বাজেটে বিদেশে পাচারকৃত অর্থ ফেরত আনার যে সুযোগ দেওয়া হয়েছে তার বিরোধীর করেছেন সরকারি ও বিরোধী দলের প্রায় সকল সংসদ সদস্য। বিদেশে পাচারকৃত অর্থ ফেরত আনার সুযোগ দেওয়াকে এক ধরনের দুর্নীতি বলেও মন্তব্য করেন তারা। যারা অবৈধভাবে অর্থ আত্মসাৎ করে বিদেশে পাচার করেছে তাদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণের দাবিও জানান সংসদ সদস্যরা।
রবিবার জাতীয় সংসদে প্রস্তাবিত বাজেটের ওপর সাধারণ আলোচনায় অংশ নিয়ে সরকারি ও বিরোধী দলের প্রায় সকল সংসদ সদস্য পাচারকৃত অর্থ ফেরত আনার সুযোগ দেয়ার বিরোধিতা করেন।
প্রস্তাবিত বাজেটে বিদেশে পাচারকৃত অর্থ ফেরাতে সরকার যে উদ্যোগ রেখেছে তার কঠোর সমালোচনা করেছেন বিরোধী দল জাতীয় পার্টির সংসদ সদস্য পীর ফজলুর রহমান। তিনি বলেন, বাজেটে অর্থ পাচারকারীদের দায়মুক্তির যে সুযোগ রাখা হয়েছে, এই সুযোগ থাকলে এই চোরেরা হয়ে যাবে শ্রেষ্ঠ করদাতা।
পীর ফজলুর রহমান বলেন, অর্থমন্ত্রী বাজেটে যে দায়মুক্তি নিয়ে আসছেন, বিদেশে টাকা পাচার করা অর্থ দেশে নিয়ে আসলে দায়মুক্তি দেওয়া হবে; এটিকে আমি সমর্থন করি না। যারা অর্থ পাচার করেছে, যারা অবৈধভাবে অর্থ আত্মসাৎ করে বিদেশে পাচার করেছে তাদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হোক, না হলে মানি লন্ডারিং আইনের তো কোন দরকার নেই বাংলাদেশে।
তিনি বলেন, যদি বিদেশে অর্থ পাচার করে সেটাকে আবার বৈধ করা যায় ট্যাক্স দিয়ে, এটা যদি করেন; অনেকে সন্দেহ করছে তাহলে আরও বিশাল একটি গোষ্ঠী সেই টাকা বিদেশে পাচার করে বৈধভাবে দেশে আনার জন্য বসে আছেন। এটি বাস্তবায়ন হলে তাদের সেই উদ্দেশ্য সফল হবে। যারা অবৈধভাবে টাকা অর্জন করেছেন লুটপাটের মাধ্যমে তারা সেই টাকাটা বৈধ করার জন্য নিয়ে বসে আছেন।
জাতীয় পার্টির সংসদ সদস্য ব্যারিস্টার শামীম হায়দার পাটোয়ারি বলেন, কেউ ব্যাংক ডাকাতি করে, দুর্নীতি করে বিদেশে টাকা পাচার করে, তাদের বিরুদ্ধে কী কোন আইন ব্যবস্থা নেওয়া হবে না? যাদের বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ ও ফৌজদারি মামলা রয়েছে তারা এই সুবিধা ভোগ করতে পারবে না।
বিএনপির সংসদ সদস্য রুমিন ফারহানা বলেন, দেশে দরিদ্রের হার কমেছে বলে সরকার যে আত্মতৃপ্তিতে ভুগছে তার প্রমাণ পাওয়া যায় টিসিবির গাড়ির পেছনের লাইন দেখলে। সেখানে ক্যানসারের রোগী থেকে ৫ বছরের শিশুও লাইনে দাঁড়িয়ে দিনভর পরে মাল না পেয়ে ফিরতে বাধ্য হচ্ছে।
তিনি বলেন, দেশে ধনী-দরিদ্রের ব্যবধান বাড়ছে। দেশে চিকিৎসা ব্যয় এমন ভাবে বাড়ছে যে কোন পরিবারের একজন আক্রান্ত হলে সে সংসারের দুর্যোগ নেমে আসে। তিনি বলেন, ২৭ মন্ত্রণালয়ের সম্পূরক বরাদ্দ বাড়ানোর প্রস্তাব করা হয়েছে। এডিবির ৫৮ শতাংশ এখনো বাস্তবায়িত হয়নি। তা ছাড়া সব চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়, তারা বরাদ্দের ৪১ শতাংশ ১১ মাসে ব্যয় করতে পারেনি। অথচ এ রকম একটি গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়ের কোন জবাবদিহিতা চাওয়া হয়নি।
সরকারি দলের সদস্য ডা. প্রাণ গোপাল দত্ত বলেন, আমরা স্বাস্থ্য বিমা করতে পারি, কেননা আমাদের প্রায় সকল সরকারি-বেসরকারি কর্মচারী স্বাস্থ্য ভাতা পান। তিনি ক্লিনিকের লাইসেন্স সবাই যাতে না পায় সেদিকে নজর রাখার জন্য মন্ত্রণালয়কে আহ্বান জানান।
প্রাণ গোপাল দত্ত বিদেশে পাচারকৃত অর্থ ফেরত আনার সুযোগ দেওয়াকে এক ধরনের দুর্নীতি বলে মন্তব্য করে এটা বন্ধ করার আহ্বান জানান। তিনি বলেন, যারা অবৈধভাবে বিদেশে টাকা পাচার করে তারা ভালো মানুষ নয়। সুতরাং এ সুযোগ একবার দিলে বছরের পর বছর বিদেশে অর্থ পাচার হবে এবং স্বল্প ট্যাক্স দিয়ে তা সাদা করবে অসাধু লোকজন।
সরকার দলীয় সদস্য মহীউদ্দন খান আলমগীর বলেন, করোনাকালীন বৈশ্বিক বিপর্যয়ের মধ্যে প্রধানমন্ত্রী বিভিন্ন খাত ও গণমানুষকে আর্থিক সহায়তা প্রদানের মাধ্যমে দেশের অর্থনীতিকে শক্ত ভিতের ওপর দাঁড় করিয়েছেন। যে কারণে সম্পূরক বাজেট প্রস্তাবিত বাজেটের থেকে খুব বেশি পরিবর্তন হয়নি।
সরকারি দলের শহীদুজ্জামান সরকার বলেন, বাংলাদেশ আরো দৃঢ় প্রত্যয়ে এগিয়ে যাওয়ার অন্যতম সাহসী বাজেট দিয়েছে সরকার। করোনা মহামারিকালে সরকার বিশাল অঙ্কের টাকা ভর্তুকি দিয়ে একদিকে দেশের মানুষের জীবনকে রক্ষা করেছেন, অন্যদিকে দেশের অর্থনীতির চাকাকে সচল রেখেছেন। পৃথিবীর অনেক দেশে দুর্ভিক্ষ অবস্থা বিরাজ করছে, কিন্তু সেই পরিস্থিতি হতে দেননি বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনা। পৃথিবী দেখছে এই মহামারির মধ্যেও বাংলাদেশ কেমন করে বুক উঁচু করে এগিয়ে চলেছে। রাশিয়া-ইউক্রেনের যুদ্ধের কারণে সারা বিশ্বের মতো আমাদের এখানেও জিনিসপত্রের দাম কিছুটা বেড়েছে। কিন্তু সেটা কোনভাবেই নিয়ন্ত্রণের বাইরে যায়নি।
সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী আবুল হাসান মাহমুদ আলী দেশের ধারাবাহিক উন্নয়নের বিবরণ তুলে ধরে বলেন, বৈশ্বিক মহামারি করোনায় বিশ্বের সব দেশ যখন বিপর্যস্ত, সে সময় শেখ হাসিনার সুদক্ষ নেতৃত্বে দেশের অর্থনীতির চাকা সচল রেখে গণমানুষের জীবন জীবিকা স্বাভাবিক রাখা সম্ভব হয়েছে। বিশেষ করে এ মহামারির সময় শিল্প- বাণিজ্য থেকে শুরু করে সব খাতে এবং শহর থেকে তৃণমূল পর্যন্ত মানুষকে প্রণোদনা প্রদান করা হয়েছে।
গণফোরামের মোকাব্বির খান বলেন, দেশে যদি একজন বড় দুর্নীতিবাজকে ধরে সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিত করা যেত, তবে একদিনে দেশে দুর্নীতি ৫০ ভাগ কমে যেত। চ্যালেঞ্জ দিয়ে বলছি, বড় বড় দুর্নীতিবাজদের ধরে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দিন, দেশে ৫০ ভাগ দুর্নীতি না কমলে সংসদ সদস্যপদ থেকে পদত্যাগ করব।