অর্থনীতি এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জে : সিপিডি

অতীতের যেকোনো সময়ের তুলনায় দেশের অর্থনীতি এখন বেশি চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি রয়েছে বলে মনে করছে বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি)। সংস্থাটির মতে, বিশ্ববাজারে দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধির কারণে মূল্যস্ফীতিতে চাপ সৃষ্টি করছে। আমদানির চাপ সামলাতে গিয়ে রিজার্ভ কমে আসছে। অস্থিরতা বিরাজ করছে ডলারের বাজারে। আর এসব সমস্যার মূল্যে রয়েছে আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক অর্থনৈতিক সমস্যা।

গতকাল রবিবার সিপিডি কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত চলতি ২০২১-২২ অর্থবছরের সামষ্টিক অর্থনীতির তৃতীয় পর্বের পর্যালোচনায় এমন পর্যবেক্ষণ তুলে ধরেন সংস্থাটির গবেষকরা। প্রারম্ভিক আলোচনায় সিপিডির নির্বাহী পরিচালক ফাহমিদা খাতুন বলেন, বাংলাদেশের অর্থনীতি বেশ কিছু চ্যালেঞ্জের মুখে রয়েছে। এর উৎস আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক অর্থনৈতিক সমস্যা। বর্তমানে বৈদেশিক বাণিজ্য এবং চলতি হিসাবে বড় ঘাটতি রয়েছে। বিনিময় হার অস্থিতিশীল। বিদেশি মুদ্রার রিজার্ভের ওপর এক ধরনের চাপ রয়েছে। এর ফলে সামষ্টিক অর্থনীতি এক ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হচ্ছে। এই চ্যালেঞ্জ অন্য যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি।

সমস্যাগুলোর সঙ্গে আমাদের আগের সমস্যাও রয়েছেই। যেমন সম্পদ সঞ্চালনে সমস্যা, ব্যয়ের ক্ষেত্রে সমস্যা রয়েছে। স্বাস্থ্য সুরক্ষার ক্ষেত্রে যে সমস্যাগুলো ছিল সেগুলোও রয়েছে। কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও বৈষম্য দূর করার সমস্যাগুলোও রয়েছে।

এই সমস্যগুলো সমাধানে রাজস্ব নীতি ও মুদ্রানীতির মধ্যে সমন্বয়ের প্রয়োজন রয়েছে বলেও মন্তব্য করেন ফাহমিদা খাতুন। যেসব খাতে ভর্তুকি অব্যাহত রাখা দরকার তা রাখতে হবে বলেও মনে করেন তিনি।

সিপিডির নির্বাহী পরিচালক বলেন, অভ্যন্তরীণ সম্পদ সঞ্চালনের গতি ত্বরান্বিত করতে হবে। সরকারি ব্যয়ের ক্ষেত্রেও গতি ত্বরান্বিত করতে হবে। প্রাধিকার খাতগুলোতে ব্যয় করা এবং অন্য যে খাতগুলোতে ব্যয় দরকার সে-রকম খাতে সাশ্রয়ীভাবে খরচ করার ব্যবস্থা নিতে হবে। এছাড়া অপ্রয়োজনীয় ব্যয় বন্ধ করতে হবে। যেখানে মূল উদ্দেশ্য হবে অভ্যন্তরীণ চাহিদা বজায় রাখা, অন্যদিকে বাজারের সরবরাহ নিশ্চিত করা। এর উদ্দেশ্য হচ্ছে ব্যক্তি খাতে বিনিয়োগ যেন বাড়ে, যা আমাদের কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রে সহায়তা করবে এবং তার পাশাপাশি দরিদ্র যারা, তাদের সামাজিক সুরক্ষা দেওয়া।

অনুষ্ঠানে বাংলাদেশের অর্থনীতির পাঁচটি খাত নিয়ে আলোচনা হয়। অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, দেশজ উৎপাদনের প্রবৃদ্ধি, সরকারের আয়-ব্যয়ের কাঠামো, মূল্যস্ফীতি এবং তার পাশাপাশি মুদ্রা ও ব্যাংকিং খাত এবং বহিঃখাতের অবস্থা নিয়ে আলোচনা করা হয়।

সিপিডির সম্মানীয় ফেলো অধ্যাপক ড. মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, মূল্যস্ফীতির আরেকটি বড় কারণ অভ্যন্তরীণ বাজার তদারকির অভাব। এ কারণে অনেক ব্যবসায়ী পণ্য মজুদ করে দাম বাড়ানোর চেষ্টা করেন। এক্ষেত্রে সরকারও টিসিবির মাধ্যমে বাজারে পণ্য সরবরাহ বাড়ানোর চেষ্টা করছে। এক্ষেত্রে সরকারের হাতে থাকা ব্যবস্থাগুলো সঠিকভাবে ব্যবহার করতে পারছে না বলে মন্তব্য করেন সিপিডির এই গবেষক।

মূল্যস্ফীতির চাপ কমাতে মানুষের ক্রয়ক্ষমতা বাড়ানোর ওপর সরকারকে জোর দেওয়ার পরামর্শ দেন ড. মোস্তাফিজুর রহমান। এটা সরকারের হাতে আছে বলে মন্তব্য করেন তিনি।

মুদ্রা বিনিময় হার নিয়ে মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, বাজার এই বিনিময় হার ঠিক করে নেবে। এটা হলেই ডলারের দর আরেকটু বাড়বে। এতে হুন্ডি কমে আসবে, রেমিট্যান্স বাড়বে।

রেমিট্যান্সের প্রণোদনা বাড়ানোর পরিবর্তে উল্টো কমানোর প্রস্তাব করেন সিপিডির সম্মানীয় ফেলো মোস্তাফিজুর রহমান।

তিনি বলেন, ‘এখানে দেখতে হবে হুন্ডি হওয়ার কোনো আশঙ্কা আছে কি না। কিছুদিন আগে কার্ব মার্কেটের সঙ্গে বাণিজ্যিক ব্যাংকের ডলারের দামের মধ্যে ১০-১২ টাকা পার্থক্য হয়েছিল। তখন প্রণোদনা দরকার ছিল। কিন্তু এখন তো সেই পার্থক্য নেই। এই সময়ে রেমিট্যান্সে ২ দশমিক ৫০ শতাংশ প্রণোদনা দেওয়ার কোনো কারণ নেই।’

গবেষণা পরিচালক ড. খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম বলেন, দীর্ঘদিন ধরে দেশের সামষ্টিক অর্থনীতিতে যে স্থিতিশীলতা ছিল তাতে বর্তমানে চিড় ধরেছে। এই ভঙ্গুরতা দূর করতে যেসব পদক্ষেপ নেওয়া দরকার সে বিষয়ে সরকারকে নজর দিতে হবে।

ডলারের দর আরও কিছুটা বাড়ানোর সুযোগ আছে বলে মন্তব্য করেন গোলাম মোয়াজ্জেম। তিনি বলেন, ডলার ব্যবস্থাপনাও আরও কার্যকর করা দরকার। কীভাবে ডলারে সরবরাহ বাড়ানো যায় সেদিকে নজর দিতে হবে।