বাগানের জুয়েল আবাহনীর সমর্থক

দীর্ঘ ক্যারিয়ারে একবারই আবাহনীর জার্সি গায়ে চড়িয়েছিলেন। সেটি ছোট এক টুর্নামেন্টে অতিথি খেলোয়াড় হিসেবে। এছাড়া কখনই তিনি আবাহনীর ছিলেন না। ক্যারিয়ারের বড় সময় কেটেছে চীর বৈরী মোহামেডানের আঙিনায়। এছাড়া পুরো একটা মৌসুম ভারতের ঐতিহ্যবাহী দল মোহনবাগানে খেলেছেন দাপটের সঙ্গে। তারপরও আগামীকাল কলকাতায় যখন আবাহনী মোহনবাগানের মুখোমুখি হবে, জাতীয় দলের সাবেক অধিনায়ক জুয়েল রানার সমর্থন থাকবে আবাহনীর পক্ষে।

২০১৮ সালের ২১ এপ্রিল দেশ ছেড়ে পাকাপাকি যুক্তরাষ্ট্রে নিবাস গড়েন ১৯৯৯ সাফ গেমসে সোনাজয়ী বাংলাদেশ দলের অধিনায়ক। এ মাসের ৯ এপ্রিল দেশে এসেছেন অসুস্থ মাকে দেখতে। দু’দিন পরই ফিরে যাবেন মার্কিন মুলুকে। প্রায় চার বছর পর দেশে ফেরার কথা খুব আপনজন ছাড়া কাউকেই জানাননি জুয়েল। তবে মোহনবাগান নামটা সামনে আসায় বাধ্য হয়েই তাকে ফিরতে হলো ২২ বছর পুরনো স্মৃতিতে। ১৯৯৯ সালে মোহনবাগান বিদেশি কোটায় নিয়েছিল এই নির্ভরযোগ্য ডিফেন্ডারকে। কলকাতা লিগ ছাড়াও আইএফএ শিল্ড, ডুরান্ড কাপে খেলেছেন বাগানের জার্সিতে। অতীতে ইস্ট বেঙ্গল ও কলকাতা মোহামেডানে নিয়মিতই খেলতে দেখা যেত বাংলাদেশের অনেক তারকাকে। তবে পুরোদস্তুর কলকাতার ক্লাব বাগানে বাংলাদেশি কারও খেলা কল্পনাও অনেকে করতেন না। আসলে এপার বাংলার কোনো ফুটবলারকে কখনই সেভাবে গোনায় ধরত না বাগান। তবে জুয়েল রানার প্রতিভায় বাধ্য হয়েই তাকে দলে নেয় পশ্চিমবঙ্গের সবচেয়ে পুরান ক্লাবটি। বাগানে খেলার অভিজ্ঞতা অবশ্য সুখকর ছিল না জুয়েলের। স্মৃতির ঝাঁপি খুলে বললেন, ‘আসলে মোহনবাগান দলটি পুরোপুরি কলকাতার মানুষরা গড়ে তুলেছিলেন। তারা এপার বাংলার কাউকে মন থেকে মেনে নিতে পারতেন না। ফলে প্রথম দিন থেকেই সতীর্থদের কাছ থেকে একটা বৈরী আচরণ টের পাচ্ছিলাম। দিন যত গিয়েছে সেটা প্রকট আকার ধারণ করে। তারা আসলে বাংলাদেশের কোনো ফুটবলারকে বিদেশি হিসেবে মেনে নিতে পারেনি। সতীর্থরা ঠিকমতো কথাই বলতেন না। বড্ড নিঃসঙ্গ হয়ে পড়েছিলাম। বিরক্তিও বাসা বেঁধেছিল। তাই নিজে থেকেই রিলিজ নিয়ে চলে আসি। তবে যতদিন ছিলাম, নিয়মিতই খেলেছি মূল একাদশে।’

বাগানের প্রতি সেই বিতৃষ্ণা থেকে নয়, আগামীকাল এএফসি কাপের ম্যাচে দেশের দল বলেই আবাহনীর সমর্থন করবেন জুয়েল, ‘এটা ঠিক আবাহনীর হয়ে আমার খেলা হয়নি খুব একটা। তবে একটা টুর্নামেন্ট খেলেছিলাম অতিথি খেলোয়াড় হিসেবে। বরং আমাকে সবাই জানে মোহামেডানের জুয়েল হিসেবে। কাল খুব করে চাইব আবাহনী বাগানকে হারিয়ে গ্রুপপর্বে যাক। কারণ দলের চেয়ে দেশ বড়।’

১৯৯৯ সাফ গেমস শিরোপা জয়ের পর বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশনের তৎকালীন কমিটির এই বিতর্কিত সিদ্ধান্তে জাতীয় দল থেকে হুট করে অবসর নেন জুয়েল। জাতীয় দলের খেলোয়াড়দের নিয়ে পুলপ্রথা চালু করার প্রতিবাদে তিনি সিদ্ধান্ত নেন লাল-সবুজে জার্সিতে না খেলার। এরপরও আরও আট বছর দাপটে সঙ্গে ক্লাব ফুটবল খেলেছেন জুয়েল। মুক্তিযোদ্ধা, ব্রাদার্স, মোহামেডানে খেলে ২০০৮ সালে অবসর নেন। পরবর্তী সময়ে কোচিংয়ের ওপর নেন এএফসি ‘এ’ লাইসেন্স। তবে কোচিংয়েও ক্যারিয়ার গড়েননি নানা কারণে। উল্টো এখন ফুটবল থেকে দূরের জীবনেই প্রশান্তি খুঁজে নিচ্ছেন জুয়েল, ‘ভার্জিনিয়ায় পরিবার নিয়ে বড্ড ভালো আছি। সেখানকার পরিবেশটা আমার খুব পছন্দ। এমাজনে চাকরি করি। ছেলে-মেয়েরা বড় হচ্ছে। সত্যি বললে ঘুণে ধরা দেশের ফুটবল নিয়ে ভাবতে একদম ভালো লাগে না। এখানে কখনই যোগ্য সম্মান পাওয়া যায় না। তাই ফুটবল থেকে দূরে সরে গিয়ে বেশ ভালো আছি।’

দেশের ফুটবল ইতিহাসে সেরা ডিফেন্ডারদের একজন জুয়েল রানা। অভিজ্ঞতার ঝুলিটাও সমৃদ্ধ। তবে সেটা ঠিকঠাক কাজে লাগানোর পরিবেশটাই পাননি অভিমানী জুয়েল। খুব করে চেয়েছিলেন নিজের অভিজ্ঞতা ফুটবল উন্নয়নে কাজে লাগাতে। সেটার সুযোগ হয়নি বলেই দুই সন্তান ও স্ত্রীকে নিয়ে বেঁছে নিয়েছেন প্রবাস জীবন। তবে কাল চেনা সল্টলেকে আবাহনী যখন বাগানের মোকাবিলা করবে, ২২ বছর আগের স্মৃতি নিশ্চয় তাড়িয়ে বেড়াবে জুয়েলকে।