৩২ দলের অপেক্ষা বিশ্বকাপ শুরুর

তখনো পৃথিবীতে করোনাভাইরাস আসেনি। ২০১৯ সালের ২৯ ডিসেম্বর চীনের উহানে প্রথম রোগী শনাক্ত হয়। এর প্রায় ৬ মাস আগে ২০১৯ সালের ৬ জুন মঙ্গোলিয়া-ব্রুনাই ম্যাচ দিয়ে শুরু হয়েছিল কাতার বিশ্বকাপের বাছাইপর্ব। শেষে হয়েছে ১৪ জুন কোস্টারিকা-নিউজিল্যান্ড ম্যাচ দিয়ে। তিন বছরে ২১৩টি দেশের মধ্যে ৮৬৬ ম্যাচে বাছাই হয়েছে চূড়ান্তপর্বের ৩২। ঠিক ১৫৭ দিন পর কাতারে এই দলগুলো শুরু করবে সোনার কাপের জন্য মূল লড়াই।

মঙ্গলবার কাতারের আল রাইয়্যানে সর্বশেষ প্লে-অফে মঙ্গলবার ওশেনিয়া প্রতিনিধি নিউজিল্যান্ডকে ১-০ গোলে হারিয়ে শেষ দল হিসেবে কাতার বিশ্বকাপ নিশ্চিত করে কোস্টারিকা। ম্যাচের ৩ মিনিটে নিজেদের প্রথম আক্রমণ থেকেই গোল পেয়ে যায় তারা। বাঁ প্রান্ত থেকে উইঙ্গার জেইসন বেনেটের ক্রস থেকে বাঁ পায়ের শটে গোল করেন জোয়েল ক্যাম্পবেল। এই নিয়ে ষষ্ঠবারের মতো বিশ্বকাপে খেলার সুযোগ পেল কোস্টারিকা। বাছাইপর্ব পেরোনা ৩১ দেশের মধ্যে কোস্টারিকাকে উত্তর-মধ্য আমেরিকা অঞ্চলের দেশের সংখ্যা হলো ৪টি। ওই অঞ্চলে কানাডা, মেক্সিকো ও যুক্তরাষ্ট্র সরাসরি উঠে গিয়েছিল চূড়ান্তপর্বে। কানাডা খেলতে যাচ্ছে ১৯৮৬ সালের পর প্রথমবার। মেক্সিকো ১৬তম আর যুক্তরাষ্ট্র ১১তম বারের মতো।

দক্ষিণ আমেরিকা অঞ্চল থেকে ব্রাজিল, আর্জেন্টিনা, উরুগুয়ে ও ইকুয়েডর সরাসরি সুযোগ করে নেয় বাছাইপর্ব থেকে। পঞ্চম দল পেরু এশিয়া অঞ্চলের পঞ্চম দল অস্ট্রেলিয়ার সঙ্গে প্লে-অফ খেলেছিল। কিন্তু তাদের টাইব্রেকারে হারিয়ে সকারুজরা ষষ্ঠবারের মতো জায়গা করে নেয় চূড়ান্তপর্বে। তাদের নিয়ে এশিয়া থেকে এবারের বিশ্বকাপে মূলপর্বে খেলছে ৬টি দেশ। স্বাগতিক কাতার ছাড়া বাকিরা হলো ইরান, দক্ষিণ কোরিয়া, জাপান ও সৌদি আরব। আফ্রিকা থেকে চূড়ান্তপর্বে উঠেছে- ঘানা, সেনেগাল, তিউনিসিয়া, মরক্কো ও ক্যামেরুন। বাকি ১৩ দেশ ইউরোপের জার্মানি, ডেনমার্ক, নেদারল্যান্ডস, গতবারের চ্যাম্পিয়ন ফ্রান্স, রানার্সআপ ক্রোয়েশিয়া, দুই সেমিফাইনালিস্ট বেলজিয়াম ও ইংল্যান্ড, স্পেন, পর্তুগাল, পোল্যান্ড এবং ওয়েলস। এবারের বাছাইপর্বে চমকপ্রদ ঘটনা ঘটিয়েছে ওয়েলস। ৬ জুন ইউরোপিয়ান অঞ্চলের প্লে-অফের ফাইনালে ইউক্রেনকে ১-০ গোলে হারিয়ে ৬৪ বছর পর কাতার বিশ্বকাপে জায়গা করে নিয়েছে তারা। টুর্নামেন্টের মূল মঞ্চে ‘বি’ গ্রুপে  ইংল্যান্ড, যুক্তরাষ্ট্র আর ইরানের বিপক্ষে গ্যারেথ বেলের খেলা দেখতে পাবেন বলে যারা পুলকিত একই সঙ্গে তাদের মনখারাপ হওয়ার কথা ইতালি নেই বলে। চারবারের বিশ্বকাপ জয়ীরা রাশিয়া বিশ্বকাপেও যোগ্যতা অর্জন করেনি। এবার ইউরো জেতার পর মনে হচ্ছিল শাপমুক্তি হবে। কিন্তু ইউরোপের এলিট ১৩-তে ঠাঁই হলো না শিলাচি-রোসি-ব্যাজিও-বারেসি-ক্যানভারোদের উত্তরসূরিদের। গ্রুপ পর্বে টানা তিন ম্যাচ জেতার পর বাকি ৫ ম্যাচে শুধু লিথুয়ানিয়াকে হারাতে পেরেছিল ইতালি। বাকি ৪ ম্যাচে সুইজারল্যান্ড, বুলগেরিয়া, উত্তর আয়ারল্যান্ডের সঙ্গে ড্র করে গ্রুপ সি-তে দ্বিতীয় হয়ে শেষ করতে হয়। টেক্কা দিয়ে সুইজারল্যান্ড দ্বাদশ বারের মতো চূড়ান্তপর্ব নিশ্চিত করে। ১০ রানার্সআপ দলের প্লে-অফে পুচকে উত্তর মেসিডোনিয়ার সঙ্গে খেলা পড়ে মানচিনির দলের। ২৪ মার্চ ঘরের মাঠে সেই ম্যাচে ইনজুরি সময়ের গোলে হেরে বিদায় নিতে হয় ইতালিকে। মেসিডোনিয়া অবশ্য প্লে-অফ ফাইনালে পর্তুগালের সঙ্গে পারেনি। এই পর্তুগালের বাছাই নিয়েও হয়েছে নাটক। গ্রুপ পর্বে সার্বিয়ার সঙ্গে ২৭ মার্চ বেলগ্রেডের খেলার শেষ মুহূর্তে ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদোর শট গোললাইন পেরুলেও গোল দেননি রেফারি। ম্যাচটিতে ভিএআর সুবিধা না থাকায় নিশ্চিত গোল বঞ্চিত হয় পর্তুগাল। ২-২ গোলে ড্র হওয়া ম্যাচটিতে যদি জিতত রোনালদোরা, তাহলে তাদের পয়েন্ট হতো ১৯, সার্বিয়ার ১৭। সেক্ষেত্রে সরাসরিই কাতারে সুযোগ হয়ে যেতো পর্তুগালের। কিন্তু সাবেক যুগোসøাভিয়ার উত্তরসূরি সার্বিয়া ২০ পয়েন্ট নিয়ে গ্রুপ চ্যাম্পিয়ন হয়ে উঠে যায় ফাইনালসে। পর্তুগালকে পোহাতে প্লে-অফের ঝক্কি।

মোট ১০টি দলকে পোহাতে হয়েছে এই ঝক্কি। এর মধ্যে ইউক্রেন আক্রমণ করায় নিষিদ্ধ রাশিয়া, যারা আগেরবারের আয়োজক ছিল, তারা নেই চূড়ান্তপর্বে। প্লে-অফ প্রতিপক্ষ পোল্যান্ড তাদের সঙ্গে খেলতে অস্বীকৃতি জানায়। পোল্যান্ড পরে চেক প্রজাতন্ত্রকে সেমিফাইনালে হারিয়ে প্লে-অফ ফাইনালে ওঠা সুইডেনকে হারিয়ে নবম বারের মতো জায়গা করে নিয়েছে চূড়ান্তপর্বে। রাশিয়ার চাপিয়ে দেওয়া যুদ্ধে বিধ্বস্ত ইউক্রেন প্লে-অফ খেলে চেষ্টা করেছিল ওঠার। স্কটল্যান্ডের বিপক্ষে সেমিফাইনাল জিতলেও, ফাইনালে ওয়েলসের গ্যারেথ বেলের কাছে হেরে যায়।

সুইডেনের কাছে প্লে-অফ সেমিফাইনালে হারলেও চেক প্রজাতন্ত্র নেশন্স লিগে ভালো করায় নবম বারের মতো সুযোগ পেয়ে যায় চূড়ান্তপর্বে। ১২ বার চূড়ান্তপর্বে খেলা সুইডেন নেই এবার। তাদের মতো স্কটল্যান্ড, নাইজেরিয়া, মিসরও নেই চূড়ান্তপর্বে। থাকছে না কলম্বিয়া, চিলি, প্যারাগুয়েও। ফুটবল ঐতিহ্যের এই দেশগুলোকে যারা বিদায় করে উঠে এসেছে বিশ্বকাপের মূল পর্বে তারা নিশ্চয়ই ভালো ফুটবল দিয়ে দুঃখটা ঘুচিয়ে দেবে। কাতার বিশ্বকাপ এবার অনুষ্ঠিত হবে নভেম্বর-ডিসেম্বর। জুন-জুলাইয়ে মরুভূমির তীব্র গরমের কারণেই ফিফার এমন সিদ্ধান্ত। তবে বিশ্বকাপ যখনই হোক তার জৌলুশ কমবে না। মরুর বুকে তাই মেসি-নেইমার-রোনালদো-এমবাপেদের ফুটবল প্রদর্শনী দেখার অপেক্ষায় প্রহর গুনছে ৩২ দেশের সঙ্গে গোটা দুনিয়ার মানুষ।