গত এপ্রিলে আফগানিস্তানে বিমান হামলা করে পাকিস্তানের সেনাবাহিনী। এতে প্রায় অর্ধশত বেসামরিক আফগান প্রাণ হারান। বলা হচ্ছে, পাকিস্তানে টিটিপির (তেহরিক-ই-তালেবান পাকিস্তান) হামলা জোরদার হওয়ার প্রেক্ষিতে ওই বিমান হামলা চালানো হয়। কীভাবে পাকিস্তানের সঙ্গে আফগানিস্তানের সম্পর্ক উন্নয়নে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে টিটিপি? লিখেছেন তৃষা বড়ুয়া
পাকিস্তানের হামলা
১৬ এপ্রিল। সূর্য ওঠার একটু আগে বিমান হামলায় কেঁপে ওঠে আফগানিস্তানের পূর্বাঞ্চলীয় দুই প্রদেশ খোস্ত ও কুনার। পবিত্র রমজান মাসে পাকিস্তান সেনাবাহিনী প্রতিবেশী দেশটিতে ওই হামলা চালায় বলে সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে বলা হয়। হামলায় পাঁচ শিশু, এক নারীসহ প্রায় অর্ধশত বেসামরিক নাগরিকের মৃত্যু হয়। আফগানিস্তানের তালেবান সরকারের মুখপাত্র জাবিহুল্লাহ মুজাহিদ ওই ঘটনার তীব্র প্রতিবাদ জানিয়ে বলেন, ‘আফগান মাটিতে পাকিস্তানের বিমান হামলার নিন্দা জানাচ্ছে ইসলামিক আমিরাত অব আফগানিস্তান। প্রতিবেশী দেশে বিমান হামলা করে পাকিস্তান নিষ্ঠুরতার পরিচয় দিয়েছে। এই ঘটনা দুই দেশের মধ্যকার বিরোধ বাড়াল। এ ধরনের আরও হামলা ঠেকাতে সম্ভাব্য সব ধরনের ব্যবস্থা আমরা নেব। আফগানিস্তানের সার্বভৌমত্বের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হতে প্রতিবেশী দেশের কাছে আহ্বান জানাচ্ছি। পাকিস্তান সরকারের বোঝা উচিত, যুদ্ধ বাধলে কোনো পক্ষই লাভবান হবে না। বরং পুরো অঞ্চলে অস্থিতিশীলতা ছড়িয়ে পড়বে।’ ঘটনার প্রতিবাদে ওই দিনই খোস্ত প্রদেশে হাজার হাজার আফগান পাকিস্তানবিরোধী স্লোগান দিয়ে বিক্ষোভ করেন। গত বছর তালেবান ক্ষমতা দখলের পর আফগানিস্তান ও পাকিস্তান সীমান্তে সহিংসতা অনেক বেড়ে গেছে। ইসলামাবাদের দাবি, সশস্ত্র সংগঠন তেহরিক-ই-তালেবান পাকিস্তান (টিটিপি) পাকিস্তানে হামলা চালাচ্ছে। সম্প্রতি পাকিস্তান সেনাবাহিনীর পক্ষ থেকে বলা হয়, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে এপ্রিল পর্যন্ত আফগান সীমান্তে ১২৮ সেনা নিহত হয়েছে। পাকিস্তানের নতুন প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ শপথ নেওয়ার পর নিহত সেনাদের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে বলেছিলেন, ‘সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে লড়াই জারি রাখবে ইসলামাবাদ।’
গত বছরের ৩১ আগস্ট যুক্তরাষ্ট্রসহ ন্যাটোভুক্ত অন্যান্য দেশ আফগানিস্তান থেকে তাদের সব সেনা সরিয়ে নেয়। তার আগেই ওই মাসের ১৫ তারিখ তালেবান আফগানিস্তানের ক্ষমতা দখল করে। এর পরপরই পাকিস্তানে আফগানিস্তানের সশস্ত্র সংগঠন টিটিপির হামলা বাড়তে থাকে, যা গত কয়েক বছরে দেখা যায়নি। খোস্ত ও কুনারে পাকিস্তানের বিমান হামলার ঠিক আগের দিন ১৫ এপ্রিল দেশটির খাইবার পাখতুনখাওয়া প্রদেশের উত্তর ওয়াজিরিস্তান জেলায় আফগান সীমান্তের কাছে সেনাবহরে অতর্কিত হামলা চালায় টিটিপি। সে সময় সংগঠনটির যোদ্ধাদের সঙ্গে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর বন্দুকযুদ্ধে সাত সেনা ও চার হামলাকারীর মৃত্যু হয়। সেনাবহরে হামলার আগের দিনও উত্তর ওয়াজিরিস্তানের ইশাম এলাকায় আফগান সীমান্তের কাছে গোলাগুলিতে পাকিস্তানের এক সেনা নিহত হন। ওইসব হামলার জন্য তেহরিক-ই-তালেবান পাকিস্তানকে দায়ী করা হচ্ছে। লক্ষণীয় বিষয়, ১১ এপ্রিল পাকিস্তানের ২৩তম প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেন শাহবাজ শরিফ। তার শপথ নেওয়ার কয়েকদিন পরই হামলার মাত্রা বাড়িয়ে দেয় টিটিপি। প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব নেওয়ার পরপরই যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়নের অঙ্গীকার করেছিলেন শাহবাজ। তার পূর্বসূরি ইমরান খান অবশ্য ইঙ্গ-মার্কিন জোটকে পাশ কাটিয়ে চীন, রাশিয়া ও তালেবানের সঙ্গে সম্পর্ক মজবুত করার দিকেই বেশি জোর দেন। আফগানিস্তান থেকে মার্কিন সেনা প্রত্যাহার ও তালেবান ক্ষমতা দখলের কয়েকদিন পরই ইমরান খান বলেছিলেন, ‘গোলামির শৃঙ্খল ভেঙেছে তালেবান। এজন্য তাদের অভিনন্দন।’ শাহবাজ অবশ্য ইমরানের পররাষ্ট্রনীতি অনুসরণ করবেন না বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
আফগানিস্তানের খোস্ত ও কুনার প্রদেশে বিমান হামলা সরাসরি স্বীকার করেনি পাকিস্তানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। তবে মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে বলা হয়, ‘গত কয়েক মাসে আফগান সীমান্তে আশঙ্কজনক হারে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর ওপর হামলা বেড়ে গেছে। এরই পরিপ্রেক্ষিতে সীমান্ত এলাকায় হামলা বন্ধে তালেবান সরকারকে বেশ কয়েকবার অনুরোধ জানায় ইসলামাবাদ। পরিস্থিতি দেখে মনে হচ্ছে, আফগানিস্তানের মাটি ব্যবহার করে পাকিস্তানে হামলার দায় থেকে যেন মুক্তি পেয়ে গেছে সন্ত্রাসীরা।’ তালেবানের অন্তর্বর্তীকালীন সরকার পাকিস্তানের বিমান হামলার তীব্র নিন্দা জানাবে, এটাই স্বাভাবিক। কারণ যুক্তরাষ্ট্রসহ ন্যাটোভুক্ত দেশগুলোকে দীর্ঘ ২০ বছর পর আফগানিস্তান থেকে তাড়াতে পারার আট মাস পর নিজের বেসামরিক নাগরিকদের ওপর প্রতিবেশী দেশের হামলা বিশ্বকে এই বার্তাই দেয় যে, তালেবান তার নাগরিকদের নিরাপত্তা দিতে ব্যর্থ। আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি পাওয়ার ক্ষেত্রে এই বার্তা নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। পাকিস্তানের বিমান হামলার ঘটনা দেশে ও দেশের বাইরে তালেবান সরকারের জন্য বেশ বিব্রতকর ও অপমানজনক। আফগানিস্তানে সাবেক পাকিস্তানি রাষ্ট্রদূত রুস্তম শাহ মোহমান্দ মনে করেন, সীমান্তে সাম্প্রতিক উত্তেজনার পরিপ্রক্ষিতে তালেবান সরকার পাকিস্তানের ওপর নির্ভরতা কমাতে পারে। যুক্তরাষ্ট্রে সাবেক পাকিস্তানি রাষ্ট্রদূত মালিহা লোধি বলেন, ‘কাবুলের সঙ্গে সহযোগিতাপূর্ণ সম্পর্ক চায় ইসলামাবাদ। তবে বিষয়টি অত সহজ হবে না। তালেবান ক্ষমতায় আসার পর সীমান্তে হামলা বেড়ে যাওয়ায় উদ্বিগ্ন পাকিস্তান। তালেবান সরকার পারস্পরিক সম্পর্ক উন্নয়নের খাতিরে সীমান্তে সংঘর্ষ কমাবে এই আশা ইসলামাবাদ করলেও বাস্তবে এমন উদ্যোগ কাবুলের পক্ষ থেকে দেখা যাচ্ছে না। টিটিপির ঘাঁটি আফগানিস্তানে বহাল তবিয়তে রয়েছে আর সেখান থেকেই হামলা পরিচালনা করা হচ্ছে।’
পাকিস্তানি তালেবান
আফগানিস্তান-পাকিস্তান সীমান্তজুড়ে মূলত কাজ করে সশস্ত্র সংগঠন তেহরিক-ই-তালেবান পাকিস্তান। পাকিস্তানি তালেবান নামেই এরা বেশি পরিচিত। ২০০৭ সালে টিটিপির প্রয়াত নেতা বাইতুল্লাহ মেহসুদ প্রায় ১৩টি গোষ্ঠী নিয়ে সংগঠনটি গড়ে তোলেন। পাকিস্তানের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলীয় খাইবার পাখতুনখাওয়া প্রদেশের ওয়াজিরিস্তান অঞ্চলের শীর্ষস্থানীয় নেতা ছিলেন এই বাইতুল্লাহ মেহসুদ। শুরুতে নিজেদের আফগান তালেবানের সম্প্রসারণ হিসেবে দাবি করে টিটিপি। তালেবানের প্রতিষ্ঠাতা মোল্লা মোহাম্মদ ওমরকে আধ্যাত্মিক নেতা ও তালেবানের সর্বোচ্চ নেতা হিবাতুল্লাহ আখুন্দজাদাকে নিজেদের আমির হিসেবে দেখেন টিটিপির নেতা ও যোদ্ধারা। বেশ কয়েকটি লক্ষ্য নিয়ে কাজ করে টিটিপি বা পাকিস্তানি তালেবান। তার মধ্যে প্রধান পাকিস্তান রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ। টিটিপি চায়, পাকিস্তান রাষ্ট্র ও তার সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড চালিয়ে দেশটির সরকারব্যবস্থা উৎখাত করতে। সশস্ত্র সংগঠন আল-কায়েদার মতাদর্শ অনুসরণের পাশাপাশি তাদের সঙ্গে যোগাযোগ বজায় রাখে টিটিপি। আফগানিস্তানের ক্ষমতাসীন সশস্ত্র সংগঠন তালেবান ও টিটিপির লক্ষ্য শুরুতে একই ছিল। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে পাকিস্তানি তালেবানের লক্ষ্য ও কৌশলে পরিবর্তন আসে। যেমন ২০২০ সালে টিটিপি দাবি করে, পাকিস্তানের বাইরে আঞ্চলিক বা বৈশ্বিক এজেন্ডা তাদের নেই। গত কয়েক বছরে আফগান তালেবানের বিভিন্ন কর্মকাণ্ডের সমালোচনা করতে দেখা যায় পাকিস্তানি তালেবানকে। তা সত্ত্বেও এই দুই তালেবানের সম্পর্কে চিড় ধরেনি।
যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বিশ্লেষকদের ধারণা, মেহসুদের নেতৃত্বাধীন পাকিস্তানি তালেবানে পাঁচ হাজার যোদ্ধা সক্রিয় ছিল। অভিযোগ রয়েছে, পাকিস্তানের সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেনজির ভুট্টোসহ বহু সেনা, বেসামরিক নাগরিক হত্যার পেছনে হাত রয়েছে মেহসুদ ও তার সাথীদের। অবশ্য এসব অভিযোগ অস্বীকার করেন তারা। ২০০৯ সালে দক্ষিণ ওয়াজিরিস্তানের জানগার অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থা সিআইএর ড্রোন হামলায় মারা যান মেহসুদ ও তার স্ত্রী।
পাকিস্তানে টিটিপির ঘাঁটি ও সমর্থনের ভিত্তি ধ্বংস করতে বেশ কয়েকবার অভিযান চালায় দেশটির সেনাবাহিনী। এতে পাকিস্তানি তালেবানের অনেক নেতাকর্মী প্রাণ হারান। অভিযানের সময় সংগঠনটির কয়েকজন নেতা আফগানিস্তানে পালিয়ে যান। দেশটিতে পৌঁছে তাদের কয়েকজন জঙ্গি সংগঠন ইসলামিক স্টেটের (আইএস) আফগান শাখা আইএস-খোরাসানে যোগ দেন। বাকিরা পাকিস্তানি তালেবানেই থেকে যান। যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা দপ্তরের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০১৯ সালে প্রায় তিন থেকে চার হাজার টিটিপির সদস্য আফগানিস্তানে অবস্থান করছিলেন।
গত বছর তালেবানের ক্ষমতা দখলের খবরে অনেক পাকিস্তানি উল্লসিত হন। পশ্চিমা মদদপুষ্ট আফগান সরকারের পতনে তারা আশা করেছিলেন, দুই দেশ তাদের সম্পর্কের তিক্ততা ভুলে ফের মিত্র হয়ে উঠবে। তালেবানের হাতে ক্ষমতা হারানো আফগানিস্তানের সাবেক প্রেসিডেন্ট আশরাফ ঘানি সরকারের আমলে দেশটির সঙ্গে পাকিস্তানের সম্পর্কের টানাপড়েন বেড়ে যায়। ক্ষমতা দখলের এক মাসের কম সময়ের মধ্যে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠনের পর আন্তর্জাতিক স্বীকৃতির পাশাপাশি জরুরি আর্থিক সহায়তার দরকার পড়ে তালেবানের। সে সময় তাদের পাশে এসে দাঁড়ান পাকিস্তানের সদ্যবিদায়ী প্রধানমন্ত্রী ইমরান খান। তালেবানকে স্বীকৃতি দিতে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রতি আহ্বান জানান তিনি। বিশ্ব দেখে, প্রতিবেশী দেশ আফগানিস্তান ও পাকিস্তানের সম্পর্ক ইতিবাচক দিকে যাচ্ছে। তবে বছর না ঘুরতেই আফগানিস্তান-পাকিস্তান সীমান্ত প্রাচীর ইস্যু ও পাকিস্তানি তালেবানের প্রতি আফগান তালেবানের সমর্থন নিয়ে দুই পক্ষের সম্পর্কে ফের উত্তেজনা দেখা দেয়। এই দুই বিষয়ে দেশ দুটি কোনো সমাধানে পৌঁছতে না পারলে পাকিস্তানের জাতীয় নিরাপত্তার পাশাপাশি আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা ব্যাপক হুমকির মুখে পড়বে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
গত বছর সেপ্টেম্বরের শুরুতে তালেবান যখন তার সরকার গঠন নিয়ে সমাধানে পৌঁছতে পারছিল না, সে সময় পাকিস্তানের গোয়েন্দা সংস্থা ইন্টার-সার্ভিসেস ইন্টেলিজেন্সের (আইএসআই) সাবেক প্রধান লেফটেন্যান্ট জেনারেল ফয়েজ হামিদ কাবুল সফর করেন। ইসলামাবাদ চেয়েছিল, পাকিস্তানপন্থি হাক্কানি নেটওয়ার্কের নেতারা যাতে তালেবানের অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের শীর্ষ পদে জায়গা পান ও পাকিস্তানবিরোধী তালেবান নেতা মোল্লা গনি বারাদার যাতে কোনোভাবেই সরকারপ্রধান হতে না পারেন। শেষ পর্যন্ত পাকিস্তানের ইচ্ছা অনুযায়ীই তালেবানের মন্ত্রিসভা সাজানো হয়। এতে তালেবান নেতাদের মধ্যে বিভক্তির সৃষ্টি হয়। গত বছরের ডিসেম্বরে ও চলতি বছরের জানুয়ারিতে আফগান সীমান্তরক্ষী বাহিনী যখন পাকিস্তানি শ্রমিকদের সীমানায় প্রাচীর নির্মাণে বাধা দেয়, তখন তালেবান নেতাদের মধ্যকার বিভক্তি প্রকট হয়ে পড়ে। সে সময় তালেবান সরকারের তথ্যমন্ত্রী ও প্রধান মুখপাত্র জাবিহুল্লাহ মুজাহিদ বলেছিলেন, ‘ডুরান্ড লাইন বিষয়টির এখনো মীমাংসা হয়নি। প্রাচীর দেওয়া হলে সীমান্তরেখার উভয় পাশে বাস করা আফগানিস্তানের বৃহত্তম ও পাকিস্তানের দ্বিতীয় বৃহত্তম জাতিগোষ্ঠী পশতুরা বিপদে পড়বেন।’ অন্যদিকে পাকিস্তানের সেনাবাহিনীর মুখপাত্র মেজর জেনারেল বদর ইফতিখার বলেন, ‘এই প্রাচীর নির্মাণ করতে গিয়ে আমাদের অনেকে শহীদ হয়েছেন। এটি শান্তির প্রাচীর। প্রাচীরের নির্মাণকাজ যথাসময়ে শেষ করা হবে এবং যেখানে নির্মাণ করার কথা, সেখানেই হবে।’
১৮৯৩ সালে ব্রিটিশশাসিত ভারতের পররাষ্ট্র সচিব মর্টিমার ডুরান্ড ও আফগানিস্তানের তৎকালীন শাসক আমির আব্দুল রহমান দুই দেশের সীমানা রেখা ডুরান্ড লাইন নির্ধারণ করেন। ১৯৪৭ সালে দেশভাগের পর আফগানিস্তান কেবল ডুরান্ড লাইনের বিরোধিতাই করেনি, পাকিস্তানের সীমানার ভেতর পশতুদের অন্তর্ভুক্ত করার চেষ্টার বিপক্ষেও দাঁড়ায়। এরই ধারাবাহিকতায় গত দুই দশকে পশ্চিমা সমর্থিত আফগানিস্তানের সাবেক দুই প্রেসিডেন্ট হামিদ কারজাই ও আশরাফ ঘানিও ডুরান্ড লাইনের বিরোধিতা করেছিলেন। এ বিষয়ে তালেবানের অবস্থান কারজাই ও ঘানির পররাষ্ট্রনীতির ভিন্ন নয়। ডুরান্ড লাইনের বিষয়ে সংগঠনটিও পাকিস্তানকে কোনো ছাড় দিতে রাজি নয়।
দুই তালেবানের বন্ধন
পাকিস্তানি তালেবানের সঙ্গে ঐতিহাসিক, জাতিগত ও আদর্শিক সম্পর্ক আফগান তালেবানের। দীর্ঘদিনের এই সম্পর্ক ভাঙতে নারাজ আফগান তালেবান। টিটিপি বা পাকিস্তানি তালেবান আফগান তালেবানদের সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্র দেশগুলোর বিরুদ্ধে লড়াই করে। ১৫ আগস্ট তালেবান ক্ষমতা দখলের পর কারাবন্দি বেশ কয়েকজন শীর্ষস্থানীয় নেতাসহ হাজার হাজার পাকিস্তানি তালেবানকে মুক্ত করে আফগান তালেবান। পাকিস্তান কর্র্তৃপক্ষের বিশ্বাস, টিটিপি আল-কায়েদাসহ অন্যান্য সশস্ত্র গোষ্ঠীর সঙ্গে মিলে এখন পর্যন্ত ৮০ হাজারের বেশি পাকিস্তানিকে হত্যা করেছে। এসব সংগঠনের কর্মকাণ্ডের কারণে দেশটির ১৫ হাজার কোটি ডলারের ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। গত বছর যুক্তরাষ্ট্রসহ ন্যাটোভুক্ত দেশগুলো আফগানিস্তান থেকে একে একে তাদের সেনা প্রত্যাহার করলে টিটিপি পাকিস্তানে হামলা বৃদ্ধি করে। পাকিস্তানে চীনা রাষ্ট্রদূত ও উন্নয়ন প্রকল্পে কর্মরত চীনের কর্মকর্তারাও সংগঠনটির হামলার শিকার হন। গত বছরের ডিসেম্বরে তালেবান সরকারের মধ্যস্থতায় টিটিপি ও পাকিস্তানের সেনাবাহিনী এক ধরনের সমঝোতায় পৌঁছায়। অবশ্য তা বেশিদিন টেকেনি। ওই মাসেই নিরাপত্তা বাহিনী ও বেসামরিক নাগরিকদের ওপর হামলা করে সংগঠনটি। এখন পর্যন্ত তালেবান সরকারের মধ্যস্থতার ফল পায়নি পাকিস্তান। দেশটির বিরোধিতা সত্ত্বেও টিটিপিকে সমর্থন দিয়ে যাচ্ছে আফগান তালেবান। পাকিস্তানে টিটিপির সহিংসতা বাড়লে কাবুল-ইসলামাবাদের সম্পর্ক আরও ক্ষতিগ্রস্ত হবে। সহিংসতা বাড়ার আশঙ্কাই বেশি করছেন বিশেষজ্ঞরা। তালেবান সরকারের ভয়, পাকিস্তান ইস্যুতে বেশি চাপ দেওয়া হলে শত্রু সংগঠন আইএস-খোরাসানের দিকে ঝুঁকতে পারে টিটিপি। তাছাড়া টিটিপি যদি পাকিস্তানের সরকারব্যবস্থা হটিয়ে দেশটিতে শরিয়া আইন অনুযায়ী শাসনব্যবস্থা কায়েমের ধনুকভাঙা পণ থেকে সরে আসে, তাহলে সংগঠনটির নেতাদের মধ্যেই ভাঙন দেখা দেবে, যা আখেরে তালেবানকেই বিপদে ফেলবে।
শত্রুতা অনিবার্য?
সীমান্ত ইস্যুতে আফগানিস্তান ও পাকিস্তানের সমাধানে পৌঁছার ইঙ্গিত এখন পর্যন্ত পাওয়া যায়নি। পরিস্থিতি দেখে মনে হচ্ছে, তালেবান সরকার সীমান্তের এপার ও ওপারে বসবাসরত পশতুদের ঐক্যবদ্ধ রাখার বিষয়েই বেশি আগ্রহী। সীমান্তে হতাহত বাড়লে স্বাভাবিকভাবেই চাপ বাড়বে
পাকিস্তান সরকারের। নিজ দেশে মিত্র রাষ্ট্র চীনের কর্মকর্তাদের নিরাপত্তা দিতে ব্যর্থ হওয়ায় আন্তর্জাতিকভাবে চাপে পড়ে সাবেক প্রধানমন্ত্রী ইমরানের খানের নেতৃত্বধীন সরকার। তাই পাকিস্তানের বর্তমান সরকার চাইছে, চীনের অর্থায়নে পরিচালিত প্রকল্পে টিটিপির সম্ভাব্য হামলা ঠেকাতে। এজন্য তালেবান সরকারের ওপর চাপ দেওয়া স্বভাবতই অব্যাহত রাখবে ইসলামাবাদ। এ ছাড়া নিজের দেশের নাগরিকদের নিরাপত্তার বিষয়ে পাকিস্তান সরকারের ওপর চাপ দেওয়া থেকে সরবে না চীন। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, কাবুলের সঙ্গে সম্পর্ক মজবুত করতে চাইলেও দেশের নাজুক সীমান্ত পরিস্থিতি ও চীনের চাপে একপর্যায়ে কৌশল পরিবর্তন করতে বাধ্য হতে পারে পাকিস্তান সরকার। গত বছর থেকে তালেবান সরকারকে স্বীকৃতি দিতে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে দেশটি যে প্রচারণা চালিয়ে আসছিল, তা হয়তো তারা আর অব্যাহত রাখবে না। এমনকি আফগানিস্তানে তালেবানবিরোধী বিভিন্ন সশস্ত্র সংগঠনকে সমর্থনও দিয়ে বসতে পারে ইসলামাবাদ। আর এমনটি হলে তালেবানের গদিতে থাকা মুশকিল হয়ে পড়বে।