ইউক্রেন যুদ্ধ এমন একটি যুদ্ধ, যে যুদ্ধে রাশিয়া কোন অর্থপূর্ণ বিজয় পাবে না, বলছেন বিবিসির প্রতিরক্ষা বিশ্লেষক মাইকেল ক্লার্ক। তার মতে, ২০০৮ সালের পরে বিশ্বজুড়ে পুতিনের বিদেশী সামরিক সাফল্যগুলোর সবগুলোই রাশিয়ার বিমান বাহিনীর পাশাপাশি অভিজাত বাহিনী, ভাড়াটে সেনা এবং স্থানীয় মিলিশিয়া গোষ্ঠীগুলোর ছোট ছোট ইউনিট ব্যবহার করে অর্জিত হয়েছিল।
এর ফলে জর্জিয়া, নাগার্নো-কারাবাখ, সিরিয়া, লিবিয়া, মালি এবং ২০১৪ সালে ইউক্রেনে দুবার হস্তক্ষেপের সময়- প্রথমে ক্রিমিয়া দখল করার সময় এবং পরে লুহানস্ক এবং দোনেৎস্ককে স্ব-ঘোষিত রাশিয়ান প্রদেশ হিসেবে সৃষ্টি করার সময় খুব কম খরচেই সাফল্য পায় রাশিয়া।
প্রতিটি ক্ষেত্রেই রাশিয়া এমন দ্রুত এবং নির্মমভাবে সামনে এগিয়ে যায় যে, পশ্চিমা বিশ্ব তার মোকাবেলা করতে পারেনি, শুধু কিছু নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা ছাড়া। কিন্তু এতে বাস্তবতার একটুও বদল ঘটেনি। পুতিন দ্রুত ‘মাঠে নতুন বাস্তবতা’ তৈরিতে পারদর্শী ছিলেন।
গত ২৪ ফেব্রুয়ারি পুতিন আয়তনে ইউরোপের দ্বিতীয় বৃহত্তম এবং সাড়ে ৪ কোটি মানুষের দেশ ইউক্রেনেও একইভাবে মাত্র ৭২ ঘন্টার মধ্যে সরকারী ক্ষমতা দখল করতে চেয়েছিলেন। এটি একটি আশ্চর্যজনক এবং বেপরোয়া জুয়া ছিল। কিন্তু প্রথম সপ্তাহেই পুতিন সম্পূর্ণরূপে ব্যর্থ হন।
পুতিনের কাছে এখন এই যুদ্ধকে, হয় ইউক্রেনের ভেতরেই আরও বড় করা বা তার সীমানা ছাড়িয়ে, বড় করা ছাড়া আর খুব কম বিকল্পই আছে। ইউক্রেন যুদ্ধের বর্তমান পরিস্থিতির মধ্যেই এই সম্ভাবনা নিহিত আছে। ফলে ইউরোপ তার সাম্প্রতিক ইতিহাসের সবচেয়ে বিপজ্জনক মুহুর্তে পৌঁছে গেছে।
ইউক্রেনের সেনাবাহিনী বা বহির্বিশ্বের প্রতিক্রিয়া দেখানোর আগেই কিয়েভ দখলের ‘প্ল্যান এ’ বাস্তবায়নে ব্যর্থ হয়ে রাশিয়া ‘প্ল্যান বি’-তে চলে যায়। প্ল্যান-বি অনুযায়ী কিয়েভকে ঘিরে ফেলে ধ্বংসযজ্ঞ চালানো এবং চেরনিহিভ, সুমি, খারকিভ, দোনেৎস্ক, মারিওপোল এবং মাইকোলাইভ সহ অন্য ইউক্রেনীয় শহরগুলোতে হামলা চালিয়ে ইউক্রেনের সশস্ত্র প্রতিরোধকে ছিন্নভিন্ন করে দেওয়াই ছিল লক্ষ্য।
কিন্তু রাশিয়ার প্ল্যান বি-ও ব্যর্থ হয়। খেরসনই ইউক্রেনের একমাত্র প্রধান শহর যেটি রাশিয়া দখল করতে পেরেছিল। তবে সেখানেও ইউক্রেনের বাহিনী পাল্টা হামলা চালিয়ে যাচ্ছে। বাস্তবতা হল এত বড় দেশে আধিপত্য বিস্তারের জন্য রাশিয়া যে বাহিনী নিয়ে এসেছে তা খুবই ছোট ছিল। সেই বাহিনী আবার নানা কারণে খুব খারাপভাবে যুদ্ধ করেছে। কিয়েভ থেকে মাইকোলাইভ পর্যন্ত চারটি আলাদা ফ্রন্টের চারপাশে তাদের খুব খারাপভাবে নেতৃত্ব দেওয়া হয়। যার ফলে তারা ছত্রভঙ্গ হয়ে পড়ে। তাদের কোনো সামগ্রিক কমান্ডার ছিল না।
এবং তারা একটি দৃঢ়প্রতিজ্ঞ ও সু-প্রশিক্ষিত ইউক্রেনীয় সেনাবাহিনীর প্রতিরোধের মুখে পড়ে, যারা বীরবিক্রমে তাদের সঙ্গে লড়াই করে এবং তাদের সর্বাধিক দুর্বলতার পয়েন্টগুলোতে আঘাত করে।
হতাশ হয়ে অবশেষে রাশিয়া ‘প্ল্যান সি’-তে চলে যায়। কিয়েভ এবং উত্তরাঞ্চল ছেড়ে দিয়ে পূর্বের ডনবাস অঞ্চলে এবং দক্ষিণ-পশ্চিমে ওডেসা বন্দর পর্যন্ত একটি বড় আক্রমণের জন্য রাশিয়া তার সমস্ত শক্তিকে সেখানে জড়ো করে। বন্দরগুলো দখল করে নিয়ে ইউক্রেনকে কার্যকরভাবে সমুদ্র থেকেও বিচ্ছিন্ন করতে চাইছে রাশিয়া।
রাশিয়ান বাহিনী এখন ইউক্রেনের যৌথ বাহিনী বা জয়েন্ট ফোর্সেস অপারেশন (জেএফও)-কে ঘিরে ফেলার চেষ্টা করছে। ইউক্রেন তার সেনাবাহিনীর প্রায় ৪০% সেনা সদস্যকে ২০১৪ সাল থেকেই রুশপন্থী বিচ্ছিন্নতাবাদী লুহানস্ক এবং দোনেৎস্ক পুনরুদ্ধারে নিয়োগ করে। রাশিয়ার মূল লক্ষ্য হল স্লোভিয়ানস্ক এবং আরেকটু এগিয়ে দক্ষিণে ক্রামাতোরস্ক পর্যন্ত দখল করা। পুরো ডনবাস অঞ্চলের নিয়ন্ত্রণের জন্য এ দুটি গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত পয়েন্ট।
ওদিকে ইতিমধ্যেই ইউক্রেন যুদ্ধ একটি ভিন্ন সামরিক পর্যায়ে প্রবেশ করেছে। এখন আরও উন্মুক্ত ময়দানে, ভাল আবহাওয়ায় যুদ্ধ করতে হচ্ছে। ট্যাঙ্ক, সুশৃঙ্খল পদাতিক বাহিনী এবং সর্বোপরি গোলাবারুদসহ সাঁজোয়া বাহিনী প্রবেশের আগে প্রতিপক্ষের প্রতিরক্ষা লাইনকে ধ্বংস করার জন্য যুদ্ধ ডিজাইন করা হয়েছে।
কিন্তু কাজটা এত সহজ নয়।
ইউক্রেনের যৌথ বাহিনীর পাল্টা প্রতিরোধে রুশ বাহিনীর গতি ধীর হয়ে আছে। রুশ কমান্ডাররা এখন পর্যন্ত যতটুকু পৌঁছানোর আশা করেছিলেন তার থেকে খুব কমই অগ্রগতি অর্জন করতে পেরেছেন। এই ফাঁকে ইউক্রেনীয়রাও পশ্চিমা বিভিন্ন দেশ থেকে ভারী অস্ত্র-শস্ত্র যোগাড় করছে। আমরা আগামী কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই সেখানে দুপক্ষের হাতেই ভারী যুদ্ধ সরঞ্জামের ঝনঝনানি দেখতে পাব।
ডনবাসে যাই ঘটুক না কেন তাতে শুধু পুতিনের একটি ভিন্ন ধরনের পরাজয়ই হবে।
যুদ্ধ যদি শরৎকাল পর্যন্ত দীর্ঘায়িত হয় তাহলে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির শিকার হবেন পুতিন। এমনকি যদি রাশিয়ানরা পুরো ডনবাস এবং সমগ্র দক্ষিণাঞ্চল দখল করতে সফলও হয়, তবুও তাদের সেই অঞ্চলগুলো ধরে রাখতে অনির্দিষ্টকালের জন্য লড়াই করতে হবে। কারণ সেখানকার লাখ লাখ ইউক্রেনীয় বাসিন্দা তাদের চায় না।
যেকোনও উল্লেখযোগ্য রাশিয়ান সামরিক সাফল্য আরও বড় এবং উন্মুক্ত বিদ্রোহ তৈরি করবে। দখল করা প্রতিটি জেলায় রাশিয়ান বাহিনী গণপ্রতিরোধের মুখে পড়বে। তার মানে রাশিয়াকে ইউক্রেনে অনির্দিষ্টকালের জন্য যুদ্ধ চালিয়ে যেতে হবে, হয় জনগণের বিরুদ্ধে বা ইউক্রেনীয় সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে, এবং সম্ভবত একই সঙ্গে উভয়ের বিরুদ্ধে।
অন্যদিকে, পশ্চিমা শক্তিগুলোও কিয়েভকে অস্ত্র ও অর্থ সরবরাহ অব্যাহত রাখবে এবং শীঘ্রই রাশিয়ার ওপর থেকে শক্তিশালী নিষেধাজ্ঞাগুলো প্রত্যাহার করবে না। আর রুশ তেল-গ্যাসের ওপর নির্ভরতা কমাতে পারলে ইউরোপ এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র রাশিয়ার ওপর আরও ভয়ঙ্কর নিষেধাজ্ঞা জারি করবে।
ব্যক্তিগতভাবে ভ্লাদিমির পুতিনের জন্য ফিরে যাওয়ার কোন উপায় নেই এবং তাকে যুদ্ধাপরাধী হিসাবে অভিযুক্ত করা হতে পারে। এখন তার একমাত্র রাজনৈতিক কৌশল হল ইউক্রেনের যুদ্ধকে অন্য কিছুতে পরিণত করা। পশ্চিমের ‘নাৎসি’ এবং ‘সাম্রাজ্যবাদীদের’ বিরুদ্ধে রাশিয়ার বেঁচে থাকার লড়াইয়ের অংশ করে তোলা, যারা রাশিয়ার পতন চায়।
এই কারণেই পুতিন এই বিপজ্জনক ধারণা নিয়ে খেলছেন যে, রাশিয়া বাকি ইউরোপের সঙ্গে তার ‘মহান দেশপ্রেমের যুদ্ধ ২.০’ এর মুখোমুখি হচ্ছে। আমরা সম্ভবত রাশিয়ার বিজয় দিবসে (৯ মে) এই সম্পর্কে আরও অনেক কিছু শুনব। আগামী কাল প্রেসিডেন্ট পুতিন হয়তো তিনি নিজেই যে অন্ধকার এবং দীর্ঘ সুড়ঙ্গের মধ্যে তার দেশকে টেনে নিয়ে গেছেন, তার শেষপ্রান্তে আলো দেখতে পাওয়ার দাবিও করবেন।