দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণে কৌশলের অভাব

আসন্ন অর্থবছরের জন্য প্রস্তাবিত বাজেটে অর্থমন্ত্রী দেশের সকল শ্রেণি-পেশার মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় সহনীয় রাখতে সুনির্দিষ্ট কোনো দিকনির্দেশনা দেননি বলে মনে করছে সিপিডি। চরম হতাশা ব্যক্ত করে বেসরকারি এই গবেষণা সংস্থাটি বলেছে, বাজেটে ধনীদের সুবিধার কথাই বলা হয়েছে বেশি। বিশেষ করে, স্থানীয় অনেক ধরনের ব্যবসাবাণিজ্য উৎসাহিত করতে শুল্ক-করে ছাড় দেওয়া হয়েছে, দেশে তৈরি হয় এমন পণ্য যাতে আমদানি না হয় সে বিষয়েও পদক্ষেপ আছে। কিন্তু বৈশ্বিক অর্থনীতিসহ স্থানীয় অর্থনৈতিক সংকট মোকাবিলায় বাজেটে সৃজনশীল কোনো পদক্ষপ নেই।

তা ছাড়া গরিব মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় নির্বাহের বিষয়টিও সংবেদনশীলতার সঙ্গে দেখা হয়নি। বরং পাচার করা টাকা দেশে আনার সুযোগ দেওয়া হয়েছে। এটাকে ‘নৈতিক’, ‘অর্থনৈতিক’ ও ‘রাজনৈতিক’ তিন দিক থেকেই অগ্রহণযোগ্য বলে মনে করেন সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) গবেষকরা।

তবে শর্তসাপেক্ষে করপোরেট কর কমানো, স্থানীয় শিল্পের সুরক্ষার জন্য একই ধরনের আমদানিকৃত পণ্যের শুল্ক-কর বাড়ানো, ভর্তুকি বাড়ানোর পদক্ষেপকে ইতিবাচকভাবে দেখছেন সিপিডির গবেষকরা। তারা মনে করেন, আসন্ন জাতীয় নির্বাচনকে কেন্দ্র করে এই বাজেট প্রস্তাব করা হয়নি।

তবে সামগ্রিকভাবে ধনীদের এই বাজেটে জয় হয়েছে। মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্তদের জন্য তেমন কিছু নেই বাজেটে। কোথাও কোথাও মধ্যবিত্তের ওপর কর চাপানো হয়েছে। তা ছাড়া বাজেটে খাতওয়ারি বরাদ্দ ও আয়-ব্যয়ের হিসাবও অনেক ক্ষেত্রে বাস্তবসম্মত নয় বলে মনে করছে সংস্থাটি।

গতকাল শুক্রবার রাজধানীর গুলশানে লেকশোর হোটেলে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে বাজেট পর্যালোচনা তুলে ধরেন সিপিডির গবেষকরা। তাদের বক্তব্যে ঘুরেফিরে মূল্যস্ফীতির প্রসঙ্গটি এসেছে। এর আগের দিন বৃহস্পতিবার জাতীয় সংসদে আসন্ন ২০২২-২৩ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেট তুলে ধরেন অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল।

সংবাদ সম্মেলনে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন সিপিডির নির্বাহী পরিচালক ফাহমিদা খাতুন। তিনি বলেন, এই বাজেট যখন উপস্থাপিত হলো তখন সারা বিশ্ব এবং বাংলাদেশের অর্থনীতি অনেকগুলো চ্যালেঞ্জের মধ্যে নিমজ্জিত রয়েছে। এর প্রেক্ষিতে সামষ্টিক অর্থনীতির স্থিতিশীলতা অনেকটা দুর্বল হয়ে পড়েছে। অর্থনীতির অনেক সূচকে নেতিবাচক পরিস্থিতি লক্ষ্য করা যাচ্ছে।

তিনি বলেন, বর্তমানে ছয়টি চ্যালেঞ্জ রয়েছে বলে অর্থমন্ত্রীও বলেছেন। এর মধ্যে আছে মূল্যস্ফীতি ও অভ্যন্তরীণ বিনিয়োগ বাড়ানো, গ্যাস, বিদ্যুৎ ও সারে ভর্তুকি বাড়ানো, বিদেশি ঋণের ব্যবস্থাপনা, প্রকল্প সময়মতো বাস্তবায়ন, ভ্যাট-ট্যাক্স আদায় বাড়ানো, বিদেশি মুদ্রা বিনিময় হার ও রিজার্ভকে একটি স্বস্তিদায়ক অবস্থানে রাখা।

ফাহমিদা খাতুন বলেন, ‘আগামী অর্থবছরে মূল্যস্ফীতি ৫ দশমিক ৬ শতাংশের মধ্যে রাখার লক্ষ্যের কথা জানিয়েছেন অর্থমন্ত্রী। আমাদের প্রশ্ন, এই হিসাবটা কীভাবে এলো। আমরা কি ধরে নিচ্ছি, আগামী এক বছরে সারা বিশ্বে মূল্যস্ফীতির চাপ কমে যাবে? তাহলে কীভাবে আমাদের আমদানি মূল্যবৃদ্ধিজনিত মূল্যস্ফীতি কমে আসবে। এখনই তো মূল্যস্ফীতি ৬ দশমিক ২৯ শতাংশ রয়েছে। সারা বিশ্বই তো এখন একটি মন্দার মধ্যে ঢুকতে যাচ্ছে।’

সিপিডির নির্বাহী পরিচালক বলেন, ‘ভর্তুকির বরাদ্দ বাড়ানোকে আমরা ইতিবাচকভাবে দেখছি। কিন্তু মূল্যস্ফীতির চাপের মধ্যে ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলের ফি’র ওপর ৫ শতাংশ ভ্যাট দিতে হবে। এখন অনেক মধ্যবিত্তের সন্তানরাও ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলে পড়ে। এটা তাদের জন্য চাপ সৃষ্টি করবে।’

সংস্থার সম্মানীয় ফেলো ড. মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, ‘১৫ শতাংশ কর দিয়ে বিদেশে অর্জিত সম্পদ বৈধ করার সুযোগ দেওয়া হয়েছে। আর ওই সম্পদ ১০ শতাংশ কর দিয়ে দেশে নিয়ে আসা যাবে। পাচার করা নগদ টাকা ৭ শতাংশ কর দিয়ে দেশে আনা যাবে। এই সুযোগটা নৈতিক, অর্থনৈতিক এবং রাজনৈতিকভাবে অগ্রহণযোগ্য। যারা বিদেশে অবৈধভাবে অর্থ নিয়েছেন সেটা কেনোভাবে নৈতিক নয়। অর্থনৈতিকভাবে যৌক্তিক নয়, কারণ অনেক বেশি পাচার করা টাকা ফেরত আসবে না।’ তিনি আরও বলেন, ‘সামনে নির্বাচন, গরিব মানুষরা যখন দেখবেন বাজেটে তাদের জন্য কিছু নেই, কিন্তু অর্থ পাচারকারীদের ছাড় দেওয়া হচ্ছে তারা বিষয়টি কীভাবে নেবেন।’

মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, বাজেটের কৌশল ঠিক আছে। কিন্তু চ্যালেঞ্জগুলো মোকাবিলা করার জন্য যেসব প্রস্তাব থাকা দরকার ছিল সেগুলো আসেনি। বরং বাজেট প্রস্তাবনায় সৃজনশীলতা ও সংবেদনশীলতার অভাব দেখেছেন। তিনি বলেন, ‘আমরা বাজেটের কয়েক দিন আগে একটি উদাহরণ দিয়ে দেখিয়েছি, ঢাকা শহরে চার সদস্যের একটি পরিবারের ন্যূনতম ৪১ হাজার টাকা দরকার হয়। কিন্তু এবারের বাজেটে শুল্কনীতি দিয়ে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করা হয়েছে। এটা মুদ্রানীতি দিয়ে মোকাবিলা করার দরকার ছিল।’

সিপিডির এই সম্মানীয় ফেলো বলেন, ‘বাজেটের দর্শন হচ্ছে যারা বেশি সম্পদ অর্জন করে তাদের কাছ থেকে কর নিয়ে গরিব মানুষের সামাজিক সুরক্ষায় ব্যয় করা। কিন্তু এবারের বাজেটে আমরা সেই দর্শন দেখতে পাইনি।’

বাজেটে ভুল অনুমান করা হচ্ছে বলেও মন্তব্য করেন মোস্তাফিজুর রহমান। তিনি বলেন, ডলারের দর ৯২ থকে ৮৬ টাকায় নেমে আসবে বলেছেন অর্থমন্ত্রী। কিন্তু এটা হতে গেলে রেমিট্যান্স কী পরিমাণ বাড়বে, ডলারের প্রবাহ বাড়াতে হবে তার সঙ্গে এই প্রত্যাশা খাপ খায় না। অনুমিতি এবং নীতির মধ্যে বৈপরীত্য। ঘাটতি অর্থায়নের জন্য সরকার যদি ব্যাংক থেকে বেশি ঋণ নেয়, তাহলে বেসরকারি খাতে ঋণের চাপ সৃষ্টি হবে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

সিপিডির গবেষণা পরিচালক ড. খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম বলেন, বর্তমানে অর্থনীতির যে অসুখ চিহ্নিত করা হয়েছে, সেই তুলনায় পর্যাপ্ত ওষুধ এই বাজেটে দেওয়া হয়নি। সামাজিক সুরক্ষার জন্য বরাদ্দ বাড়ানোর কথা ছিল তার তুলনায় কম বরাদ্দের কথা বলা হয়েছে। মূল্যস্ফীতি যেহেতু আমদানিজনিত কারণে বাড়ছে, সেখান থেকে গরিব ও সীমিত আয়ের মানুষকে পরিত্রাণ দেওয়ার কোনো কিছু বাজেটে বলা হয়নি।

সংবাদ সম্মেলনে সিপিডির সিনিয়র রিসার্চ ফেলো মুনতাসির কামাল, সিনিয়র রিসার্চ ফেলো তৌফিকুল ইসলাম খান এবং রিসার্চ ফেলো সৈয়দ ইউসুফ সাদাত প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন।

গত বৃহস্পতিবার আসন্ন অর্থবছরে সরকার সামগ্রিকভাবে ৬ লাখ ৭৮ হাজার ৬৪ কোটি টাকা ব্যয় করার পরিকল্পনা করছে। এর মধ্যে সরকারের রাজস্ব আয় থেকে আসবে ৪ লাখ ৩৩ হাজার কোটি টাকা। ঘাটতি দাঁড়াবে ২ লাখ ৪৫ হাজার ৬৪ কোটি টাকা।