আমাদের কালে সংস্কৃতিকর্মী সৈয়দা রত্না এক সামাজিক আন্দোলনের নায়ক। তার সাহসী কাজ ও চিন্তা বাংলাদেশের প্রতিটি মানুষের জন্য অনুপ্রেরণার। কলাবাগানের তেঁতুলতলা মাঠটি সর্বজন সম্পত্তি। কলাবাগান থানার পুলিশ তাদের ভবন নির্মাণের জন্য সর্বজনের অধিকার এই মাঠটি ‘বেদখলের মাধ্যমে দখল’ নেয়। সর্বজনের এই সাধারণ সম্পত্তি রক্ষায় আগুনের স্ফুলিঙ্গের মতো জ¦লে ওঠেন সৈয়দা রত্না। বিগত দুই বছর ধরে চলছে তার এই লড়াই-সংগ্রাম। কিন্তু ইতিহাসে যার ঠাঁই হবে অধিকার আদায়ের নেতা হিসেবে তাকে হারায় কে? পাঠক, ঘটনা আপনারা সবই জানেন, সবই কাগজে দেখেছেন। দোষ কি রত্না আপার? নাকি তার কিশোর ছেলে প্রিয়াংসুর? প্রতিবাদ করা কি দোষের? মতপ্রকাশের স্বাধীনতা আমাদের সংবিধানের মৌলিক অধিকারের স্বীকৃতি দ্বারা সুরক্ষিত।
কলাবাগানের এই মাঠের সঙ্গে রত্না আপার পরিবারিক বন্ধন দীর্ঘদিনের। মুক্তিযুদ্ধের সময় থেকেই তার পিতা-মাতার বসবাস রাজধানীর কলাবাগনে। তার শৈশব ও কৈশোরের স্মৃতিবিজড়িত তেঁতুলতলা মাঠটি সে-সময়ে অনেকটাই বড় ছিল। ২০১৩ সালে তার স্বামী মারা গেলে জানাজার নামাজও এই মাঠেই অনুষ্ঠিত হয়। তার সন্তানসহ প্রতিবেশীদের ছেলে-মেয়েরাও এই মাঠে খেলাধুলা করে বেড়ে উঠছে। সবমিলিয়ে প্রায় তিন লাখ মানুষের জন্য এই তেঁতুলতলা মাঠটি এই সমাজের ফুসফুসের চেয়ে কম কিছু নয়। কারণ, কলাবাগানের বাসিন্দাদের সাংস্কৃতিক কর্মকান্ডের প্রাণকেন্দ্র এই মাঠটি। আর মাত্র কদিন পর রোজার ঈদের নামাজ এই মাঠেই অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। মাঠটি চলে গেলে এত মানুষের ঈদের নামাজ কোথায় হবে তা নিয়েও অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে। প্রতিবছর আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস, স্বাধীনতা দিবস, বিজয় দিবস, পহেলা বৈশাখের উৎসব এই মাঠেই অনুষ্ঠিত হয়ে আসছে। অসাম্প্রদায়িক চেতনা চর্চার একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র এটি। এছাড়াও, সেখানে সিনিয়র নাগরিকরা সকাল বেলা হাঁটেন ও নির্মল বায়ু সেবন করেন, এলাকার তরুণরা ফুটবল, ক্রিকেট খেলেন। পাড়ার সর্বজন সম্পত্তির অংশ এই মাঠটি শ্রেণি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সব মানুষের মিলনমেলা। এলাকায় দুটি বস্তি থাকলেও তাদের ছেলেময়েরা এখানে অবস্থাপন্ন সচ্ছল পরিবারের সন্তানদের সঙ্গে মিলেমিশে একসঙ্গে সম্প্রীতির বন্ধনে আবদ্ধ। ‘মাননীয় প্রধানমন্ত্রী বারবার বলে আসছেন শিশুদের খেলার মাঠ, উন্মুক্ত স্থান ও জলাশয় যাতে বেদখল না হয়।...পুলিশ বাহিনীর জন্য থানা [ভবন] নিশ্চয়ই দরকার। কিন্তু সেটা খেলার মাঠ দখল করে হতে পারে না।’ (দেশ রূপান্তর, ২৬ এপ্রিল ২০২২, সম্পাদকীয়, পৃ. ৪)। সর্বজন সম্পত্তির দখল মানে সাধারণ মানুষের প্রতিদিনের যাপিত জীবনে স্বাধীনতার সংকোচন। কলাবাগান থানা ভবন নির্মাণে সমাজের প্রতিটি সদস্যের স্বাধীনতা বাড়বে না, বরং কমবে। সমাজের যেসব সদস্যের নিরাপত্তার কথা চিন্তা করে এই থানা ভবন প্রতিষ্ঠার চিন্তা হচ্ছে সেই প্রিন্সিপালের (কলাবাগানের বাসিন্দারা) এই বিষয়ে মত নেই এটি স্পষ্ট। তাহলে কার জন্য বা কার স্বার্থে এই ভবন? সুতরাং এই বৈধতার প্রশ্নটি এড়িয়ে যাওয়ার কোনো সুযোগ নেই। আর তাছাড়া, এটি শুধু কলাবাগান এলাকায়ই নয়, রাজধানী বা এর বাইরে এ-ধরনের সর্বজন সম্পত্তি নানা ধরনের স্বার্থান্বেষী মহল দখলের যে পাঁয়তারা করছে তা রুখতে সৈয়দা রত্নার সাহসী কর্মকা- দ্বীপশিখা হয়ে অনুপ্রেরণা দেবে। পুলিশ কর্তৃক তাকে ও তার ছেলেকে হেনস্তা ও থানায় আটকের খবর পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে নাগরিক অধিকার আদায়ের নেত্রীরা খুশী কবির, সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান ও অন্যরা শক্তভাবে পাশে দাঁড়ানোয় সর্বসাধারণের সম্পদ রক্ষায় সমাজে এক অভূতপূর্ব সাড়া তৈরি হয়। পরে অন্যান্য নাগরিক প্রতিনিধি, উদীচীসহ বিভিন্ন সংগঠন ও বুদ্ধিজীবীরা এই লড়াইয়ে যুক্ত হলে আন্দোলন গতিশীল হয়। এতকিছুর পরও সৈয়দা রত্না বলেছেন: ‘মাঠটি রক্ষা পেলে সব ভুলে যাব।’ (প্রথম আলো, ২৬ এপ্রিল ২০২২, পৃ. ১-৪)
নেতৃত্বে নারী এবং আন্দোলনে অংশগ্রহণকারীরা অধিকাংশই নারী ও শিশু এই বৈশিষ্ট্যমন্ডিত যূথবদ্ধ আন্দোলনটি সমাজে নারীশক্তির জাগরণের নতুন বার্তা দেয়। আমাদের সমাজে নারী-পুরুষের সমতার দাবি এখনো জোরালোভাবে প্রতিষ্ঠিত নয়, এমনকি নারীর জন্য গণপরিবহন, ফুটপাত, বাজার, কর্মক্ষেত্রসহ খুব কম সর্বজন পরিসরই রয়েছে নিরাপদ। প্রতিদিনের কাগজে এর বিপুল প্রমাণ রয়েছে। যেসব পুরুষ নারীর নিরাপত্তাকে হুমকির মুখে ফেলছেন তাদের বিরুদ্ধেও এ আন্দোলন এক হুঁশিয়ারি বার্তা। রবীন্দ্রনাথ তার বিখ্যাত কালান্তর প্রবন্ধ সংকলনে নারী প্রবন্ধে এ বিষয়ে খুব প্রাসঙ্গিক ও গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা করেছেন: ‘নরসমাজে নারীশক্তিকে বলা যেতে পারে আদ্যাশক্তি। এই সেই শক্তি যা জীবলোকে প্রাণকে বহন করে, প্রাণকে পোষণ করে।... প্রাণসাধনার সেই আদিম বেদনা প্রকৃতি দিয়েছেন নারীর রক্তে, নারীর হৃদয়ে।’ রবীন্দ্রনাথের চিন্তা আলোকবর্তিকাস্বরূপ। একদিকে নারী বায়োলজিক্যালি নতুন প্রাণের উদ্বোধন ঘটায় ও তাকে বাঁচিয়ে রাখে, অন্যদিকে সমাজের সামষ্টিক সত্তার সুরক্ষায় যত্নশীলতার পরিচয় আমরা পাই এই ঘটনা থেকে। আমার কাছে মনে হয় সমাজে ন্যায্যতা প্রতিষ্ঠার প্রশ্নে নারীর সংবেদনশীলতা ও যুক্তি প্রয়োগের প্রখরতা পুরুষের তুলনায় বেশি। দার্শনিক ডেভিড হিউমের চিন্তা ও অনুজ্ঞাগুলো আমাদের শেখায় যে, ‘মানব সংবেদনের (সেন্টিমেন্টস) জোরালো ভূমিকাটাকে অগ্রাহ্য না করেও যুক্তির গুরুত্বকে মেনে নেওয়ার’Ñ যদিও প্রচলিত চিন্তায় সংবেদনের ভূমিকাটাকে কোনো গুরুত্বই দেওয়া হয় না। অমর্ত্য সেনের ভাষায় : ‘হিউমের অন্তর্দৃষ্টি আমাদের শেখায়, যারা এই পৃথিবীর অন্যত্র, আমাদের থেকে বহু দূরে বাস করেন, এমনকি যারা এখনো জন্মাননি, ভবিষ্যতে এই পৃথিবীর বাসিন্দা হবেন, তাদের কথা ভাবাও আমাদের দায়িত্ব।’ আমি মনে করি, হিউম যদিও সংবেদনশীলতার ক্ষেত্রে নারীর বিশেষ বৈশিষ্ট্য বা অগ্রসরতার কথা সরাসরি বলেননি, তা সত্ত্বেও, যুক্তি প্রয়োগের সঙ্গে সংবেদনশীলতার চমৎকার সম্পর্কের যে মাত্রা এই আন্দোলনকে বেগবান করেছে তা এই মাঠ রক্ষার অন্দোলনের মধ্য দিয়ে মূর্ত হয়ে উঠল।
অর্থনৈতিক উন্নয়ন ধারণায় আমরা এখন অন্তর্ভুক্তিমূলক দৃষ্টিভঙ্গির কথা প্রায়শই আলোচনা করি। নারীর দৃষ্টিভঙ্গি যে প্রকৃতিগতভাবেই অন্তর্ভুক্তিমূলক রবীন্দ্রনাথ তা সুন্দরভাবে ব্যাখ্যা করেছেন। রবীন্দ্রনাথ নারী প্রবন্ধে বলছেন: ‘জীবনপালনের সমস্ত প্রবৃত্তিজাল প্রবল করে জড়িত করেছেন নারীর দেহমনের তন্তুতে তন্তুতে। এই প্রবৃত্তি স্বভাবতই চিত্তবৃত্তির চেয়ে হৃদয়বৃত্তিতেই স্থান পেয়েছে গভীর ও প্রশস্ত ভাবে। নারীর মধ্যে যা বন্ধনজাল গাঁথছে নিজেকে ও অন্যকে ধরে রাখবার জন্য প্রেমে, স্নেহে, সকরুণ ধৈর্যে। মানবসংসারকে গড়ে তুলবার, বেঁধে রাখবার এই আদিম বাঁধুনি। এই সেই সংসার যা সকল সমাজের সকল সভ্যতার মূলভিত্তি। সংসারের এই গোড়াকার বাঁধন না থাকলে মানুষ ছড়িয়ে পড়ত আকারপ্রকারহীন বাষ্পের মতো; সংহত হয়ে কোথাও মিলনকেন্দ্র স্থাপন করতে পারত না। সমাজবন্ধনের এই প্রথম কাজটি মেয়েদের।’ সমাজের বস্তগত ও ভাবগত ঐক্য রক্ষায় নারীর দৃষ্টিভঙ্গি যে আর্গানিকভাবে অন্তর্ভুক্তিমূলক তা রবীন্দ্রনাথের চিন্তায় স্পষ্টভাবে প্রকাশ পেয়েছে। সৈয়দা রত্নাসহ অন্যান্য নারীনেত্রীদের আন্দোলনের মধ্যে উল্লিখিত বৈশিষ্ট্যগুলো সামাজিক আন্দোলনে নতুন মাত্রা যোগ করেছে। নারীর অন্তর্ভুক্তিমূলক দৃষ্টিভঙ্গি শুধুমাত্র নিজস্ব পরিবার ও ব্যক্তিগত গন্ডির ভেতরই সীমাবদ্ধ নয়। সামাজিক মূল্যবোধ ও সর্বজন সম্পদ রক্ষায় নারীর সত্তার এই বিশেষ দিকটি সমাজকে প্রগতির পথে আরও একটু ভালো করে তোলার পক্ষে জোরালো ভূমিকা রাখছে।
নোবেল পুরষ্কারে সম্মানিত অধ্যাপক অমর্ত্য সেন বাংলাদেশের ঐতিহাসিক অর্জনগুলোতে ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় নারীর অবদানকে জোরালোভাবে উপস্থাপন করার তাগিদ দিয়েছেন। তার ভাষায়: ‘বাংলাদেশের পরিবর্তনের একটি অভিমুখ হলো দেশটি নারী-পুরুষের অসমতা হ্রাসে খুব জোর দিয়েছে এবং এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি কাজ। মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে অর্জিত বাংলাদেশের স্বাধীনতার মূল চেতনার সঙ্গে এই কাজটি নানাভাবে সম্পর্কিত। মুক্তিযুদ্ধের চেতনার সঙ্গে নারীমুক্তির প্রগতিশীল দাবিটি গভীরভাবে যুক্ত যে আকাক্সক্ষার বাস্তবায়নের জন্য দেশের জনগণ একাত্তর সালে অস্ত্রহাতে যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল। এবিষয়টি আরও ভালোভাবে ব্যাখ্যার জন্য এর সঙ্গে সম্পর্কিত নানা ধরনের জটিল বিষয়কে খোলাশা করতে হবে যদি আমরা নারীমুক্তির বিষয়টি মুক্তিযুদ্ধের চেতনার সঙ্গে ঠিক কীভাবে যুক্ত তা পরিপূর্ণভাবে ব্যাখ্যা করতে চাই। আলোচনাটি এগিয়ে নিতে হলে, একটু পেছনে ফিরে তাকাতে হবে। ঐতিহাসিকভাবে বাঙলার সংস্কৃতিতে নারীমুক্তির উপাদন বরাবরই ছিল বিশেষ করে বিশ শতকের প্রথমার্ধে বাঙলা অঞ্চলে আত্মপ্রকাশ লাভ করা বিভিন্নরূপী বিপ্লবী আন্দোলনের উত্থানের অভিজ্ঞতা এ অঞ্চলের মানুষকে লিঙ্গ সমতার দাবি ও অঙ্গীকারের দিকে ঝুঁকতে ও তাকে অন্তর্ভূক্ত করতে সাহায্য করেছে। কিন্তু নারীদের প্রতি সমমর্যাদার দৃষ্টিভঙ্গিটি বাংলাদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধের বৈশিষ্ট্যের মধ্যে এমনভাবেই সম্পৃক্ত ছিল যা মেয়েদের প্রতি পশ্চিম পাকিস্তানীদের দৃষ্টিভঙ্গি থেকে সম্পূর্ণ বিপরীত। পূর্ব বাঙলায় নারীদের প্রতি এই অগ্রসর সাধারণ দৃষ্টিভঙ্গিটির প্রতিফলন ঘটে রাজনৈতিক কর্মকান্ডে যার ফলশ্রুতিতে নারীর ক্ষমতায়নে একটি কার্যকর নীতিকৌশল প্রণয়ন ও তার বাস্তবায়ন সহজতর হয়।’ (সেন. (২০১৩, ২১ নভেম্বর) দ্য ল্যানসেট ম্যাগাজিন অনলাইন সংস্করণ)। পৃথিবীকে বসবাসের যোগ্য করে গড়ে তুলতে নারীর নৈতিক সংবেদনশীলতা শক্তিশালীভাবে ও বিপুলভাবে প্রভাব রাখতে পারে সেকথা আমরা সবাই স্বীকার করব। শুধুমাত্র মাঠ রক্ষার এই ঘটনা নয়, আমাদের বাস্তব জীবনে ঘটে চলা অন্য সকল ঘটনার মধ্যেও এর প্রমাণ রয়েছে, যদি আমরা সংকীর্ণ দৃষ্টিভঙ্গি পরিহার করে একটু ভালোভাবে দেখার চেষ্টা করি। বাংলাদেশের নগরজীবনের হতাশা ও বিচ্ছিন্নতাকে একপাশে সরিয়ে রেখে শহরভিত্তিক সামাজিক আন্দোলনে নারীর নৈতিক ও রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গির চমৎকার অন্তর্ভূক্তিমূলক বৈশিষ্ট্যগুলো গভীর তাৎপর্যময় এক ইশতেহার। আমি মনে করি, বর্তমান সমাজে মূল্যবোধ ও নৈতিকতার ক্রমহ্রাসমান যে প্রবল ধারা দেখতে পাই, সেখানে সৈয়দা রত্নাসহ সব নারীনেত্রী যে আশা জাগানিয়া দৃষ্টান্ত স্থাপন করলেন তা এককথায় সমাজে নারীশক্তির নবতর উদ্বোধন।
লেখক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক। সভাপতি, বাংলার পাঠশালা ফাউন্ডেশন
ronieleo@gmail.com