মুন্নার জন্য আজও হৃদয় কেঁদে ওঠে

আশির দশকে মাঠ মাতানো রাইটব্যাক কৃষ্ণেন্দু রায় পুরোদস্তুর পশ্চিমবঙ্গের মানুষ হলেও বাংলাদেশের সঙ্গে তার হৃদয়ের যোগ। আসলাম, মুন্না, রুমিদের সঙ্গে ইস্ট বেঙ্গলের জার্সিতে খেলেছেন, ভারতের হয়ে সাফল্য পেয়েছেন। কলকাতায় এএফসি কাপ কভার করতে যাওয়া দেশ রূপান্তর-এর সুদীপ্ত আনন্দ’র কাছে স্মৃতিবিজড়িত সেই ইতিহাসের গল্প বললেন ৬৩ বছরের কৃষ্ণেন্দু...

বয়স তো কম হলো না। এখনো এই ফুটবল নিয়েই আছেন?   

কৃষ্ণেন্দু রায় : এ যে ছাড়ার নয়। নতুন একটা ক্লাবের সঙ্গে কাজটা খুব উপভোগ করছি। প্রথম বিভাগের দল ডায়মন্ড হারবার এফসিতে সময় দিচ্ছি। ওরা পেশাদারি ঢংয়ে এগিয়ে যেতে চাইছে। দেখবেন ক্লাবটি এক সময় মোহনবাগান-ইস্ট বেঙ্গলকে টেক্কা দেবে।

ঐতিহ্যবাহী ক্লাব দুটির কথা নিজেই তো টেনে আনলেন। দুটি ক্লাবের অবস্থান দুই মেরুতে। অথচ আপনি দিব্যি দুটি ক্লাবে খেলেছেন বহু বছর...

কৃষ্ণেন্দু : গল্পের শুরুতেই বাংলাদেশ যোগ আছে। আমি কিন্তু বড় ক্লাবগুলোতে খেলার আগে ভারতের প্রতিনিধিত্ব করি। ১৯৭৮ সালে এশিয়ান ইয়ুথ চ্যাম্পিয়নশিপে খেলতে বাংলাদেশে যাই। সে আসরে আমার পারফরম্যান্স দেখে দলের ম্যানেজার জার্নেইল সিং ভারতে ফিরে মোহনবাগানকে আমার কথা বলে। সেখান থেকে প্রস্তাব পেলেও সে বছর অবশ্য আমি ছোট ক্লাব এরিয়ান্সে সই করেছিলাম। তবে এরপর বহু বছর খেলেছি মোহনবাগান ও ইস্ট বেঙ্গলে।

সিনিয়র ভারত দলে খেলেছেন কতদিন?

কৃষ্ণেন্দু : ১৯৮১ সাল থেকে টানা ন’বছর ভারতের প্রতিনিধিত্ব করি। ভারতের হয়ে আমার প্রাপ্তিও অনেক। তবে সবচেয়ে বড় প্রাপ্তিটা অভিষেক ম্যাচে। মারদেকা কাপের গ্রুপপর্বে ইন্দোনেশিয়ার বিপক্ষে খেলার সুযোগ পেয়ে জয়সূচক গোল করেছিলাম। সেই জয়ে সেমিফাইনালে যায় দল। তবে সেখানে ব্রাজিলের সাও পাওলোর কাছে হেরে যাই। ভারতের জার্সিতে ১৯৮৫ সালে ঢাকায় সাফ গেমস ফুটবলের সোনা জিতেছিলাম বাংলাদেশকে টাইব্রেকারে হারিয়ে।

সেই হারে তো গোটা বাংলাদেশ শোকস্তব্ধ হয়ে পড়েছিল...

কৃষ্ণেন্দু : খুব স্বাভাবিক। আমি নিজেও টের পাচ্ছিলাম না দর্শকদের উত্তেজনাটা। ফাইনালে সে সময় বাংলাদেশ দুর্ধর্ষ প্রতিপক্ষ। সমানে-সমান লড়াইয়ের পর ম্যাচ গড়ায় টাইব্রেকারে। উত্তেজনায় দর্শকদের অনেকে তো পারে মাঠে ঢুকে পড়ে। তারা যেন কোনো অবস্থাতেই আমাদের শট নিতে দেবে না। কী ক্রেজ! কী উন্মাদনা! ভারতের হয়ে প্রথম শটটা আমাকে নিতে হয় এবং গোল করি। এরপর আমরা ম্যাচটা জিতে যাই।

আপনি তো বাংলাদেশের কোনো ক্লাবের হয়ে খেলেননি। তাহলে কীভাবে বাংলাদেশের এত অবদান আপনার জীবনে?

কৃষ্ণেন্দু : বাংলাদেশের কোনো ক্লাবে খেলার প্রস্তাব পাইনি ঠিক। তবে ১৯৭৮ সালের পর কম করে হলেও ভারতীয় অথবা ক্লাব দলের হয়ে বাংলাদেশে খেলতে গিয়েছি ছ’বার। ১৯৮৫তে সাফ গেমস সোনা জিতেছি। যতবার খেলেছি, অনেক আদর-যতœ করেছে সবাই। কিছু খেলোয়াড়দের সঙ্গে তো আমার আত্মিক সম্পর্ক। বিশেষ করে মোনেম মুন্নার কথা মনে হলে আজও হৃদয় কেঁদে ওঠে।

মুন্নার সঙ্গে তো ইস্ট বেঙ্গলেও খেলেছেন?

কৃষ্ণেন্দু : আপনি যদি প্রশ্ন করেন, আমাদের সময়ে বাংলাদেশের সেরা খেলোয়াড় কে? আমি নির্দ্বিধায় মুন্নার নাম বলব। ও ছিল একজন সব্যসাচী খেলোয়াড়। ওর ডিফেন্স অ্যাবিলিটি নিয়ে কোনো প্রশ্ন নেই। তবে অবাক হয়েছি ওর বল ডিস্ট্রিবিউশন, প্রয়োজনে আক্রমণে উঠে পড়া, মাঝমাঠে চলে এসে আবার নেমে গিয়ে ঘর সামলানো দেখে। ও আমার চোখে কমপ্লিট একজন ফুটবলার। আর মাঠের বাইরের মুন্নার কথা আর কী বলব? ইস্ট বেঙ্গলে যতদিন খেলেছি, খুব ভালো সম্পর্ক ছিল। শুধু আমার সঙ্গে নয়, ও সবার সঙ্গে হাসিমুখে কথা বলত। মুন্না এভাবে দুম করে মরে গিয়ে শুধু বাংলাদেশ নয়, দক্ষিণ এশিয়ার ফুটবলের বড় ক্ষতি করে দিয়েছে। যেমনটা করেছে আমার একটু জুনিয়র কৃষাণু দে।

কৃষাণু বাংলাদেশেও অনেক সুনাম কুড়িয়েছেন...

কৃষ্ণেন্দু : পাবেই তো। আমার একটু জুনিয়র ছিল। তবে একসঙ্গে বহু ম্যাচ খেলেছি। সে তো গ্রেট। ওর সম্পর্কে বলতে গেলে বলব, একসঙ্গে যখন মাঠে খেলতাম, তখন ওর পায়ে বল পড়লে মনে হতো আমি নিজে খেলোয়াড় নই। ওর পায়ের কারুকাজের দর্শক বনে যেতে মন চাইত। লহমায় ভুলে যেতাম আমিও খেলোয়াড়। ওর মতো গ্রেটের মৃত্যু ভারতবর্ষের ফুটবলে বড় শূন্যতা সৃষ্টি করেছে।

মুন্না ছাড়াও অনেকেই খেলেছেন ভারতে এসে...

কৃষ্ণেন্দু : মুন্না আসলে পশ্চিমবঙ্গের মানুষের মন জয় করেছিল খেলা ও ব্যবহার দিয়ে। তাই বলে আসলাম, রুমিকে ভুলব কী করে? আমাদের সময়ে আসলাম ছিল সেরা স্ট্রাইকার। টিপিক্যাল গোল গেটার। কী মনে হতো জানেন, আসলাম আছে, কোনো না কোনো সময় তো একটা গোল হবেই। স্কিল হয়তো সেভাবে ছিল না। তবে গোলমুখে সে দুর্ধর্ষ। বাংলাদেশ, আবাহনী ছাড়াও ইস্ট বেঙ্গলের হয়েও অনেক গোল করেছে। আর রুমি ছিল স্কিলফুল। তবে আমার মনে হয়েছে ও একটু সেকি ছিল। এছাড়া বলব কায়সারের (হামিদ) কথা। ওরা সবাই কলকাতার মানুষের মনের ভেতর ঢুকে গিয়েছিল।

এখন তো সেভাবে কাউকে ভারত মাতাতে আসতে দেখা যায় না বাংলাদেশ থেকে...

কৃষ্ণেন্দু : আসলে জেনারেশন গ্যাপ। আশির দশকে বাংলাদেশ ছিল দুর্ধর্ষ ফুটবল দল। কী সব ফুটবলার আসলাম, মুন্না, রুমি... সাঙ্গাতিক ভয়ংকর একটা ব্যাচ ছিল। এর আগে না খেললেও দেখেছি সালাউদ্দিন ভাই, এনায়েত ভাইদের খেলা। এরপর হয়তো একটা গ্যাপ তৈরি হয়েছে। এমনটা ভারতের ফুটবলেও বিরাজমান।

বাংলাদেশের সঙ্গে তুলনা করলে তো ভারত অনেক এগিয়ে গেছে...

কৃষ্ণেন্দু : ভারতের অবস্থাও যে খুব ভালো তা কিন্তু নয়। সম্প্রতি সন্তোষ ট্রফি জয়ী বাংলা দলের আনকোরা ফুটবলারদের সঙ্গে ভারত খেলে ড্র করেছে। বেঙ্গল দলের বিপক্ষে জাতীয় দলের পার্থক্যটা তো বোঝাতে হবে মাঠে। সেটাই যদি বোঝাতে না পারে তাহলে কীসের ভারত নিয়ে আমি গর্ব করব? এই যে দেখুন, ছেত্রী (সুনীল) এখনো খেলে যাচ্ছে। তার মানে কী? ওর মানের একটা বিকল্প আমরা এখনো খুঁজে পাচ্ছি না। গ্রাসরুটে প্রচুর কাজ না করলে এই গ্যাপটা থেকেই যাবে।

এক্ষেত্রে আইএসএল নিশ্চয় একটা ইতিবাচক ভূমিকা রাখছে?

কৃষ্ণেন্দু : কিছু কিছু ক্ষেত্রে অবশ্যই আইএসএলের ভারতের ফুটবলে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। ইতিবাচক দিক হচ্ছে, আমরা অনেক খেলোয়াড়কে জানতে পারছি। আইএসএলের ফলে ভারত দলটাও নতুন নতুন খেলোয়াড় পাচ্ছে। আইএসএল হওয়াতে পেশাদারিত্বের সর্বোচ্চ ধাপে প্রায় পৌঁছে যেতে পারছে দেশের ফুটবল। প্রতিটি ক্লাবের ইয়ুথ দল রাখা বাধ্যতামূলক। ফলে সাপ্লাইলাইন তৈরি হচ্ছে। আর নেতিবাচক দিক, দলগুলোতে যে বিদেশিরা আসছে তারা আপ টু দ্য মার্ক নয়। খুব নামিদামি খেলোয়াড় আসছে না, যাদের খেলা দেখে স্থানীয়রা কিছু শিখবে।

এখানে মোহনবাগান-ইস্ট বেঙ্গলের মতো একটা সময় বাংলাদেশের ফুটবলে আবাহনী-মোহামেডান দ্বৈরথ নিয়ে একটা বাড়তি উত্তেজনা ছিল...

কৃষ্ণেন্দু : আমি খুব ভালোই জানি এ সম্পর্কে। নিজেও তো ওদের বিপক্ষে খেলেছি। এখানে মনে হয় দুটি ব্যাপার আছে। জেনারেশন গ্যাপের ব্যাপারটা তো আগেই বলেছি। কোয়ালিটি ফুটবলারের সংকট। এছাড়া আর্থিক একটা ব্যাপারও আছে। এত টাকা এখন খেলোয়াড়রা চাইছে, ফলে ঢাকা মোহামেডান হয়তো সেভাবে কুলিয়ে উঠতে পারছে না।

বাংলাদেশের প্রসঙ্গে ফিরি। বসুন্ধরা কিংসের খেলা তো দেখলেন। তাদের নিয়ে কী বলবেন?

কৃষ্ণেন্দু : এটা খুব ইতিবাচক যে, বসুন্ধরার মতো করপোরেট হাউজ চেষ্টা করছে ভালো দল গড়ার। তবে বড় বাজেটের দল গড়লেই সাফল্য আসবে, তা নয়। এর জন্য ভাগ্যের সহায়তা ও একটা ঐতিহ্য লাগে। আশা করছি তারা ধীরে ধীরে সে পর্যায়ে যেতে পারবে। শেষটায় বাংলাদেশের মানুষের জন্য অনেক শুভাশিস। আমরা যারা ফুটবল খেলেছি, ওটা আমাদের আরেকটা ঘর। ও দেশের মানুষের ভালোবাসা সারা জীবন মনে থাকবে।