আগামীকাল রবিবারের ভোটেই নির্ধারণ হবে ইউরোপ-পন্থী মধ্যপন্থী প্রেসিডেন্ট ইম্মানুয়েল ম্যাখোঁ নাকি উগ্র-ডান এবং অভিবাসনবিরোধী মেরিন লে পেন আগামী পাঁচ বছরের জন্য ফ্রান্স শাসন করবেন।
কে জিতবে?
মতামত জরিপগুলোতে ম্যাখোঁকেই সম্ভাব্য বিজয়ী হিসেবে পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে। তবে ২০১৭ সালের তুলনায় অনেক কম ব্যবধানে জয় পেতে পারেন তিনি। সে বছর তিনি ৬৬.১% ভোট নিয়ে লে পেনকে পরাজিত করেছিলেন। তবে লে পেনের বিজয়ের সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেওয়া যায় না। যদিও সেই সম্ভাবনা খুব কম।
মাখোঁ এবং লা পেন উভয়েরেই ২০১৭ সালের তুলনায় এ বছর প্রথম রাউন্ডে মোট ভোটের সংখ্যা বৃদ্ধি পেয়েছে। তবে, চলতি মাসের প্রথম দিকে প্রথম রাউন্ডের আগের জরিপগুলোতে দেখা যায়, মার্চে লা পেনের সমর্থন ঊর্ধ্বমুখী ছিল।
গত ১০ এপ্রিল প্রকাশিত আইফপ-ফিডুসিয়ালের জরিপে দেখা গেছে- মাখোঁ দ্বিতীয় রাউন্ডের প্রতিদ্বন্দ্বিতায় লা পেনের বিরুদ্ধে মাত্র ৫১ শতাংশ থেকে ৪৯ শতাংশ ব্যবধানে জয়ী হতে পারেন। প্রথম রাউন্ডের ফলাফল আসার পর কয়েক দিনের মধ্যে মাখোঁর সমর্থন কিছুটা বেড়েছে বলে একই জরিপে উল্লেখ করা হয়েছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা প্রায়ই বলেন, ফরাসিরা প্রথম রাউন্ডে মন থেকে ভোট দেন। আর দ্বিতীয় রাউন্ডে মাথা খাটিয়ে ভোট দেন। যার অর্থ তারা প্রথমে তাদের আদর্শ প্রার্থীকে বেছে নেন, তারপরে দ্বিতীয় রাউন্ডে দু'জনের মধ্যে দেশের জন্য ভালো ব্যক্তিকে বেছে নেন।
২০১৭ সালে ম্যাখোঁ এবং লা পেন প্রথম রাউন্ডে যথাক্রমে ২৪ শতাংশ এবং ২১.৩ শতাংশ ভোট পেয়েছিলেন। অথচ দ্বিতীয় রাউন্ডে ম্যাখোঁ পান ৬৬.১ শতাংশ ভোট এবং লা পেন পান ৩৩.৯ শতাংশ ভোট।
কীসে জয়-পরাজয় নির্ধারণ হবে?
ভোটাররা কাকে সবচেয়ে বেশি অপছন্দ করেন বা ভয় পান? এদের মধ্যে কোনো প্রার্থীরই এককভাবে ক্ষমতায় নিয়ে যাওয়ার মতো পর্যাপ্ত সমর্থক নেই। তাই মূল বিষয় হল ভোটারদের বোঝানো যে অন্য প্রার্থী আরও খারাপ। ম্যাখোঁকে বোঝাতে হবে যে তার প্রতিপক্ষ উগ্র ডানপন্থী। আর ম্যাখোঁর ক্ষমতায় থাকা অবস্থায় যেসব অসন্তোষ সৃষ্টি হয়েছে সেসবকে পুঁজি করে প্রচারণা চালাতে হবে লে পেনকে।
বামপন্থী ভোটারদের সিদ্ধান্ত এই নির্বাচনের ফলাফলের ওপর গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলবে। ম্যাখোঁর স্টাইল এবং নীতি বামপন্থীদের অনেককে বিচলিত করেছে। ফলে তার পক্ষে তাদের মন জয় করা এবং অতি-ডানপন্থীদের ক্ষমতার বাইরে রাখা ২০১৭ সালের তুলনায় অনেক কঠিন হবে।
পুনরায় নির্বাচিত হওয়ার জন্য মাখোঁকে সম্ভবত অতি-বাম প্রার্থী জঁ-লুক মেলেনচনের সমর্থকদের তার দিকে টানতে হবে। ২২ শতাংশ ভোট পেয়ে তৃতীয় স্থানে ছিলেন মেলেনচন। মেলেনচন অবশ্য তার সমর্থকদের বলেছেন, মিসেস লা পেনকে অবশ্যই একটি ভোটও দেওয়া উচিত হবে না। তবে, তিনি স্পষ্টভাবে মাখোঁকে সমর্থন জানাননি।
বেশিরভাগ পরাজিত প্রার্থী তাদের সমর্থকদের মাখোঁকে সমর্থনের আহ্বান জানিয়েছেন। তার কারণ একটাই তারা চান না ডানপন্থী কেউ প্রেসিডেন্ট পদে জয়ী হন। সেদিক থেকে মাখোঁ অবশ্যই সুবিধাজনক অবস্থানে থাকবেন।
অন্যদিকে উস্কানিমূলক বাগাড়ম্বরের জন্য পরিচিত ডানপন্থী প্রার্থী ও প্রাক্তন টিভি ব্যক্তিত্ব এরিক জেমিমোর তার সমর্থকদের লা পেনকে সমর্থন করার আহ্বান জানিয়েছেন।
এরপরে কী হবে?
রবিবারের নির্বাচনে যে জিতবে সে এক তিক্ত এবং বিভেদমূলক প্রচারণার পরে এবং সম্ভবত অল্প সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে জয় পাবে।
ম্যাখোঁ যদি জয়ী হন, তবে তিনি একটি কঠিন দ্বিতীয় ম্যান্ডেটের মুখোমুখি হবেন। তার হাতে খুবই সামান্য সময় থাকবে। অতিরিক্ত কোনো সময় পাবেন না তিনি। সব ধরনের ভোটাররাই পেনশন সহ ব্যবসার অনুকুলে সংস্কার চালিয়ে যাওয়ার পরিকল্পনার জন্য রাস্তায় নামতে পারে।
লে পেন জয়ী হলে ফ্রান্সের দেশীয় ও আন্তর্জাতিক নীতিতে আমূল পরিবর্তন আসবে এবং অবিলম্বে রাস্তায় বিক্ষোভ শুরু হতে পারে।
যেভাবেই হোক, বিজয়ীর প্রথম চ্যালেঞ্জ হবে জুনের সংসদ নির্বাচনে জয়লাভ করা।
ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট নির্বাচন ২ রাউন্ডে হয়ে থাকে। প্রথম রাউন্ডে কোনো প্রার্থী ৫০ শতাংশের বেশি ভোট না পেলে দ্বিতীয় রাউন্ড বা রানঅফে অংশ নিতে হয়। প্রথম রাউন্ডে সবচেয়ে বেশি ভোট পাওয়া ২ প্রার্থী রানঅফে অংশ নিতে পারেন।
এবারের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে গত ১০ এপ্রিল প্রথম রাউন্ডের ভোটে ১২ জন প্রার্থী একে অপরের বিরুদ্ধে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন। তারা সারা দেশের ৫০০ মেয়র অথবা স্থানীয় কাউন্সিলরদের কাছ থেকে অনুমোদন নিয়ে তবেই নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতার যোগ্যতা অর্জন করেন। প্রথম দফায় মাখোঁ এবং লা পেন সবচেয়ে বেশি ভোট পান। তবে, ফ্রান্সের নিয়ম অনুযায়ী যেহেতু কেউই ৫০ শতাংশে বেশি ভোট পাননি তাই আগামীকাল তারা রানঅফ বা দ্বিতীয় রাউন্ডের নির্বাচনে অংশ নেবেন।
ভোটারদের প্রধান চাওয়াগুলো কী?
বিদ্যুতের দামে ব্যাপক বৃদ্ধি এবং ক্রমবর্ধমান মুদ্রাস্ফীতির পর ক্রয় ক্ষমতা ভোটারদের প্রধান উদ্বেগের বিষয়। লে পেন সফলভাবে এই বিষয়ে প্রচারণা চালিয়েছেন।
ইউক্রেনে যুদ্ধের মধ্যে ফ্রান্সের নির্বাচনী প্রচার শুরু হওয়ায় জরিপে ম্যাখোঁ প্রথমদিকে এগিয়ে থাকলেও পরে তার সমর্থন কমে এসেছে।
সমীক্ষাগুলোতে দেখা গেছে যে, ভোটাররা ম্যাখোঁর অর্থনৈতিক নীতিতে অসন্তুষ্ট। কিন্তু বেকারত্ব কয়েক বছরের মধ্যে সর্বনিম্নে অবস্থান করছে। এবং জরিপে অংশগ্রহণকারীরা মনে করছেন যে, তার বিরোধীদের মধ্যে কেউ এর চেয়ে ভাল করতে পারবে না।
ম্যাখোঁ যেভাবে কোভিড-১৯ মহামারীর মোকাবিলা করেছেন তাও একটি ভূমিকা পালন করতে পারে।
আমরা কখন জানতে পারব কে জিতেছে?
২৪ এপ্রিল রবিবার ফ্রান্স সময় সকাল ৮টায় (বাংলাদেশ সময় দুপুর ১২টায়) ভোট গ্রহণ শুরু হয়ে রাত ৮টায় (বাংলাদেশ রাত ১২টায়) শেষ হবে।
ভোট শেষেই ফরাসি টিভিতে সম্ভাব্য বিজয়ীর নাম ঘোষণা করা হবে। সন্ধ্যার মধ্যেই সাধারণত অফিসিয়াল ফলাফল চলে আসে।