কুড়িগ্রামের চার শতাধিক চরের একমাত্র বাহন ঘোড়ার গাড়ি!

ওকি গাড়িয়াল ভাই হাঁকাও গাড়ি তুই চিলমারীর বন্দরে। ভাওয়াইয়া শিল্পী আব্বাস উদ্দিনের বিখ্যাত গাওয়া এ গানটি সবার হৃদয়ে সমাদৃত হলেও বাহন হিসাবে সেই গরুর গাড়ি আর তেমন চোখে পড়ে না। কুড়িগ্রামে চিলমারীর বন্দর আছে, আছে চরাঞ্চল কিন্তু নেই সেই গরুর গাড়ি। গরুর গাড়ির স্থান দখল করে নিয়েছে এখন ঘোড়ার গাড়ি।

আদিকালের রাজা বাদশাদের বাহন টমটম ঘোড়ার গাড়ি সভ্যতার ক্রমবিকাশে মানুষের ব্যবহারে এসেছে নানান বিচিত্রতা। একসময় ঘোড়া ছিল বিলাসী বাহন। রাজা বাদশারা ঘোড়ায় চড়ে রাজ্য দেখাশোনা করতেন। কালের বিবর্তনে সেই ঘোড়া এখন সাধারণ মানুষের জীবন জীবিকা নির্বাহের মাধ্যম হয়ে দাঁড়িয়েছে।

এদিকে কুড়িগ্রামের ১৬টি নদ-নদীর অববাহিকায় দ্বীপচরসহ প্রায় সাড়ে চার শতাধিক চরাঞ্চল রয়েছে। এসব চরাঞ্চলে পণ্য আনা-নেয়ার জন্য একমাত্র বাহন হিসাবে ব্যাপক জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে ঘোড়ার গাড়ি। ব্যবসায়ীরা জেলা শহর থেকে সকল প্রকার মালামাল ক্রয় করে ঘোড়ার গাড়ি যোগে নিয়ে যান বিভিন্ন এলাকাসহ প্রত্যন্ত চরাঞ্চলে।

জেলা সদরসহ অন্যান্য উপজেলায় বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা যায়, শত শত ঘোড়ার গাড়ি। কুড়িগ্রাম জেলা শহর থেকে চরাঞ্চলের ব্যবসায়ীরা বিভিন্ন প্রকার মালামাল ক্রয় করে ঘোড়ার গাড়ি যোগে নিয়ে যান জেলার বিভিন্ন চরে। দূরত্ব হিসাবে মণ প্রতি বিভিন্ন মালামালের ভাড়া নেন। বালুপথ পাড়ি দিয়ে পরিবহন করছেন বিভিন্ন প্রকার মালামাল ও কৃষিপণ্য। এ গাড়ি অনায়াসেই বালির ওপর দিয়ে চলাচল করতে পারে। আর হাট-বাজার করাসহ মালামাল আনা-নেওয়ার জন্য এ গাড়িই হয়ে উঠেছে চরবাসীর একমাত্র বাহন।

ঘোড়ার গাড়ি চালকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, তারা সাধারণত মাইক্রোবাসের পুরোনো চাকা দিয়ে ঘোড়ার গাড়ি তৈরি করেন। প্রতিটি গাড়ি তৈরি করতে খরচ পড়ে ১৩-১৪ হাজার টাকা। আর ঘোড়া কিনতে লাগে আরও ২৫-৩০ হাজার টাকা। গাড়ি চালালে সারা দিনে আয় হয় সাত থেকে আটশ টাকা। তা দিয়ে পরিবারের ভরণপোষণসহ ছেলে-মেয়েদের লেখা পড়ার খরচ বহন করে আসছেন তারা। যেখানে অন্য কোনো গাড়ি সাধারণত চলাচল করতে পারে না সেখানেই তারা মালামাল বহন করেন।

তারা আরও জানান, কুড়িগ্রাম জেলায় প্রায় দুই হাজার থেকে দুই হাজার পাঁচশ ঘোড়ার গাড়ি রয়েছে।

ঘোড়ার গাড়ি চালক মজিবর ও আব্দুল বাতেন জানান, আমাদের চরে অন্য কোনো গাড়ি চলে না। আমরা ঘোড়ার গাড়ি যোগে বিভিন্ন মালামাল আনা নেয়া করি। সারা দিনে যা আয় হয় তা দিয়ে সংসারে ব্যয় বহন করে আসছি। গাড়ি চালালে প্রতিদিন আট থেকে নয়শ টাকা আয় করা সম্ভব বলে তারা জানান।

এ বিষয়ে কুড়িগ্রাম সদরের যাত্রাপুর ইউনিয়নের (ইউপি) চেয়ারম্যান মো. আইয়ুব আলী সরকার বলেন, আমার ইউনিয়নের চরাঞ্চলের মালামাল পরিবহনের জন্য অন্যতম বাহন হিসাবে জনপ্রিয় হচ্ছে ঘোড়ার গাড়ি। যার কারণে ঘোড়ার গাড়ি দিন দিন বৃদ্ধি পেয়েছে। শুকনো মৌসুমে তারা ভালোই আয় করছেন। বন্যার সময় তারা বিভিন্ন মালামাল আনা নেয়া করতে পারে না সেই সময় তারা একটু বিপদে পরে যায়।

তিনি আরও বলেন, অনেকে দিনমজুরির কাজ না করে ঘোড়ার গাড়ি চালাচ্ছেন। তারা ব্রহ্মপুত্রের অববাহিকা যাত্রাপুর ঘাট থেকে মালামাল নিয়ে যাত্রাপুর হাটসহ বিভিন্ন স্থানে নিয়ে যান। চরাঞ্চলের জন্য ভালো একটি বাহন ঘোড়ার গাড়ি বলে জানান তিনি।

কুড়িগ্রাম সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোটের আহ্বায়ক ও সাংবাদিক শ্যামল ভৌমিক জানান, ১৬টি নদ-নদী বেষ্টিত কুড়িগ্রাম জেলা। এ জেলায় চর দ্বীপ চরসহ সাড়ে চার শতাধিক চরাঞ্চল রয়েছে। এসব চরে পরিবহন ব্যবস্থা নেই বললেই চলে। এখানে পরিবহন ব্যবস্থা শুধু ঘোড়ার গাড়ি। এ গাড়িতে করেই চরের মানুষ হাট বাজার করাসহ বিভিন্ন মালামাল পরিবহন করছেন। একদিকে যেমন চরের মানুষ ঘোড়ার গাড়ির ওপর নির্ভর হচ্ছে অন্য দিকে এ গাড়ি চালিয়ে অনেকে জীবিকা নির্বাহ করছেন।