৪০টি রুশ যুদ্ধবিমান ধ্বংসকারী কিয়েভের সেই ‘ভুতের’ মৃত্যু

মেঘের আড়াল থেকে বের হয়ে হামলা চালিয়ে একা হাতে ৪০টি রুশ যুদ্ধবিমান ধ্বংস করেছেন তিনি। তার নাম দেওয়া হয়েছিল কিয়েভের ‘ভুত’। কিয়েভের সেই ‘ভুত’-এর প্রকৃতপক্ষেই মৃত্যু হয়েছে।

গত মাসেই রাশিয়ার সঙ্গে আকাশযুদ্ধে মারা গিয়েছেন ‘ঘোস্ট অব কিয়েভ’। তিনি আছেন কি নেই, যাকে ঘিরে এত জল্পনা অবশেষে সেই ‘ভুত’-এর আসল পরিচয়ও প্রকাশ্যে এসেছে।

‘ঘোস্ট অব কিয়েভ’-এর আসল নাম মেজর স্টেপান তারাবালকা। বেশ কয়েকটি সংবাদমাধ্যমের দাবি, গত ১৩ মার্চ রুশ বাহিনীর উপর হামলা চালানোর সময় শত্রুপক্ষের গোলায় তার মিগ ২৯ বিমান ধ্বংস হয়ে যায়। সেই হামলাতেই নিহত হন কিয়েভের ‘ভুত’।

যুদ্ধের প্রথম দিনেই রুশ বাহিনীর ছয়টি যুদ্ধবিমানকে একাই গুলি করে ধ্বংস করেছিলেন মেজর তারাবালকা। তাকে ইউক্রেন সরকার ‘গার্ডিয়ান অ্যাঞ্জেল’ বলে উল্লেখ করে। কিন্তু সেই সময় তার পরিচয় গোপন রেখেছিলেন ইউক্রেন প্রেসিডেন্ট ভোলোদিমির জেলেনস্কি।

‘ঘোস্ট অব কিয়েভ’ নামেই তার পরিচয় প্রকাশ পায়। এক জন দক্ষ সেনাকে শত্রুপক্ষের নজর থেকে বাঁচিয়ে রাখার জন্য এই ধরনের একটি কাল্পনিক নাম জুড়ে দেওয়া হয়েছিল। একাই রুশ বাহিনীর ঘুম উড়িয়ে দিয়েছিলেন ‘ঘোস্ট অব কিয়েভ’।

ইউক্রেন সরকার ‘ঘোস্ট অব কিয়েভ’ নামে বেশ কয়েকটি ভিডিও প্রকাশ করে। কিন্তু রাশিয়া দাবি করে, সেনাদের মনোবল বাড়াতে ‘ঘোস্ট অব কিয়েভ’ নামে কাল্পনিক চরিত্রের ভিডিও প্রকাশ করছে ইউক্রেন। যদিও সেই দাবি নাকচ করেছে ইউক্রেন।

টুইটারে ইউক্রেন সরকার দাবি করে, ‘২০২২ সালের ফেব্রুয়ারিতে রাশিয়ান হানাদারির প্রথম ৩০ ঘণ্টায় রাশিয়ার ছয়টি যুদ্ধবিমানকে গুলি করে নামিয়েছে ‘ঘোস্ট অব কিয়েভ’। এবং ২৬ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত ১০টি সামরিক বিমানকে ধ্বংস করেছে’।

ওই টুইটার পোস্টে আরও বলা হয়, ‘আকাশপথে যুদ্ধে ওস্তাদ বিমানচালক হতে গেলে কমপক্ষে পাঁচটি যুদ্ধবিমান ধ্বংস করা বা়ঞ্ছনীয়। তবে ‘ঘোস্ট অব কিয়েভ’ তার দ্বিগুণ সংখ্যক বিমানকে গুলি করে মাটিতে নামিয়েছে।

অদম্য সাহসিকতার জন্য ইউক্রেনের সেরা সাহসিকতার পুরস্কার ‘অর্ডার অব দ্য গোল্ডেন স্টার’ সম্মান দেওয়া হয়েছে মেজর তারাবালকাকে। মৃত্যুর পর তাকে এই সম্মান দিয়েছে ইউক্রেন সরকার।

‘দ্য টাইম’-এর প্রতিবেদন বলছে, পশ্চিম ইউক্রেনের ছোট্ট গ্রাম করোলিভকায় অতি সাধারণ পরিবারে জন্ম ‘ঘোস্ট অব কিয়েভ’-এর।

ছোটবেলা থেকেই পাইলট হওয়ার ইচ্ছা ছিল তারাবালকার। গ্রামের উপর দিয়ে মাঝেমধ্যেই যুদ্ধবিমান গর্জন করে উড়ে যেত। সেই বিমানগুলোকে দেখে পাইলট হওয়ার আকাঙ্ক্ষা আরও বেড়ে যায় তারাবালকার।

মেজর তারাবালকার বাবা-মা এখনও জীবিত। তার স্ত্রীর নাম ওলেনিয়া। আট বছরের ছেলে ইয়ারিক। খারকিভ ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটিতে পড়াশোনা করেছেন তারাবালকা।

তারাবালকার মা নাটালিয়া বলেন, ‘বিমান সেনারা যখন মহড়া চালাত, তারাবালকা আকাশের দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে থাকত। প্যারাট্রুপাররা কোথায় নামছেন সেই দিকে বরাবর ছুটে যেত। ছোটবেলা থেকেই আকাশে ওড়ার স্বপ্ন দেখত ছেলে। মেঘের সঙ্গে খেলা করার স্বপ্ন দেখত ও’।

তারাবালকার বাবা ইভন বলেন, ‘কোথায় পাঠানো হচ্ছে তারাবালকাকে সে সম্পর্কে আমরা কেউই জানতাম না। শুধু জানতাম তাকে যুদ্ধে পাঠানো হচ্ছে। কিন্তু সে আর ফিরে আসেনি। এইটুকু তথ্যই আমাদের কাছে আছে’।

নাটালিয়া আরও বলেন, ‘তারাবালকা নিজের চেষ্টাতেই পাইলট হয়েছিল। সে যাতে তার লক্ষ্যে পৌঁছতে পারে আমরা শুধু সেটাই চেয়েছিলাম। আজ তার মৃত্যুর পর সাহসিকতার সেরা সম্মান দেওয়া হচ্ছে। কিন্তু সে এই সম্মান অনেক আগেই পেয়ে গিয়েছে’।