকে সামনে রেখে সরকার ঋণখেলাপি ও কর ফাঁকিবাজদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেবে কিনা, সেটি নিয়ে সন্দেহ রয়েছে। তবে আমরা মনে করি, নির্বাচনের কারণে এদের উৎসাহিত করা উচিত নয়। তিনি বলেন, ব্যাংক ও আর্থিক খাতের সংস্কারের জন্য উদ্যোগ নেওয়া জরুরি।