সাপ দেখলে প্রথমে কি করবেন? কেউ দৌঁড়ে পালাবেন, কেউবা আশেপাশে লাঠিসোটা খোঁজা শুরু করবেন। কোন ক্ষতি করুক বা না করুক সুযোগ পেলেই সাপ মারতে উদ্যত হবেন অনেকে। অথচ সাপ পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখে। কিছু সাপ নির্বিষ, কিছু মৃদু বিষধর আবার কিছু সাপ আছে বিষধর। জনবসতির কাছাকাছি বিষধর সাপের সংখ্যা কম।
সাপ ইঁদুর খেয়ে কৃষকের বন্ধুর মতো কাজ করে। নিজে আক্রান্ত না হল মানুষকে কামড় দেয় না। সবকিছুর বাইরে পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় জীববৈচিত্র্যের অন্যতম এ অনুষঙ্গেরও অবদান রয়েছে। কিন্তু এতোকিছু ক’জনই বা জানেন? সাপ নিয়ে মানুষের ভ্রান্ত ধারণার শেষ নেই! মানুষের মাঝে সাপ নিয়ে এই কুসংস্কার নির্মূল করে প্রকৃত ধারণা পৌঁছে দিতে এবং সাপের যেকোন বিপদে কাজ করে যাচ্ছেন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের একদল শিক্ষার্থী।
প্রাণ-প্রকৃতির কল্যাণের কথা চিন্তা করে ২০১৮ সালে ‘ডিপ ইকোলজি এন্ড স্নেক রেসকিউ ফাউন্ডেশন’ নামে সংগঠনের ব্যানারে এক হয়ে কাজ শুরু করেন বিশ্ববিদ্যালয়ের কিছু শিক্ষার্থী। পরবর্তীর্তে এ সংগঠনের কলেবর বেড়েছে। সেই সঙ্গে বেড়েছে সংগঠনের কাজের পরিধিও। সম্প্রতি বিশ্ববিদ্যালয়ের এ শিক্ষার্থীদের কার্যক্রম তুলে ধরে সচিত্র প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে বিবিসি।
শুক্রবার প্রকাশিত বিবিসির প্রতিবেদনে, পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় পরিচালিত এই সংগঠনের বিভিন্ন কার্যক্রম তুলে ধরা হয়। সংগঠনের কর্মীদের লক্ষ্য এবং তাদের সাপ উদ্ধারের কিছু চিত্রও তুলে ধরা হয়।
সাপ উদ্ধার করা, নিরাপদ আবাসস্থলে ছেড়ে দেওয়াসহ যেকোন বন্যপ্রাণির বিপদে সর্বাত্মক সহায়তা করে যাচ্ছেন ডিপ ইকোলজি এন্ড স্নেক রেসকিউ ফাউন্ডেশনের সদস্যরা। হাতেগোণা কয়েকজনকে নিয়ে শুরু হওয়া এ সংগঠনটির আওতায় বর্তমানে সারাদেশে স্বেচ্ছাসেবক হিসেবে কাজ করছেন প্রায় সাড়ে পাঁচশ’ জন। আর প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত উদ্ধারকর্মী রয়েছেন ৫০ জন। যাদের মধ্যে ৬ জন নারী।
এ সংগঠনের প্রতিষ্ঠাতা মাহফুজুর রহমান। তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের দর্শন বিভাগের ৪৬তম ব্যাচের (২০১৬-১৭ সেশন) শিক্ষার্থী। বর্তমানে সংগঠনটির সভাপতির দায়িত্ব পালন করছেন মাহফুজুর।
নিজেদের কাজের বর্ণনা দিতে গিয়ে মাহফুজ বলেন, ‘ব্যক্তিগতভাবে ২০১৩ সাল থেকে আমি সাপ নিয়ে কাজ করি। এরপর জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে আসার পর দেখি, অনেকে সাপ দেখতে পেলে মেরে ফেলছেন। তখন কয়েকজন মিলে ২০১৮ সালে আমাদের সংগঠন প্রতিষ্ঠা করি। এরপর থেকে চিত্র বদলাতে থাকে।’
তিনি বলেন, ‘আমরা অনলাইনে যেমন সচেতনতামূলক কার্যক্রম পরিচালনা করছি। সেই সঙ্গে সশরীরে ঘটনাস্থলে গিয়ে প্রাণীদের উদ্ধার করছি। অনেকসময় অনলাইনেই খবর পাচ্ছি কোথায় যেতে হবে। আমাদের সংগঠনের ফেসবুক গ্রুপে এক লাখের বেশি সদস্য রয়েছেন। গত কয়েক বছরের প্রচেষ্টায় মানুষের চিন্তাধারায় অনেক ইতিবাচক পরিবর্তন আমরা আনতে পেরেছি।’
তিনি আরও বলেন, ‘প্রাণীদের কল্যাণে আমরা কাজ করছি। প্রাণীর সঙ্গে মানুষের মাঝে যেন কোন ধরণের সংঘাত না থাকে সেটাই আমাদের লক্ষ্য। আমরা কোন প্রাণীর বিপদে উদ্ধার কার্যক্রম, পুনর্বাসন ও আহত হলে চিকিৎসা দিয়ে থাকি। সবচেয়ে বেশি কাজ করার সুযোগ হয়েছে সাপ নিয়ে। এ পর্যন্ত কয়েক হাজার সাপ আমরা উদ্ধার করেছি।’
সংগঠনটির সদস্যরা বলছেন, সাপের প্রতি মানুষের যে নেতিবাচক চিন্তা তা দূর করা প্রয়োজন। এ ছাড়া পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় সকল প্রাণীরই অস্তিত্ব বজায় রাখতে দিতে হবে। সেজন্য প্রাণীদের বিপদে তারা ছুটে যান। কুকুর, বিড়ালের মতো সামাজিক প্রাণী থেকে মানুষের যেন জলাতঙ্ক না হয় সেজন্য এসব প্রাণীদের ভ্যাকসিনের আওতায় আনার কাজও করছেন তারা। এর পাশাপাশি সংগঠনটি বৃক্ষরোপণ কার্যক্রমও পরিচালনা করে।
সংগঠনের হয়ে যারা কাজ করেন তাদের প্রশিক্ষণও দেওয়া হয়ে থাকে। বিষধর সাপ উদ্ধারে প্রশিক্ষণপ্রাপ্তদের পাঠানো হয়। এই প্রশিক্ষণপ্রাপ্তদের তালিকায় রয়েছে নারীরাও।
সংগঠন সংশ্লিষ্টরা বলছেন, দেশের প্রথম নারী সাপ উদ্ধারকর্মী এই সংগঠনেরই সদস্য। যার নাম সৈয়দা অনন্যা ফারিয়া। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন ও বিচার বিভাগের ৪৯তম ব্যাচের (২০১৯-২০ সেশন) শিক্ষার্থী অনন্যা। তার সঙ্গে এখন আরও পাঁচজন নারী উদ্ধারকর্মী এ দলে যুক্ত হয়েছেন।
জানতে চাইলে সৈয়দা অনন্যা দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘যে সময়টাতে আমরা কাজ শুরু করি তখন অনেক সাপ মারা পরতো। সচেতনতা বাড়ার কারণে যে সংখ্যা এখন কমেছে। সারাদেশের জন্য আমাদের হটলাইন নম্বর আছে। যেখান থেকে কয়েক হাজার মানুষ সেবা নিয়েছেন।’
তিনি বলেন, ‘প্রত্যন্ত অঞ্চলের মানুষেরাও এখন সাপে কাটলে ওঁঝার বিপরীতে চিকিৎসকের কাছে যাচ্ছেন। সাপ না মেরে আমাদের হেল্পলাইনে কল করছেন। এই বিষয়গুলো ইতিবাচক পরিবর্তনের ইঙ্গিত দেয়।’