দক্ষিণ আফ্রিকায় ৫৩ ও ৮০’র পর মিরপুরে ২৪/৫ ও ২৩/৪। ব্যাটিং ব্যর্থতার জের টানলে চট করে গত দুই সিরিজের এই ধসগুলোই সামনে আসে। তবে এই অবস্থাটা টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের পর থেকেই চলছে। গত নভেম্বরের সংক্ষিপ্ত ফরম্যাটের বিশ্বকাপের পর পাকিস্তান সিরিজ থেকে অন্তত একটি ইনিংস হলেও এমন ব্যাটিং ধসের ক্ষত লেগে আছে বাংলাদেশের ব্যাটিং লাইনে। পাকিস্তানের বিপক্ষে চট্টগ্রামের ব্যাটিং উইকেটেও প্রথম টেস্টে ৪৩ রানে ৫ উইকেট হারানো ও ১৫৭ রানে অলআউট। মিরপুরে দ্বিতীয় টেস্টে ৪৬/৫ থেকে ৮৭ রানে অলআউট। স্মরণীয় নিউজিল্যান্ড সিরিজেও আছে। ক্রাইস্টচার্চে দ্বিতীয় টেস্টে ২৭ রানে ৫টি উইকেট হারানোর ধাক্কা সামলাতে না পেরে ১২৬-এ গুটিয়ে যায় দল। অথচ টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের আগে শ্রীলঙ্কা ও উইন্ডিজের সঙ্গে এমন ব্যাটিং ধস দেখা যায়নি। গত চার সিরিজে বাংলাদেশ ব্যাটারদের টানা এই ব্যর্থতা পুরনো দিনের কথাই যেন মনে করিয়ে দিচ্ছে। এই সমস্যা মনস্তাত্ত্বিকের চেয়েও বড় অভ্যস্ততায় এমনটাই মনে করেন সাবেক ক্রিকেটার রাজিন সালেহ। ঘরোয়া ক্রিকেটের লম্বা ফরম্যাটে কঠিন পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার অভ্যাস না হলে আন্তর্জাতিকে উন্নতি কঠিনই হবে ব্যাটারদের কাছে, মনে করেন ২৪ টেস্ট খেলা এই ব্যাটার।
বাংলাদেশে ভিন্ন কন্ডিশনের উইকেট নেই যে এমন না, চট্টগ্রাম সবসময়ই ব্যাটিং সহায়ক। সিলেটের উইকেট স্পিন, রাজশাহী-বগুড়ায় পেস ধরে। বরিশালের উইকেটকেও স্পোর্টিং বানানো যায়। কিন্তু করোনাভাইরাসের প্রকোপের পর থেকে ২০১৯-এর পর সব ভেন্যুতে খেলা আয়োজন সম্ভব হয়নি। সবশেষ ২০১৯ জাতীয় লিগে ঠিক হোম অ্যান্ড অ্যাওয়ে না হলেও সব ভেন্যু ব্যবহার করে খেলা হয়েছিল। বিভিন্ন উইকেটে খেলার ফলে নানা ভাবে ম্যাচ পরিকল্পনা করা ও সেই মতো লড়াই করার পথও তৈরি করেছিল দলগুলো। তাতে ব্যাটসম্যানরাও একেক কন্ডিশনে একেকরকম লড়াইয়ের জন্য মানসিকভাবে প্রস্তুত হতেন। কিন্তু গত তিন বছরে সেই সুযোগটা আসেনি। প্রথম শ্রেণিতে ১৪৮ ম্যাচে ৮৪৮১ রান করা রাজিন বললেন টেস্টের মানসিকতা উন্নত করার জন্য হোম-অ্যাওয়ে খেলা ছাড়া উপায় নেই, ‘ক্রিকেটটা হচ্ছে সম্পূর্ণ মানসিকতার ওপর। এখানে যত বেশি শক্ত থাকবেন তত জলদি সফল হবেন। টেস্টের মানসিকতা তখনই আসে যখন আপনি কঠিন উইকেটে ব্যাট করে একটা টেস্ট জিতবেন বা সেভ করবেন।’ ব্যাখ্যা দিয়ে রাজিন বলেন, ‘মনে করেন আজ সারা দিন আছে ম্যাচ জেতার জন্য, যদি না হয় ম্যাচটা ড্র করতে হবে। আমরা শেষবার দু-তিনটা ম্যাচ হেরেছি সিলেটে। ঢাকার সঙ্গেই সম্ভবত একটা ম্যাচে আমাদের ১০ উইকেট হাতে আছে, পুরো দিনে ১০০ রান লাগে, ওই ম্যাচও সার্ভাইভ করতে পারিনি। স্পিন উইকেট ছিল তা ধরতে পারিনি যে কীভাবে এমন পিচে স্পিন সামলে টিকে থাকতে হয়। এই মানসিকতা একমাত্র অভ্যাসের ওপরই আসবে। ঘরোয়া ক্রিকেটে এভাবে যখন বারবার ম্যাচ বাঁচানো বা জেতার অভ্যাস তৈরি হবে তখন আপনি আন্তর্জাতিকে গিয়ে সফল হবেন।’
ঘরোয়া ক্রিকেটে বিভিন্ন উইকেটে খেলার জন্য হোম-অ্যাওয়ে ভিত্তিতে খেলা রাখার গুরুত্ব অনুভব করছেন সাবেক এই ব্যাটার। এতে প্রতিপক্ষ দল জানবে না স্বাগতিকরা কেমন উইকেট বানাচ্ছে। তখন অপরিচিত কন্ডিশনে খেলে ভালো করার চ্যালেঞ্জ নেবে। সেই চ্যালেঞ্জ জিতলে আন্তর্জাতিকে এগিয়ে যাওয়া সহজ হবে বলে জানান রাজিন, ‘এনসিএল বা জাতীয় লিগ আমরা যখন খেলছিলাম তখন হোম-অ্যাওয়ে খেলা ছিল। সব মিলিয়ে ১০টি করে ম্যাচ খেলতাম। ভারতে দেখবেন প্রথম শ্রেণির ক্রিকেট হয় দুই-আড়াই মাস ধরে। আমাদের প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটগুলো যদি এমন বড় সময় ধরে হয় তাহলে আমাদের টেস্ট ক্রিকেটটা আগাবে।’
পাশাপাশি প্রথম শ্রেণির মৌসুমে ক্রিকেটারদের বিশ্রাম না নেওয়ার অনুরোধও করেন রাজিন। তার মতে অভ্যাস না থাকলে হুট করে আন্তর্জাতিকে সফল হওয়া যায় না। গত কয়েক সিরিজ ধরে টপ অর্ডার ব্যাটারদের পেস বোলিংয়ের বিপক্ষে যে নাস্তানাবুদ অবস্থা এরজন্য অনভ্যস্ততাকেই দায়ী করলেন এই সাবেক ক্রিকেটার, ‘ক্রিকেটাররা অনেকেই আছে যারা এক দুটো ম্যাচ খেলে ছুটি চায়। এটা বন্ধ করতে হবে। মিরপুরে পেস বোলারদের খেলতে কষ্ট হচ্ছে, কারণ আমরা তো খেলছি না। রাজশাহীতে পেস উইকেট হয়, ওদের হোমে গিয়ে আমাদের খেলতে হবে। সার্ভাইভ করতে হবে। এভাবে না হলে গ্যাপটা থেকেই যাবে।’ পাশাপাশি যে উইকেটই সামনে আসুক সেখানেই খেলার আহ্বান জানান, ‘আরেকটা বিষয় হলো, সিলেটে গতবার যখন খেলা হলো তখন অনেক ক্রিকেটার উইকেট ভালো না এমন বলেছিল। কিন্তু এই উইকেটে আমি কীভাবে খেলব, কীভাবে এমন উইকেটে টিকে রান করব এই জিনিসটা তো শিখতে হবে। আমাদের উইকেটে যদি আমরাই খেলে অভ্যস্ততা না আনি তাহলে বিদেশি দলের সঙ্গে অবশ্যই বিফল হব।’
বাংলাদেশ বিফল হয়েছে। মিরপুরে শেষ কবে এই টেস্টের মতো স্পোর্টিং উইকেট হয়েছে তা গবেষণার বিষয়। এই উইকেটে টিকে থাকলে রান পাচ্ছে ব্যাটাররা। আবার দ্রুত রান তুলতে গিয়ে পেসার-স্পিনারদের উইকেট নেওয়ার সুযোগ বাড়ছে। তবুও দিন শেষে ব্যর্থতার খাতায় বাংলাদেশের নাম। ঘরের মাঠের চেনা উইকেটেও যখন সাফল্য এলো না তখন উইন্ডিজের কঠিন কন্ডিশনে কী অপেক্ষা করছে? ক্রিকেটাররা তো ছুটিতে। ৫ জুন উইন্ডিজের উদ্দেশ্যে দেশ ছাড়বে দল। সেখানে প্রস্তুতি ম্যাচও আছে। মাঝের কিছুদিনে ১৫ জুনের টেস্টের জন্য প্রস্তুত হওয়া যাবে!