গমের আমদানিনির্ভরতা বাড়ছে

ছোট্ট ভূখন্ডের বৃহৎ জনগোষ্ঠীর দেশ বাংলাদেশ। বৃহৎ এই জনগোষ্ঠীর প্রধান খাদ্য ভাত। পরের অবস্থানে গমের তৈরি রুটির চাহিদাও প্রতিনিয়তই বৃদ্ধি পাচ্ছে। শুধু রুটিই না, বেকারির বিভিন্ন ধরনের খাদ্যপণ্য আটা-ময়দা থেকেই তৈরি হয়। কিন্তু ভাতের চাহিদা পূরণে ধানের উৎপাদন যেভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছে, সে তুলনায় গমের উৎপাদন বৃদ্ধি হচ্ছেই না, বরং বলা চলে গমের উৎপাদন দিনে দিনে কমে আসছে। অথচ দেশের নদী অববাহিকায় গড়ে ওঠা সুবিশাল চরাঞ্চলের দোঁআশ মাটিতে এখন গম উৎপাদনের যথেষ্ট সুযোগ ও সম্ভাবনা থাকলেও উপযুক্ত পরিকল্পনার অভাব এবং সরকারিভাবে যথাযথ উদ্যোগ না নেওয়ায় কাক্সিক্ষত পরিমাণ গম উৎপাদন হচ্ছে না। ফলে মানুষের খাদ্যচাহিদা পূরণে প্রতি বছরই বিপুল পরিমাণ গম সরকারি-বেসরকারিভাবে আমদানি করতে হচ্ছে। ফলে বৈদেশিক মুদ্রার অপচয়ও যেমন বাড়ছে, তেমনি চড়া দামেও গম আমদানি করতে হচ্ছে। দেশে প্রতি বছর গমের চাহিদা প্রায় ৭৫-৭৬ লাখ টন। যার মধ্যে ৮৯ শতাংশই প্রতি বছর আমদানি করতে হয়, যা বেসরকারিভাবে আমদানি করে দেশের ছোট-বড় অনেক শিল্প গ্রুপ। গত ২০২০-২১ অর্থবছরে সাড়ে ৫৩ লাখ টন গম আমদানি হয়েছে। এর মধ্যে রাশিয়া থেকে এসেছে ২৬ শতাংশ, ইউক্রেন থেকে এসেছে ১৫ শতাংশ। চলতি বছরেও গত বছরের সমপরিমাণ গম আমদানি করতে হবে। এক দৈনিক পত্রিকায় প্রকাশিত তথ্য মতে, গত ১৩ মার্চ পর্যন্ত দেশে গম আমদানি হয়েছে সাড়ে ৩০ লাখ টন। এই অর্থবছরের বাকি সময়ে আরও ২০-২৫ লাখ টন গম আমদানি করতে হবে।

মূলত আমাদের দেশে রাশিয়া ও ইউক্রেনের গম যেভাবে আমদানি হয়, সেভাবেই বিশ্বের অন্যান্য দেশ ব্রাজিল, কানাডা, ভারত, মালয়েশিয়া, অস্ট্রেলিয়া থেকেও গম আমদানি হয়ে থাকে। তবে এ বছর অনেকটাই সংকট সৃষ্টি করেছে রাশিয়া, ইউক্রেন যুদ্ধ। যুদ্ধের কারণে রাশিয়া ও ইউক্রেন থেকে গম আমদানি না হওয়ায় বিশ্বের অন্যান্য দেশ থেকে বেসরকারি আমদানিকারকরা আমদানি করছেন। আবার রাশিয়া গম রপ্তানিতে সাময়িক নিষেধাজ্ঞা দেওয়ায় গমের আন্তর্জাতিক বাজারদরও অনেকটাই বৃদ্ধি পেয়েছে।

বিশ্বখ্যাত গম উৎপাদন, প্রক্রিয়াকরণ ও বিপণন কারগিল গ্রেইন করপোরেশনের নির্বাহী শাকিল আহমেদ তানভির এ প্রসঙ্গে বলেন, দেশে গমের সংকট সৃষ্টি হবে না সত্য, তবে দাম হয় তো বেড়ে যাবে। দেশে উৎপাদিত ভুট্টা দিয়েই আটা-ময়দার চাহিদার একটা বিশাল অংশ পূরণ করা সম্ভব। দেশে প্রায় ৫৫ লাখ টনেরও বেশি ভুট্টা উৎপাদন হয়ে থাকে। যেগুলো থেকে এখন শুধু পশুখাদ্য তৈরি হচ্ছে। অথচ গম থেকে আটা-ময়দা উৎপাদনকারী একই মেশিনে ভুট্টা থেকেই আটা-ময়দা, তেল, উৎপাদন সম্ভব। দেশে যে হারে গমের চাহিদা বৃদ্ধি পাচ্ছে, আমরা মনে করি, ভুট্টা থেকে আটা-ময়দা, তেল তৈরির উপযুক্ত পরিকল্পনা ও বাস্তব পদক্ষেপ কালক্ষেপণ না করে দ্রুতই গ্রহণ করা উচিত। এজন্য সরকারকে পৃষ্ঠপোষকতা দিয়ে কার্যক্রম শুরু করতে হবে। তা না হলে গম আমদানির পরিমাণ আরও বৃদ্ধি পাবে। এতে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভেও চাপ বাড়বে।

সে কারণে দেশীয়ভাবে গম ও ভুট্টার চাষাবাদ বৃদ্ধি করতে হবে। যদিও বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে সরকার ২০১৭ সালে উচ্চ ফলনশীল গম ও ভুট্টার জাত এবং টেকসই প্রযুক্তি উদ্ভাবনের লক্ষ্য নিয়ে বাংলাদেশ গম ও ভুট্টা গবেষণা ইনস্টিটিউট (বিডব্লিউএমআরআই) প্রতিষ্ঠা করে। প্রতিষ্ঠানটি প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকেই গম, ভুট্টার জার্মপ্লাজম সংগ্রহ, সংরক্ষণ ও উন্নয়ন, সংকরায়ণ ও মূল্যায়নের মাধ্যমে সাধারণ পরিবেশসহ তাপ, লবণাক্ততা, জলাবদ্ধতা ও খরা সহনশীল জাত উদ্ভাবন ও অবমুক্তকরণের কাজ করছে। পাশাপাশি উদ্ভাবিত জাতসমূহের প্রজনন বীজ ও মানসম্পন্ন বীজ উৎপাদন করে সরকারি-বেসরকারি বীজ উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানসহ কৃষকপর্যায়েও বিতরণ করছে। কিন্তু আমরা লক্ষ করছি, যে হারে গমের চাহিদা বাড়ছে সে হারে গমের উৎপাদন বাড়ছে না। আর ভুট্টার উৎপাদন বাড়লেও উপযুক্ত পৃষ্ঠপোষকতার অভাব, ন্যায্যমূল্যের অভাবে দিন দিন কৃষক ভুট্টা চাষ থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়ে অন্য চাষাবাদের দিকে ঝুঁকে পড়ছেন। অথচ ভুট্টা চাষের অমিত সম্ভাবনা থাকার পরও শুধু সরকারের ঔদাসীন্যের কারণে ভুট্টা চাষ থেকে কৃষক পিছিয়ে যাচ্ছেন। দেশে ভুট্টা একটা নতুন ফসল হলেও সাম্প্রতিক সময়ে বেশ জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। শুধু উপযুক্ত মূল্যের অভাবে ভুট্টাচাষিরা মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছেন। আর এটাই স্বাভাবিক। কারণ যে পণ্য চাষ করে কৃষক ভালো দাম পাবেন, সেজন্যই চাষ করবেন। সাবেক অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত নীলফামারীতে অনুষ্ঠিত শাইখ সিরাজের উপস্থাপনায় ‘হৃদয়ে মাটি ও মানুষ’ অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে ছিলেন। সেখানে কৃষকের প্রশ্ন-উত্তর পর্বে ভুট্টাচাষিরা দাবি করেছিলেন, ধান, চাল ও গমের মতো সরকারিভাবে যেন ভুট্টা সংগ্রহ করা হয়। জবাবে সাবেক অর্থমন্ত্রী ভুট্টাচাষিদের আশ্বাস দিয়েছিলেন, ভুট্টাও সরকারিভাবে সংগ্রহ করা হবে। কিন্তু দুর্ভাগ্য, বর্তমান সরকার দ্বিতীয় মেয়াদ শেষ করে তৃতীয় মেয়াদে ক্ষমতাসীন হলেও ভুট্টাচাষিদের সে দাবি আর আলোর মুখ দেখেনি। একটি পুঁজিবাদী রাষ্ট্র কাঠামোয় ক্ষমতাসীনরা বৃহৎ জনগোষ্ঠীর স্বার্থ বিবেচনায় না নিয়ে গুটিকয়েক আমদানিকারকের স্বার্থে অতি নিত্যপণ্যের আমদানিনির্ভরতা বাড়াবে এটাই স্বাভাবিক। পরিণামে চাষির, ভোক্তার স্বার্থ ক্ষুণ্ন হবে। আর হচ্ছেও তাই।

দেশীয়ভাবে মানুষের চাহিদার খাদ্য উৎপাদন করে টেকসই খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সম্ভব। আর দেশীয়ভাবে গম, ভুট্টার চাষাবাদ বৃদ্ধি করা সম্ভব হলে আমদানিনির্ভরতা অনেকাংশেই কমে আসবে। ফলে বৈদেশিক মুদ্রাও সাশ্রয় হবে এবং দেশে মানুষের কর্মসংস্থানেরও সৃষ্টি হবে। তা না হলে পরনির্ভরতা বৃদ্ধি পাবে। যখন আমাদের গমের প্রয়োজন হবে, তখন ভারত রপ্তানির ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করবে। অথচ অমিত সম্ভাবনা থাকার পরও দেশে গম, ভুট্টার চাষাবাদ বৃদ্ধিতে সরকার উল্লেখযোগ্য কোনো উদ্যোগ গ্রহণ করে না। ফলে আমদানির পরিমাণ বৃদ্ধি পায়, রিজার্ভ কমে আসে, দুর্বল হয় টাকা।

লেখক : কৃষি ও প্রকৃতিবিষয়ক লেখক