ভেজাল প্যারাসিটামল সেবনে ১০৪ শিশুর মৃত্যুর ঘটনায় পরিবার প্রতি ক্ষতিপূরণ দেওয়ার নির্দেশনা এসেছে উচ্চ আদালত থেকে। প্রত্যেকে পরিবারকে ১৫ লাখ টাকা করে ক্ষতিপূরণের নির্দেশ দিয়েছে হাইকোর্ট।
এ-সংক্রান্তে রুল যথাযথ ঘোষণা করে বৃহস্পতিবার বিচারপতি মো. আশরাফুল কামাল ও বিচারপতি রাজিক আল জলিলের হাইকোর্ট বেঞ্চ এ রায় দেয়।
ওষুধ প্রশাসন অধিদপ্তরকে সংশ্লিষ্ট ওষুধ কোম্পানির কাছ থেকে ক্ষতিপূরণের এ অর্থ আদায় করে আদেশ বাস্তবায়ন করতে বলা হয়েছে।
রায়ে ভেজাল ওষুধ উৎপাদন ও বাজারজাত রোধে ওষুধ প্রশাসন অধিদপ্তরের নিষ্ক্রিয়তা অবৈধ ঘোষণা করে পর্যবেক্ষণে হাইকোর্ট বলে, ভেজাল ওষুধের কারণে শিশু মৃত্যুর দায় ওষুধ প্রশাসন অধিদপ্তর এড়াতে পারে না। এ ছাড়া ভেজাল ওষুধের অপরাধের ক্ষেত্রে বিশেষ ক্ষমতা আইনে ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশ দিয়েছে হাইকোর্ট। আদালতে রিটের পক্ষে ছিলেন জ্যেষ্ঠ আইনজীবী মনজিল মোরসেদ। অপরপক্ষে ছিলেন আইনজীবী মো. আসাদুজ্জামান।
অ্যাডভোকেট মনজিল মোরসেদ বলেন, ১৯৯১ সালে ভেজাল প্যারাসিটাল সিরাপ সেবন করে ৭৬ শিশু এবং ২০০৯ সালে রিড ফার্মার প্যারাসিটামাল সেবন করে ২৮ শিশু মৃত্যুবরণ করে। এ ঘটনায় দৈনিক পত্রিকায় প্রকাশিত প্রতিবেদন যুক্ত করে ২০১০ সালে পরিবেশ ও মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস অ্যান্ড পিস ফর বাংলাদেশের (এইচআরপিবি) পক্ষে জনস্বার্থে প্রতীকার চেয়ে উচ্চ আদালতে রিট আবেদন করা হয়। শুনানি নিয়ে হাইকোর্ট ওষুধ প্রশাসনের নিষ্ক্রিয়তা ও ক্ষতিপূরণের প্রশ্নে রুল দেয়। রুলের চূড়ান্ত শুনানি শেষে বৃহস্পকিবার এ রায় হলো।
দেশ রূপান্তরকে এ আইনজীবী বলেন, ‘ভেজাল ওষুধ খেয়ে এতগুলো শিশুর মৃত্যুর ঘটনা খুবই মর্মান্তিক। কিন্তু দোষীদের শাস্তি খুব বেশি দেখা যায় না। এ ধরনের অপরাধে বিশেষ ক্ষমতা আইনে ব্যবস্থা নেয়ার বিধান থাকলেও তা প্রায়ই কার্যকর হয় না। হাইকোর্টের এ রায়ের ফলে এ আইনে মামলা হলে ভেজাল ওষুধ তৈরিকারীদের অপতৎপরতা কমবে।’
১৯৯১ সালে অ্যাডফ্লেম ফার্মাসিউটিক্যালসের (পরে বিলুপ্ত) ভেজাল প্যারাসিটামল সিরাপ সেবন করে ৭৬ শিশুর মৃত্যুর অভিযোগ উঠে। এর আগে অ্যাডফ্লেমের প্যারাসিটামলে সেবনের পর বহু শিশুর কিডনি সমস্যা দেখা দেয়। ১৯৯৩ সালে পরীক্ষা শেষে অ্যাডফ্লেম ফার্মাসিউটিক্যালসের প্যারাসিটামল সিরাপে ডাই-ইথিলিন গ্লাইকলের উপস্থিতি ধরা পড়ে। পরে অ্যাডফ্লেম ফার্মার সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে মামলা করে ওষুধ প্রশাসন অধিদপ্তর। শুনানি শেষে ঢাকার ড্রাগ আদালতের বিচারক ২০১৪ সালের ২৩ জুলাই অ্যাডফ্লেম ফার্মাসিউটিক্যালসের অন্যতম মালিক ও পরিচালক ডা. হেলেনা পাশা, কোম্পানির এমডি (ব্যবস্থাপনা পরিচালক) মিজানুর রহমান ও উৎপাদন ইনচার্জ নৃগেন্দ্রনাথ বালাকে ওষুধ নিয়ন্ত্রণ আইনের সংশ্লিষ্ট ধারায় ১০ বছর করে কারাদণ্ড দেয়।
অন্যদিকে রীড ফার্মার ভেজাল প্যারাসিটামল সিরাপ সেবন করে ২০০৯ সালের জুন থেকে অগাস্ট মাস পর্যন্ত সময়ে দেশের বিভিন্ন এলাকায় ২৮ শিশুর মৃত্যুর অভিযোগ ওঠে। এ ঘটনায় ওষুধ প্রশাসন অধিদপ্তর ঢাকার ড্রাগ আদালতে একটি মামলা করে।
রীড ফার্মার ব্যবস্থাপনা পরিচালক মিজানুর রহমান, তার স্ত্রী ও কোম্পানির পরিচালক শিউলি রহমান, পরিচালক আব্দুল গণি, ফার্মাসিস্ট মাহবুবুল ইসলাম ও এনামুল হককে আসামি করা হয়।
শুনানি শেষে ২০১৬ সালের ২৮ নভেম্বর ড্রাগ আদালত এ মামলার রায় দেয়। রায়ে পাঁচজন আসামির সবাইকে খালাস দেওয়া হয়।
আদালত বলে, এ মামলার তদন্তে গাফিলতি ছিল। রাষ্ট্রপক্ষ আসামিদের বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রমাণ করতে পারেনি।