অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল বৃহস্পতিবার জাতীয় সংসদে ২০২২-২৩ অর্থবছরের ৬ লাখ ৭৮ হাজার ৬৪ কোটি টাকার যে বাজেট প্রস্তাব উপস্থাপন করেছেন, অর্থনীতিবিদদের মতে তা ‘ব্যবসায়ীবান্ধব’। দেশের সার্বিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতিতে বাজেট ব্যবসা ও বিনিয়োগবান্ধব হবে, সেটাই প্রত্যাশিত। তবে কেবল ‘ব্যবসায়ীবান্ধব’ হলে সেটি সব পক্ষের জন্য সুখকর হবে না, তা বলাই বাহুল্য। বাজারব্যবস্থায় উৎপাদক ও ব্যবসায়ীরাই একমাত্র পক্ষ নন। বাজারব্যবস্থার একটি বড় অংশীদার ক্রেতা। ক্রেতাদের ক্রয়ক্ষমতা টিকিয়ে রাখতে এবং বাড়াতে না পারলে ব্যবসা সফল যেমন হবে না, তেমনি বাজারব্যবস্থাও সক্রিয় থাকবে না। ফলে, ক্রেতাদের প্রধান অংশ মধ্যবিত্তের ক্রয়ক্ষমতা বৃদ্ধির দিকে বাজেটে নজর দেওয়া জরুরি বলেই প্রত্যাশিত ছিল; বিশেষ করে গত দুই বছরের করোনা মহামারীর কারণে নতুন যে বাস্তবতা তৈরি হয়েছে তাতে মধ্যশ্রেণির মানুষেরা ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। করোনার কারণে চাকরি হারানো, আয় হ্রাস, চিকিৎসা ব্যয় বৃদ্ধিসহ নানা কারণে তাদের ক্রয়ক্ষমতার অবনমন বাজারে প্রভাব রেখে চলেছে। আবার এই সময়ে ইউক্রেন-রাশিয়ার যুদ্ধের প্রভাবে নিত্যপণ্যের বাজার যেভাবে ঊর্ধ্বমুখী, এমন অবস্থা থেকে উত্তরণের একটি রূপরেখা বাজেটে খুবই প্রত্যাশিত ছিল। এর মধ্যে তেলসহ নিত্যপণ্যের দফায় দফায় মূল্যবৃদ্ধি ক্রেতাদের আরও কোণঠাসা করে ফেলেছে। আমাদের দেশে বাজেট পেশের পর বাজারে দ্রুত তার প্রভাব পড়ে। বাজারব্যবস্থাকে স্থিতিশীল রাখার জন্যও পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন। যুদ্ধের কারণে যে বাড়তি মূল্যস্ফীতি, তা মোকাবিলায় ইতিমধ্যেই অনেক দেশ সুদহার বৃদ্ধি করেছে, রাজস্ব নীতিতে পরিবর্তন এনেছে। কিন্তু বাংলাদেশ সে পথে হাঁটছে না। সবার প্রত্যাশা ছিল মূল্যস্ফীতি ঘিরে যে সংকট, তা নিরসনে অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল বাস্তবধর্মী কিছু পদক্ষেপ নেবেন। কিন্তু অর্থমন্ত্রীর বাজেট বক্তৃতায় এসবের প্রতিফলন দেখা যায়নি।
প্রস্তাবিত বাজেটে মধ্যবিত্ত শ্রেণির স্বার্থ উপেক্ষিত হওয়ার বিষয়টি বিশেষভাবে অনেকের নজরে পড়েছে। এমনকি অর্থমন্ত্রীর ‘কভিডের অভিঘাত পেরিয়ে উন্নয়নের ধারাবাহিকতায় প্রত্যাবর্তন’ শিরোনামের বাজেট বক্তৃতাতেও সংকট মোকাবিলায় দিকনির্দেশনার অভাব দেখা গেছে। বর্তমানের উচ্চ মূল্যস্ফীতির কারণে দেশের সাধারণ মানুষ কষ্টে আছেন। আয়ের বড় অংশই চলে যাচ্ছে খাদ্যপণ্য ব্যয়ে। নিম্ন ও স্বল্প আয়ের মানুষের জন্য টিসিবি, ওএমএসের মাধ্যমে কিছুটা সহায়তা দেওয়ার চেষ্টা চালানো হলেও উচ্চ মূল্যস্ফীতির চাপ সামলাতে সাধারণ মানুষের জন্য কোনো সুখবর নেই। বাজেটে প্রতিবন্ধীদের জন্য বরাদ্দ ১০০ টাকা বাড়ানো ছাড়া গরিবের জন্য নতুন করে কোনো সুবিধা বাড়ানো হয়নি।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে বাজেটে সুনির্দিষ্টভাবে কিছু নেই। সরকার মূল্যস্ফীতির লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে ৫ দশমিক ৬ শতাংশ। এটা কোনো কাজে লাগবে না। অদূর ভবিষ্যতে বিশ^বাজারে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম আরও বেড়ে যাবে। এতে আমদানি ব্যয় বাড়বে। ডলারের দাম বেড়ে টাকার অবমূল্যয়ান হবে। এমন পরিস্থিতি থেকে উত্তরণ ও মোকাবিলার কোনো সুনির্দিষ্ট পথা রাখা হয়নি।
প্রস্তাবিত বাজেটে কর্মসংস্থানমূলক কিংবা যারা করোনার কারণে আরও দরিদ্র হয়ে পড়েছেন, তাদের জন্য কোনো কার্যকর কর্মসূচি নেই। মানবসম্পদ উন্নয়ন, জীবিকা নিশ্চিতের কোনো পদক্ষেপ দেখা যাচ্ছে না। অন্যদিকে অর্থনীতির এই ক্রান্তিকালে কয়েকটি ক্ষেত্রে করছাড় দেওয়া হয়েছে, যেটি এ সময়ে প্রয়োজন ছিল না বলেই মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। করছাড় ও করপোরেট কর হ্রাসের বেশিরভাগ সুবিধা ভোগ করবেন ব্যবসায়ী, শিল্পপতিরা। এর সুবিধা মাঠপর্যায়ের ক্রেতারা পাবেনএমন আশা করা দুরূহ। সেই সঙ্গে এবার পাচার করা অর্থ ফিরিয়ে আনার সুযোগ রাখার বিষয়টিও অর্থনীতিবিদ ও বিশ্লেষকরা নজিরবিহীন এবং অগ্রহণযোগ্য বলছেন। অর্থনীতিবিদদের মতে, নতুন বাজেট প্রস্তাবে দারিদ্র্যহারসহ অনেক তথ্য-উপাত্তের মধ্যেই সামঞ্জস্য নেই, বেশ কিছু বিষয়ে পরিষ্কার বক্তব্য নেই, অনেক উপাত্তের হালনাগাদ পরিসংখ্যান নেই, কর্মসংস্থান সৃষ্টি নিয়ে সুস্পষ্ট ধারণাও নেই।
অর্থমন্ত্রী ২০২২-২৩ অর্থবছরের যে বাজেট প্রস্তাব জাতীয় সংসদে পেশ করেছেন, তা ৩০ জুনের মধ্যেই পাস হবে। এই সময়ে আরও আলোচনা ও সংশোধনের সুযোগ আছে। অর্থনীতিবিদ ও সংশ্লিষ্টদের কাছ থেকে বিভিন্ন পরামর্শ আসছে। সেগুলো বিশেষভাবে বিবেচনায় নেওয়া দরকার। বিশালসংখ্যক জনসাধারণকে সুবিধার বাইরে রেখে একধরনের ব্যবসায়ী শ্রেণিকে নিয়ে দেশ এগিয়ে যাবে, এমনটা মনে করা ঠিক হবে না।