অন্তরের পরিশুদ্ধি

মানুষের অন্তর ভালো-মন্দের পাত্র, কুফুরি ও ইমানের উৎস, অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের সর্দার, অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের নির্দেশনার জন্য দায়ী এবং বিবেকের মূলযন্ত্র। অন্তর সুস্থ থাকলে দেহ-শরীর ঠিক থাকে, অন্তর নষ্ট হয়ে গেলে অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ নষ্ট হয়ে যায়। সাহাবি হজরত নুমান বিন বাশির (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি হজরত রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে বলতে শুনেছি, ‘জেনে রেখো, দেহের মধ্যে একটি মাংসপি- আছে। যখন তা সুস্থ থাকে, তখন গোটা দেহ সুস্থ থাকে। আর যখন তা নষ্ট হয়ে যায়, তখন গোটা শরীর নষ্ট হয়ে যায়। জেনে রেখো, তা হলো অন্তর।’ সহিহ্ বোখারি

অন্তর হচ্ছে মানুষের ইচ্ছা ও সংকল্পের অবস্থানস্থল। তা হুকুম-আহকাম আরোপ ও পরীক্ষার মুখোমুখী হওয়ার মূল কারণ। আমলের গ্রহণযোগ্যতা, হিসাব-নিকাশ এবং সওয়াব বৃদ্ধি ও শাস্তি অবধারিত হওয়া অন্তরের ওপর নির্ভর করে। হজরত ওমর (রা.) থেকে বর্ণিত, হজরত রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘নিশ্চয় আমলের ফলাফল নিয়তের ওপর নির্ভরশীল। প্রত্যেক ব্যক্তির জন্য তাই রয়েছে যা সে নিয়ত করে।’ সহিহ্ বোখারি

হাদিসের ভাষ্যমতে, প্রতিদান বহুগুণ বৃদ্ধির মূল মাধ্যম নিয়ত। মহান আল্লাহ ভালো কাজের নিয়তের জন্য প্রতিদান দেন, কিন্তু খারাপ কাজের নিয়তের জন্য পাকড়াও করেন না। আমল কবুল হওয়া এবং সে বিষয়ে জিজ্ঞাসিত হওয়ার জন্য নিয়ত শর্ত। মহান আল্লাহ বলেন, ‘আর এ বিষয়ে তোমরা কোনো ভুল করলে তোমাদের কোনো পাপ নেই, কিন্তু তোমাদের অন্তরে সংকল্প থাকলে (পাপ হবে)। আর আল্লাহ অধিক ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।’ সুরা আল আহজাব : ৫

অন্তর খুব দ্রুত পরিবর্তনশীল। হজরত মিকদাদ বিন আসওয়াদ (রা.) বলতেন, ‘আমি রাসুলুল্লাহ (সা.) থেকে এমন কিছু শুনেছি, যার পরে কোনো মানুষের শেষ অবস্থা না দেখে তাকে ভালো-মন্দ বলব না। তাকে জিজ্ঞেস করা হলো  আপনি কী শুনেছেন? তিনি বললেন, আমি রাসুল (সা.)-কে বলতে শুনেছি, পাতিলের ভেতরে ফুটন্ত পানি অপেক্ষা বনি আদমের অন্তর অধিক পরিবর্তনশীল।’  মুসনাদে আহমদ

দুনিয়ায় নানা ধরনের ফেতনা, পরীক্ষা ও বিপদাপদের সময় আল্লাহ অন্তরকে পরীক্ষা করেন। সুতরাং যে লোক গোপন নিয়ত যা আল্লাহ ছাড়া অন্য কেউ অবহিত নয়, এর ব্যাপারে আল্লাহর সঙ্গে সত্যবাদী হয়; আল্লাহ তাকে অটল রাখেন এবং ইহকালীন ও পরকালীন জীবনে সৌভাগ্যবান করেন। অন্তর আল্লাহর আঙুলসমূহের দুই আঙুলের মধ্যে অবস্থান করে। তিনি যেভাবে চান সেভাবে পরিবর্তন করেন। শাহর বিন হাওশাব বলেন, আমি উম্মে সালামা (রা.)-কে বললাম, ‘হে উম্মুল মুমিনীন! রাসুল (সা.) যখন আপনার কাছে অবস্থান করতেন তখন অধিকাংশ সময় তিনি কী দোয়া করতেন? তিনি বললেন, তার অধিকাংশ দোয়া ছিল ইয়া মুকাল্লিবাল কুলুব সাব্বিত কালবি আলা দীনিক। অর্থাৎ হে অন্তর পরিবর্তনকারী! আমার অন্তর তুমি তোমার দ্বীনের ওপর সুদৃঢ় রাখো। তিনি বলেন, আমি বললাম, ইয়া রাসুলুল্লাহ! আপনি অধিকাংশ সময় এই দোয়া কেন করেন? তিনি বললেন, হে উম্মে সালামা! এমন কোনো মানুষ নেই যার অন্তর আল্লাহর আঙুলসমূহের দুই আঙুলের মধ্যে নেই। যাকে ইচ্ছে তাকে তিনি দ্বীনের ওপর কায়েম রাখেন, আর যাকে ইচ্ছে বাঁকা করে দেন।’ সুনানে তিরমিজি

এ কারণে অন্তরের তত্ত্বাবধান, পর্যবেক্ষণ, পরিমার্জন ও পরিশুদ্ধকরণ প্রয়োজন। ইসলাম বলে, যে তার গোপন বিষয় সংশোধন করে, আল্লাহ তার প্রকাশ্য বিষয় সংশোধন করে দেবেন। আর যে ব্যক্তি তার অভ্যন্তরীণ বিষয় সংশোধন করে, আল্লাহ তার বাহ্যিক বিষয় সংশোধন করে দেবেন। যেসব বিষয় ও কাজ অন্তরকে মেরে ফেলে, সব ধরনের কল্যাণ থেকে বঞ্চিত রাখে এবং প্রত্যাশিত সব বস্তুকে বাঁধাগ্রস্ত করে, তা হলো অন্তরের কঠোরতা ও উদাসীনতা। এর ফলে অন্তরে মরিচা ধরে, অন্তরকে কল্যাণ ও ইমান থেকে বিরত রাখে। ফলে অন্তর পাপাচার ও অবাধ্যতার দিকে ধাবিত হয়। এ প্রসঙ্গে মহান আল্লাহ বলেন, ‘আর তোমরা জেনে রাখ, তোমাদের মধ্যে আল্লাহর রাসুল রয়েছেন। তিনি যদি অধিকাংশ বিষয়ে তোমাদের কথা মেনে নিতেন, তাহলে তোমরা অবশ্যই কষ্টে পতিত হতে। কিন্তু আল্লাহ তোমাদের কাছে ইমানকে প্রিয় করে দিয়েছেন এবং তা তোমাদের অন্তরে সুশোভিত করেছেন। আর তোমাদের কাছে কুফুরি, পাপাচার ও অবাধ্যতাকে অপছন্দনীয় করে দিয়েছেন। তারাই তো সত্যপথ প্রাপ্ত।’ সুরা আল হুজুরাত : ৭

পবিত্র কোরআন-হাদিসের অসংখ্যা জায়গায় বলা হয়েছে, মানুষের অন্তর রোগাক্রান্ত হয়, মারা যায়, কঠিন ও শক্ত হয়। ফলে তা পাথরের ন্যায় কিংবা তার চেয়েও অধিক শক্ত হয়ে যায়। মানুষের হৃদয় শুষ্ক ও কঠিন হয়ে গেলে তখন তাকে প্রভাবিত করা ও উপদেশ দেওয়ার সব পথ বন্ধ হয়ে যায়। তাই তা চিকিৎসা গ্রহণ করে না, হেদায়েত কবুল করে না, উপদেশ মানে না, সত্যের কাছে নত হয় না। কোরআন মজিদে এ প্রসঙ্গে বলা হয়েছে, ‘তবে কি আপনি লক্ষ্য করেছেন তাকে, যে তার খেয়াল-খুশিকে নিজ ইলাহ (উপাস্য) বানিয়ে নিয়েছে? আর তার কাছে জ্ঞান আসার পর আল্লাহ তাকে বিভ্রান্ত করেছেন এবং তিনি তার কান ও হৃদয়ে মোহর মেরে দিয়েছেন। আর তিনি তার চোখের ওপর স্থাপন করেছেন আবরণ। অতএব আল্লাহর পরে কে তাকে হেদায়েত দেবে? তবুও কি তোমরা উপদেশ গ্রহণ করবে না?’  সুরা আল জাসিয়া : ২৩

মুমিন-মুসলমানের জন্য কর্তব্য হলো, আল্লাহর জিকিরের মাধ্যমে অন্তরসমূহকে জীবিত করা, উদাসীনতা ও কঠোরতা পরিহার করে যাবতীয় হারাম থেকে বেঁচে থাকা। যেহেতু মহান আল্লাহ শরীরের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের মধ্য থেকে অন্তরের মাংসপি-কে চয়ন করে তা ইমানের স্থল এবং ভালো-মন্দের উৎপত্তিস্থল করেছেন; সেহেতু পরিশুদ্ধ অন্তরকে কিয়ামত দিবসে মুক্তির প্রতীক করেছেন। মহান আল্লাহ বলেন, ‘যেদিন ধন-সম্পদ ও সন্তান-সন্ততি কোনো কাজে আসবে না, তবে সেদিন উপকৃত হবে শুধু সে, যে আল্লাহর কাছে আসবে বিশুদ্ধ অন্তঃকরণ নিয়ে।’ সুরা আশ শোয়ারা : ৮৮-৮৯

কোরআনে করিমে আরও ইরশাদ হচ্ছে, ‘আর ইবরাহিম তো তার অনুগামীদের অন্তর্ভুক্ত। যখন তিনি তার রবের কাছে উপস্থিত হয়েছিলেন বিশুদ্ধ হৃদয়ে।’ সুরা আস সাফফাত : ৮৩-৮৪

সত্যিকারের বুদ্ধিমান ওই ব্যক্তি, যে নিজের আত্মাকে নিয়ন্ত্রণ ও আত্মসমালোচনার পাশাপাশি মৃত্যু পরবর্তী জীবনের জন্য আমল করে। আর নির্বোধ ওই ব্যক্তি, যে তার আত্মাকে প্রবৃত্তির অনুসারী বানায় এবং আল্লাহর কাছে নানাবিধ বৃথা আশা পোষণ করে। অতএব, আপনারা হিসাবের (কিয়ামতের) মুখোমুখি হওয়ার আগেই আত্মসমালোচনা করুন। আমল পরিমাপের পূর্বেই নিজেরা তা পরিমাপ করুন। কেননা আজ আত্মসমালোচনা অনেক সহজ আগামীকাল হিসাবের মুখোমুখি হওয়ার চেয়ে। আল্লাহর কাছে মহা-উপস্থাপনের দিনের জন্য প্রস্তুতি গ্রহণ করুন, যেদিন আপনাদের উপস্থাপন করা হবে এবং কোনো বিষয়ই গোপন থাকবে না।

হে অন্তরসমূহের পরিবর্তনকারী! আমাদের অন্তরকে ইবাদতমুখী করে দিন। আমাদের অন্তরকে আমৃত্যু হকের ওপর অটল রাখুন। হেদায়েত দেওয়ার পর অন্তরকে আর বক্র করবেন না এবং আপনার পক্ষ থেকে আমাদের প্রতি অবারিত রহমত দান করুন।

১৩ মে মসজিদে নববিতে প্রদত্ত জুমার খুতবা।

অনুবাদ মুহাম্মদ আতিকুর রহমান