দখল করেছিলেন চার প্রতিষ্ঠান

কে এই পি কে হালদার

আত্মীয়স্বজন ও বিভিন্ন কাগুজে কোম্পানির নামে শেয়ার কিনে চারটি ব্যাংকবহির্ভূত আর্থিক প্রতিষ্ঠান দখল করেন ভারতে গ্রেপ্তার হওয়া প্রশান্ত কুমার হালদার (পি কে হালদার)। পাঁচ বছরেরও কম সময়ে এসব প্রতিষ্ঠান থেকে বেনামে প্রায় ১০ হাজার কোটি টাকা আত্মসাৎ করে দেশ থেকে পালিয়ে যান পি কে হালদার। শুধু আর্থিক প্রতিষ্ঠানের অর্থ আত্মসাৎই করেননি, এসব প্রতিষ্ঠান থেকে ঋণ নিয়েও খেলাপি তিনি।

এনআরবি গ্লোবাল ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালকের (এমডি) পদে থাকাকালে ২০১৪ সালে নানা কৌশলে চারটি আর্থিক প্রতিষ্ঠান দখল করেন পি কে হালদার। এসব প্রতিষ্ঠান দখল করার জন্য নামে-বেনামে অসংখ্য কোম্পানি খুলেছেন, পুঁজিবাজার থেকে বিপুল পরিমাণ শেয়ার কিনেছেন, দখল করা আর্থিক প্রতিষ্ঠান থেকে ঋণের নামে টাকাও সরিয়েছেন। এমনকি দেশের বাইরেও কোম্পানি খোলেন। তার দখল করা সেসব প্রতিষ্ঠানের আর্থিক অবস্থা এখন বিপর্যস্ত। একটি বিলুপ্তির সিদ্ধান্ত নেওয়া হলেও পরবর্তীকালে তা আবার পুনর্গঠনের কাজ চলছে। অন্য তিনটি প্রতিষ্ঠান দীর্ঘদিনেও গ্রাহকদের টাকা ফেরত দিতে পারছে না।

কে এই পি কে হালদার

পি কে হালদারের জন্ম পিরোজপুর জেলার নাজিরপুর উপজেলার দিঘিরজান গ্রামে। বাবা প্রয়াত প্রণনেন্দু হালদার ও মা লীলাবতী হালদার। তার মা ছিলেন সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক। পি কে হালদার ও তার ভাই প্রীতিশ কুমার হালদার দুজনই বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় (বুয়েট) থেকে স্নাতক সম্পন্ন করেন। পরে দুজনই ব্যবসায় প্রশাসনের আইবিএ থেকে এমবিএ করেন। পাশাপাশি চার্টার্ড ফিন্যান্সিয়াল অ্যানালিস্ট (সিএফএ) সম্পন্ন করেন পি কে হালদার। 
 
শিক্ষাজীবন শেষে পি কে হালদার যোগ দেন আর্থিক প্রতিষ্ঠান আইআইডিএফসিতে, ২০০৮ সাল পর্যন্ত প্রতিষ্ঠানটির উপব্যবস্থাপনা (ডিএমডি) পরিচালক ছিলেন। এরপর ২০০৯ সালে তিনি রিলায়েন্স ফাইন্যান্সের এমডি হয়ে যান। আর ২০১৫ সালের জুলাইয়ে যোগ দেন এনআরবি গ্লোবাল ব্যাংকের এমডি পদে।

পি কে হালদার ও তার ভাই প্রীতিশ কুমার হালদার মিলে ২০১৪ সালে কানাডায় পিঅ্যান্ডএল হাল হোল্ডিং ইনক নামে কোম্পানি খোলেনÑযার পরিচালক পি কে হালদার, প্রীতিশ কুমার হালদার ও তার স্ত্রী সুস্মিতা সাহা। কানাডা সরকারের ওয়েবসাইটে দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, কানাডার টরন্টোর ডিনক্রেস্ট সড়কের ১৬ নম্বর বাসাটি তাদের। আর ভারতে হাল ট্রিপ টেকনোলজি নামে কোম্পানি খোলেন ২০১৮ সালে, যার অন্যতম পরিচালক প্রীতিশ কুমার হালদার। কলকাতার মহাজাতি সদনে তাদের কার্যালয়। 

চার আর্থিক প্রতিষ্ঠান দখল

আত্মীয়স্বজন ও বেনামি কোম্পানির মাধ্যমে পুঁজিবাজার থেকে শেয়ার কিনে পি কে হালদার চারটি আর্থিক প্রতিষ্ঠান দখল করেন। প্রতিষ্ঠান চারটি হলো ইন্টারন্যাশনাল লিজিং অ্যান্ড ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিসেস, পিপলস লিজিং অ্যান্ড ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিসেস, এফএএস ফাইন্যান্স অ্যান্ড ইনভেস্টমেন্ট লিমিটেড ও বাংলাদেশ ইন্ডাস্ট্রিয়াল ফাইন্যান্স কোম্পানি (বিআইএফসি)। চারটি প্রতিষ্ঠান দখলে নিলেও কোনো প্রতিষ্ঠানেই পি কে হালদারের নিজের নামে শেয়ার নেই। এসব প্রতিষ্ঠান দখলে ও অর্থ আত্মসাতে তাকে সব ধরনের সমর্থন ও সহায়তা দিয়েছেন বাংলাদেশ ব্যাংকের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের একাধিক কর্মকর্তা।

জানা গেছে, পি কে হালদার সিন্ডিকেট আর্থিক প্রতিষ্ঠানের শেয়ার ক্রয় করে প্রতিষ্ঠানের নিয়ন্ত্রণ হাতে নিতেন। এরপর কৌশলে পুরাতন কর্মচারীদের ছাঁটাই করে তাদের পছন্দের কর্মচারী নিয়োগ দিয়ে নাম সর্বস্ব প্রতিষ্ঠানের নামে ঋণ নিয়ে তা আত্মসাৎ ও বিদেশে পাচার করতেন। পি কে হালদার সিন্ডিকেটের সদস্যরা ৩০টি ভুয়া প্রতিষ্ঠানের নামে কয়েকটি আর্থিক প্রতিষ্ঠান থেকে ১০ হাজার কোটি টাকার বেশি আত্মসাৎ করেছে। তারমধ্যে ইন্টারন্যাশনাল লিজিং থেকে ২ হাজার ৫শ কোটি, ফাস ফাইন্যান্স থেকে ২ হাজার ২শ কোটি, রিলায়েন্স ফাইন্যান্স থেকে ২ হাজার ৫শ কোটি, পিপলস লিজিং থেকে ৩ হাজার কোটি টাকা আত্মসাৎ ও পাচার করেছে। নিউটেক এন্টারপ্রাইজ, নিউট্রিক্যাল লিমিটেড, এসএ এন্টারপ্রাইজ, সুখাদা প্রপার্টিজ লিমিটেড, নেচার এন্টারপ্রাইজ লিমিটেড, উইনটেল ইন্টারন্যাশনাল লিমিটেড, বর্ণ, সন্দ্বীপ কর্পোরেশন, আনান কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেড, এন্ডবি ট্রেডিং, আরবি এন্টারপ্রাইজ, দেয়া শিপিং লিমিটেড, ইমার এন্টারপ্রাইজ, জিএন্ডজি এন্টারপ্রাইজ, হাল ইন্টারন্যাশনাল লিমিটেড, কণিকা এন্টারপ্রাইজ, মেরিনট্রাস্ট লিমিটেড, মুন এন্টারপ্রাইজ, এমটিবি মেরিন লিমিটেড, পিএন্ডএল ইন্টারন্যাশনাল লিমিটেডের চেয়ারম্যান, এমডি, বোর্ড ডিরেক্টর পরিচয় দিয়ে ঋণ নিয়েছেন।

দুদক সূত্র জানায়, আর্থিক প্রতিষ্ঠান থেকে যেসব কাগুজে প্রতিষ্ঠানের নামে ঋণ দেওয়া হয়েছে তার মধ্যে বেশির ভাগই ঋণের ক্ষেত্রে মর্টগেজ ছিল না, থাকলেও তার পরিমাণ খুবই নগণ্য, কিছু ক্ষেত্রে মর্টগেজ নেওয়ার কথা থাকলেও পরে মর্টগেজ নেওয়া হয়নি। অথচ ঋণ হিসাব থেকে সব টাকা সরিয়ে নেওয়া হয়েছে।