নদীর পাড় ধসের হুমকিতে আশ্রয়ণ প্রকল্পের ২৩ ঘর

নেত্রকোনার কলমাকান্দা উপজেলায় ফুলবাড়ি আশ্রয়ণ প্রকল্পের নদীর পাড় থেকে বাংলা ড্রেজার (স্থানীয়ভাবে নির্মিত) দিয়ে অবাধে বালু উত্তোলনের অভিযোগ উঠেছে।

নদীর পাড় ধসে হুমকির মধ্যে রয়েছে প্রধানমন্ত্রীর দেয়া উপহার আশ্রয়ণ প্রকল্পে ২৩টি ঘরের বাসিন্দারা।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ড্রেজার দিয়ে দিয়ে বালু উত্তোলন ও তা বাণিজ্যিকভাবে বিক্রির কাজে জড়িত গোড়াগাঁও গ্রামের জহিরুল ও শফিক নামে দুই যুবক।

২০১০ সালে বালুমহাল ও মাটি ব্যবস্থাপনা আইনে (৬২নং আইন ধারা ৪) বিপননের উদ্দেশ্যে কোন উন্মুক্ত স্থান, চা বাগানের ছড়া বা নদীর তলদেশ হতে বালু বা মাটি উত্তোলন করা যাবে না। (ধারা ৪ খ)- সেতু, কালভার্ট, ড্যাম, ব্যারেজ, বাঁধ, সড়ক, মহাসড়ক, বন, রেললাইন ও অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ সরকারি ও বেসরকারি স্থাপনা হইলে, অথবা আবাসিক এলাকা হতে সর্বনিম্ন এক কিলোমিটার বা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ নির্ধারিত সীমানা এবং (ধারা ৪-গ) উত্তোলন বা বিপণনের উদ্দেশ্যে ড্রেজিংয়ের ফলে কোন নদীর তীর ভাঙনের শিকার হতে পারে সেসব স্থানকে এ আইনের আওতায় নিষেধাজ্ঞার মধ্যে নির্ধারিত রয়েছে।

সরেজমিনে দেখা যায়, ফুলবাড়ি আশ্রয়ণ প্রকল্পের নদীর দক্ষিণ ও উত্তর পাশে দুটি ড্রেজার দিয়ে বালু উত্তোলন করা হয়েছে। প্রায় আধা ঘণ্টা অবস্থানকালে শ্রমিকেরা চারটি লরিতে বালু ভর্তি করছে ও ভর্তি শেষে লরিগুলো চলে যাচ্ছে। চারটি খালি লরি বালু ভর্তির জন্য অপেক্ষমাণ। সাংবাদিকের উপস্থিতি টের পেয়ে তিনটি লরি বালু ভর্তি না করে ঘুরিয়ে চলে গেছে।

এ বিষয়ে আশ্রয়ণ প্রকল্পের সন্নিকটের বাসিন্দা বীর মুক্তিযোদ্ধা ওয়াহাব মিঞা জানান, ‘দক্ষিণ পাশের ড্রেজারটি ১৫-১৬ দিন ও উত্তর পাশেরটি ৭-৮ দিন এ রকম সময়ের আগে বসানো হয়েছে। এলাকার মানুষ বাধা দিয়েছে। আমরারে তো তারা দামই দেয় না। প্রতিদিন সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত ড্রেজারের মেশিন চালু থাকে। পরে উত্তোলিত বালু ৬-৭টি লরি দিনে রাতে কয়েকবার করে বালু ভর্তি করে নিয়ে যাচ্ছে। আশ্রয়ণ প্রকল্পের কাজে বালু লাগবে বলে ইউএনও নিজে এসে দেখে গেছেন। তার অফিসের লোকজনও আসে। আমাদের বাধা সত্ত্বেও বালু উত্তোলন করছে। প্রতিদিন পড়ে ২৫-৩০ লরি বালু কোথায় যাচ্ছে, যারা নেয় তারাই বলতে পারবে। নদীর পাড় ভেঙে পড়তাছে। ফুলবাড়ি আশ্রয়ণ প্রকল্পের বাসিন্দাদেরতো নিরাপত্তাই নাই।’

ফুলবাড়ি আশ্রয়ণ প্রকল্পের বাসিন্দা মো. রহমত আলীর সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, ড্রেজার প্রায় ২০-২৫ দিন আগে বসছে। তারা বিভিন্ন জায়গায় বালু নিয়ে বিক্রি করছে। আবার জিজ্ঞাসা করলে বলে এখানে আবাসনের জন্য নতুন করে ঘর করা হবে তার জন্য বালু উত্তোলন করা হচ্ছে।

এখানকার আরেক বাসিন্দা অলকা তার ঘরের পেছনে নদীর পাড় ভেঙে পড়ছে তা দেখিয়ে বলেন, ‘সরকার তো আমাদের ঘর দিছে। এখন আমাদের থাকার মতো কোন ভাউ (অবস্থা) নেই। ভাইঙ্গা চুইড়া সব নিতাছে গা।’

লরিতে বালু তোলার কাজে নিয়োজিত আবুল কাশেম নামে এক শ্রমিক জানান, বালু ভর্তি লরি কলমাকান্দা পূর্ববাজারে কাঠমিল এলাকায় যাবে। প্রতি লরি লোড করলে চারশো টাকা পান। এর বেশি কিছু জানেন না তিনি।

প্রকল্প এলাকায় রাস্তায় মোটরসাইকেল নিয়ে দাঁড়ানো এক যুবককে সাংবাদিক পরিচয়ে তার নাম পরিচয় জানার চেষ্টা করলে ঔদ্ধত্যপূর্ণ আচরণ করে বলতে থাকেন, ক্যামেরা বন্ধ করেন। কোন কথাই বলতে চান না। তার কথার একপর্যায়ে ড্রেজারে কাজ করেন প্রকাশ পায়। পরে স্থানীয়দের মাধ্যমে জানা যায় তিনি হলেন একই ইউনিয়নের গৌরীপুর গ্রামের শাহ আলম।

বালু উত্তোলনে জড়িত শফিকের সাথে ফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি জানান, ‘এগুলো আমার নিজের কাজের জন্য না। আবাসনের সাইডে গর্ত হয়ে আছে এগুলো ভরাট করা হবে। আবাসনের কাজের জন্য কিছু বালু যাচ্ছে নাজিরপুর ও রহিমপুরে। চেয়ারম্যান, মেম্বার ও সবাইকে অবগত করে ইউএনও স্যার নিজেই ড্রেজার বসাইয়া তুয়ে গেছে।’

আবাসন ছাড়া বালু কলমাকান্দাসহ বিভিন্ন জায়গায় যাচ্ছে এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, ‘হালকা কিছু বেচতাছি। বাংলা ড্রেজার চালাতে মোটামুটি ছয়-সাত হাজার টাকা খরচ আছে আপনারা নিজেইরাতো বুঝেন। ’

বন্ধু ফাউন্ডেশনের পক্ষে হাইকোর্টে রিট আবেদনকারীর একজন হযরত আলী গণেশ^রী নদী থেকে বালু উত্তোলনে আদালতের নিষেধাজ্ঞা বিষয়টির সত্যতা নিশ্চিত করে বলেন, চার বছর আগে নিষেধাজ্ঞা দিলেও কি হবে। মাঝে মাঝে ড্রেজার বসিয়ে বালু উত্তোলন শুরু করে। এগুলো বন্ধ করতে ইউএনও কাছে পিটিশন ও এর অনুলিপি ডিসির বরাবরে দিয়ে প্রাথমিকভাবে বন্ধের ব্যবস্থাও নেই।

এ ব্যাপারে কথা বলতে কলমাকান্দা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. আবুল হাশেমের কার্যালয়ে গেলে তিনি ভিডিও ও অডিও রেকর্ডের বক্তব্য দিতে চাননি।

তিনি বলেন, বালু পাব কোথা থেকে। ‘বড়খাপনসহ কয়েক জায়গায় আশ্রয়ণের গৃহ নির্মাণে সেরকম বরাদ্দও নেই। তাই বালুর প্রয়োজনে ড্রেজার বসানো হয়েছে। বালু বিক্রি করছে এটা জানা ছিল না।’

এ নদী থেকে বালু উত্তোলনে আদালতের নিষেধাজ্ঞা ও অবৈধভাবে বালু উত্তোলনে আপনার উপর ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনার ভার ন্যস্ত, স্থানীয়রা বলছে আপনি নিজেই বসালেন ড্রেজার প্রতিবেদকের এমন প্রশ্নে ইউএনও জানান, ‘আদালতের নিষেধাজ্ঞার বিষয়টি জানা নেই। এখনই নায়েবকে বন্ধ করার নির্দেশনা দিচ্ছি।’