১৩ বছর ধরে তিল তিল করে যে সংসার গড়েছিলাম; স্বামীকে হারিয়ে তার সবই শেষ হয়ে গেল। এখন ছোট ছোট দুই শিশু সন্তান নিয়ে কী করব? কোথায় দাঁড়াব?
নিউমার্কেটের সংঘর্ষে স্বামী মোরসালিনের মৃত্যুর পর এভাবেই বিলাপ করছিলেন স্ত্রী মিতু আক্তার।
স্বজনদের জড়িয়ে ধরে সন্তানদের অনিশ্চিত ভবিষ্যতের শঙ্কায় বারবার মূর্ছা যাচ্ছিলেন। পরক্ষণেই সংবিৎ ফিরে পেয়ে অনিশ্চিত ভবিষ্যতের শঙ্কার কথা জানাচ্ছিলেন। বলছিলেন, কীভাবে চলবে তার সংসার। কে খরচ জোগাবে তার দুই সন্তানের। এমন মৃত্যু মেনে নিতে পারছিলেন না মোরসালিনের মা-ও। তিনিও বিলাপ করছিলেন।
বৃহস্পতিবার ভোরে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মোরসালিনের মৃত্যুর পরপরই তার স্বজনরা কান্নায় ভেঙে পড়েন। পরে ময়নাতদন্তের শেষে বৃহস্পতিবার দুপুরেই রাজধানীর কামরাঙ্গীরচরের পশ্চিম রসুলপুরের জরাজীর্ণ বাসায় নিয়ে যাওয়া হয় মোরসালিনের মরদেহ। এরপর সেখানেও স্বজনরা কান্নায় ভেঙে পড়েন।
সাত বছরের মেয়ে হুমায়রা ও পাঁচ বছরের ছেলে হানিফকে নিয়ে কাঁদছিলেন মিতু আক্তার।
কান্নাজড়িত কণ্ঠে তিনি সাংবাদিকদের জানান, যে সংসার চালাত সে আর নেই। কীভাবে কী করব? কিছু মাথায় আসছে না। আমার স্বামী গন্ডগোলে পড়ে গেছে। কারা মেরেছে সেটাও জানি না। মারামারির ঘটনার পরও মার্কেট সমিতি কেন মার্কেট বন্ধ রাখল না? এমনটা বলে ক্ষোভ প্রকাশ করেন তিনি।
বলেন, ‘যা হারানোর সেটা আমরা হারিয়েছি। আমার দুইটা সন্তান। ১৩ বছরের সংসারের সব শেষ হয়ে গেল। সরকার ও মার্কেট সমিতির লোকজন যেন মোরসালিনের পরিবারের পাশে দাঁড়ায়, এমন আহ্বান জানিয়েছেন নিহতের স্বজনরা।
মোরসালিনের মা নূরজাহান বেগম বলেন, আমার নির্দোষ ছেলেকে যারা মেরে ফেলেছে তাদের বিচার চাই।
মোরসালিনের ভাই নুর মোহাম্মদ বলেন, ‘আমার ভাই নিউ মার্কেটের একটি রেডিমেড পোশাক দোকানে ৯ হাজার টাকা বেতনে চাকরি করত। সেই টাকায় তার সংসার চলত। মাকেও কিছু টাকা দিত। এখন মোরসালিন নাই। তাই সবার চোখে অন্ধকার।’
তিনি আরও বলেন, ‘গত দুই দিন ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ছিল ভাই। সেখানেও অনেক খরচ হয়েছে। ধার-দেনা করেছি। কিন্তু ভাইকে বাঁচাতে পারলাম না। আমরা এ ঘটনার বিচার চাই।’
গত মঙ্গলবার দুপুরে সংঘর্ষের সময় নুরজাহান মার্কেটের সামনে আহত হন মোরসালিন। পরবর্তীতে দুই যুবক অচেতন অবস্থায় মোরসালিনকে ঢামেক হাসপাতালে ভর্তি করেন। তার বাড়ি কুমিল্লা দাউদকান্দি উপজেলার কালাই নগর গ্রামে। থাকতেন কামরাঙ্গীরচর পশ্চিম রসুলপুর গ্রামে। স্ত্রী ও তার দুই মেয়ে সুমাইয়া ইসলাম লামহা (৭) ও আমির হামজা (৪) নিয়ে সেখানেই বাস করতেন। তার বাবার নাম মৃত মো. মানিক মিয়া।
সেদিনের ঘটনার কথা বলতে গিয়ে মোরসালিনের স্ত্রী মিতু আক্তার দেশ রূপান্তরকে বলেন, মঙ্গলবার সকালে কর্মস্থলের উদ্দেশ্যে সে বাসা থেকে বের হয়েছিল। রাতেই ফেরার অপেক্ষায় ছিলাম আমরা। কিন্তু আহত হয়ে হাসপাতালে যায়। এখন শুধুই লাশ।
মোরসালিনের মাথায় গভীর ক্ষত পাওয়া গেছে
রাজধানীর নিউমার্কেটে সংঘর্ষের ঘটনায় চিকিৎসাধীন মোরসালিনের (২৭) মৃতদেহের ময়নাতদন্ত সম্পন্ন হয় বৃহস্পতিবার দুপুর একটার দিকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ মর্গে। ময়নাতদন্ত করেন ঢাকা মেডিকেল কলেজ ফরেনসিক মেডিসিনের সহযোগী অধ্যাপক ডা. মনিকা খন্দকার। এর আগে মৃতদেহের সুরতহাল প্রতিবেদন তৈরি করেন নিউমার্কেট থানার পরিদর্শক (অপারেশন) হালদার অর্পিত ঠাকুর।
সুরতহাল প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, মোরসালিনের মাথায় মাঝখানে গভীর কাটা জখম রয়েছে। এ ছাড়া কপালের ডান পাশে, নাকের বাম পাশে জখম রয়েছে।
সুরতহাল প্রতিবেদনে ঘটনার প্রাথমিক তদন্তে পুলিশ উল্লেখ করে, গত ১৯ এপ্রিল দুপুরে নিউমার্কেট এলাকায় ব্যবসায়ী ও ঢাকা কলেজের ছাত্রদের মধ্যে মুখোমুখি সংঘর্ষের মধ্যে পড়ে গুরুতর আহত হয় মোরসালিন। তখন কয়েকজন যুবক তাকে উদ্ধার করে ঢাকা মেডিকেলের আইসিইউতে ভর্তি করে। চিকিৎসাধীন অবস্থায় বৃহস্পতিবার ভোররাতে তার মৃত্যু হয়।
উল্লেখ্য, মোরসালিন ঢাকা নিউমার্কেটের একটি তৈরি পোশাকের দোকানে কাজ করতেন।
মোরসালিনের ভাই নুর মোহাম্মদ বলেন, মোরসালিনের মরদেহ নেওয়া হবে কামরাঙ্গীরচরের বাসায়। সেখানে জানাজা শেষে আজিমপুর কবরস্থানে দাফন করা হবে।