তেঁতুলতলা মাঠ: ‘আংকেল-আন্টি মাঠে দেয়াল তোলা ঠেকান’

পুতুল নাটকের প্রদর্শনী, বৃক্ষরোপণ ও সাইনবোর্ড স্থাপনের মধ্য দিয়ে বুধবারও রাজধানীর তেঁতুলতলা মাঠে বিক্ষোভ সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়েছে। এদিন বিকেলে মাঠে ক্রিকেট ও ফুটবল খেলেছে শিশুকিশোরেরা। তারা দাবি জানিয়েছে, মাঠ যেন স্থায়ীভাবে সবার জন্য উন্মুক্ত রাখা হয়।

দুপুর থেকেই তেঁতুলতলা মাঠে জড়ো হতে থাকেন স্থানীয় শিশু-কিশোর থেকে শুরু করে বিভিন্ন শ্রেণিপেশার মানুষ। এদিন সৈয়দা রত্না ও তার ছেলে প্রিয়াংসু, মেয়ে শেঁউতি শাহগুফতাকেও আন্দোলনে অংশ নিতে দেখা যায়। দুপুরে মাঠের সীমানায় বৃক্ষরোপণ করেন রত্না এবং আন্দোলনকারীরা। বিগত দুই দিন আন্দোলনের মাঝেই দেয়াল নির্মাণের কাজ করতে দেখা যায় শ্রমিকদের। মাঠের উত্তর-পূর্ব কোণের একাংশে দেয়ালও তুলে ফেলা হয়েছে। তবে বুধবার দুপুরে শ্রমিকদের কাজ বন্ধ রাখতে দেখা যায়।

সৈয়দা রত্না বলেন, ‘শিশুদের জন্য খেলার মাঠ দরকার। আমাদের আশপাশে আর কোনো খালি জায়গা নাই। এ জন্য মাঠটি শিশুকিশোরদের খেলার জন্য উন্মুক্ত করে দেওয়ার দাবি জানাচ্ছি। আমাদের দুর্ভাগ্য যে শিশুদের জন্য মাঠ দরকার, এটাও আমাদের আন্দোলন করে বলতে হচ্ছে।’

রত্নার মেয়ের শেঁউতি শাহগুফতা বলেন, ‘থানা বা পুলিশের সঙ্গে তো আমাদের কোনো বিরোধ নাই। আমরা কেবল শিশুদের জন্য মাঠ চেয়েছি। এই মাঠটি সবার জন্য উন্মুক্ত করে দেওয়ার দাবি জানিয়েছি।’

এর আগে আন্দোলনকারীদের একটি প্রতিনিধি দল স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে দেখা করেন। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠকের পর বিকেল ৪টায় তেঁতুলতলা মাঠে এসে বাংলাদেশ পরিবেশ আইনবিদ সমিতির (বেলা) নির্বাহী প্রধান ও সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে কথা বলবেন বলে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আমাদের আশ্বাস দিয়েছেন। আমরা স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর মাধ্যমে বৃহস্পতিবার সকালে প্রধানমন্ত্রীর কাছে স্মারকলিপি দেব। পাশাপাশি আগামী ঈদের জামাতও এলাকাবাসী যেন এই মাঠে পড়তে পারেন, তার জন্য স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে অনুরোধ করেছি। একই সঙ্গে মাঠের নির্মাণকাজ বন্ধ রাখার জন্যও অনুরোধ করেছি। তিনি আমাদের আশ্বস্ত করেছেন, পুলিশ কমিশনারের সঙ্গে কথা বলবেন এবং প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে আলোচনা করে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে বলে জানিয়েছেন। আশা করছি, এই মাঠ শিশুদের বরাদ্দ দেওয়া হবে।’

মাঠের শিশুদের দাবি উল্লেখ করে তিনি বলেন, শিশুরা বলছেন, আংকেল-আন্টি মাঠে দেয়াল তোলা ঠেকান। এর উত্তর আমরা কি দেব?

বিকেল ৩টায় তেঁতুলতলা মাঠে ‘দখল মিয়া অ্যান্ড গং’ শিরোনামে পুতুল নাটক প্রদর্শন করেছে জলপুতুল পাপেটস। পরে শতাধিক শিশুদের নিয়ে একটি পাপেট কর্মশালাও পরিচালনা করে।

জলপুতুল পাপেটস এর সাইফুল জার্নাল দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘শিশুরা মোবাইলে আসক্ত হয়ে যাচ্ছে, বাসায় বসে সারাদিন গেম খেলে। শিশুরা মাদকাসক্ত হয়ে যাচ্ছে, এসব কথা আমরা বলি। কিন্তু শিশুদের সঠিক বিকাশের জন্য আমরা কি তাদের শিক্ষা, খেলাধুলায় যুক্ত করার সঠিক পরিকল্পনা করছি? শিশুদের জন্য খেলার মাঠ দরকার, সেটা নিয়েও আমাদের আন্দোলন করতে হচ্ছে। এটা তো শিশুদের মৌলিক চাহিদা। আমরা চাই তেঁতুলতলা মাঠ শিশুকিশোরদের জন্য বরাদ্দ দেওয়া হোক।’

এদিন তেঁতুলতলা মাঠে এসে আন্দোলনের সঙ্গে সংহতি জানান গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের প্রতিষ্ঠাতা জাফরুল্লাহ চৌধুরী। তিনি বলেন, তেঁতুলতলা মাঠ শিশুদের ফুসফুস, বয়স্কদের ফুসফুস। এ ফুসফুস নষ্ট করতে দেওয়া যাবে না। এখানে থানা নির্মাণের অন্যায় অনুমতি দেওয়া হলেও আমরা মেনে নেব না। এখান থেকে ইটপাথর সরাতে হবে। থানা ভবন বানানোর জন্য কোথাও জায়গা না পেলে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী, আপনার বাড়ির একটু জায়গা দিন। তাতে আপনার সুনাম হবে। আর কোথাও জায়গা না পেলে পাশের বহুতল ভবনের চারতলা-পাঁচতলা নিয়ে নেন, সেখানে থানা করেন। দাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত আমরা সম্মিলিতভাবে মাঠকে রক্ষা করব। মাঠের পাশে দেয়াল, ইট-বালু ছুড়ে ফেলার আন্দোলনে আমি আপনাদের সঙ্গে থাকব। এ দেশে আমাদের সাধারণ মানুষ যেটা বলবে সেটাই শুনতে হবে।’

বাংলাদেশ ছাত্র ইউনিয়নও মাঠে ক্রিকেট খেলার কর্মসূচি পালন করে। এতে স্থানীয় শিশু-কিশোরেরা ক্রিকেট ও ফুটবল খেলায় অংশগ্রহণ করে। এ ছাড়া কমিউনিস্ট পার্টি, এলএলআরডি, বাপা, বেলা, আসক, ব্লাস্ট, গ্রিন ভয়েস, আমরা করি, নাগরিক উদ্যোগ, নারীপক্ষ, উদীচী শিল্পী গোষ্ঠী, হিউম্যান রাইটস সোসাইটিসহ বিভিন্ন সংগঠনের পক্ষ থেকে আন্দোলনে সংহতি জানানো হয়। বক্তারা তেঁতুলতলা মাঠকে শিশুকিশোরদের জন্য বরাদ্দ দেওয়ার দাবিতে আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার প্রত্যয় ব্যক্ত করেন।

অধিকারকর্মী খুশি কবির বলেন, ‘স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আমাদের আশ্বাস দিয়েছেন, তিনি প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে কথা বলবেন। কিন্তু আমরা আন্দোলন থামাব না। এই মাঠ শিশুদের বরাদ্দ দিতেই হবে। এই মাঠ সবার জন্য উন্মুক্ত রাখতে হবে।’

সবশেষে সবাই মিলে মাঠে একটি সাইনবোর্ড স্থাপন করে। যেখানে লেখা রয়েছে, ‘আমাদের মাঠে আমরাই খেলব।’