দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ পৃথিবীর মানুষের জন্য অন্যতম এক ধাক্কার নাম। এই যুদ্ধের ফলে পৃথিবীকে এককেন্দ্রিক বিশ্বব্যবস্থার দিকে ঝুঁকতে হয়। এমন বিশ্বব্যবস্থা তৈরিতে ১৯৭০ সালের দিকে সবচেয়ে বড় ভূমিকা রাখে পেট্রোডলার। বিশ্বের যেখানেই তেল ক্রয়-বিক্রয় হবে, তা যুক্তরাষ্ট্রের ডলারে হতে হবে, এমন আইন করে যুক্তরাষ্ট্র। ফলে যুক্তরাষ্ট্রের কাছে জিম্মি হয়ে পড়ে গোটা বিশ্ব। যুক্তরাষ্ট্র তার স্বার্থের কথা চিন্তা করে কিছু দেশকে পেট্রোডলারের সুবিধা দেয়, যেমন সৌদিআরব, কুয়েত, আমিরাতসহ আরও কয়েকটি দেশ। ওয়াশিংটনের স্বার্থে আঘাত হানলে, ওই দেশের ওপর একচেটিয়া নিষেধাজ্ঞা দেওয়ার যে রাজনীতি শুরু করে যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্ররা, এতে ক্রমশ বিশ্বে যুক্তরাষ্ট্রবিরোধী একটি বলয় বাড়তে থাকে। এই বলয়ে বর্তমানে রয়েছে রাশিয়া, চীন, ইরান, উত্তর কোরিয়ার মতো কিছু দেশ।
ইউক্রেনে রাশিয়ার বিশেষ অভিযানের মধ্য দিয়ে যুক্তরাষ্ট্রকেন্দ্রিক বিশ্বব্যবস্থায় প্রথম ধাক্কা লাগে। সম্প্রতি রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভøাদিমির পুতিন ‘ইউনিপোলার বিশ্বের’ (এককেন্দ্রিক বিশ্বব্যবস্থা) সমাপ্তি ঘোষণা করেছেন। গত শুক্রবার সেন্ট পিটার্সবার্গে ইন্টারন্যাশনাল ইকোনমিক ফোরামে এক বক্তৃতায় পশ্চিমা বিশ্বের দেশগুলোর সমালোচনা করার পর এ ঘোষণা দেন তিনি।
দর্শকদের উদ্দেশে পুতিন বলেন, ‘স্নায়ুযুদ্ধে জেতার পর যুক্তরাষ্ট্র নিজেদের পৃথিবীর একচ্ছত্র প্রতিনিধি হিসেবে ঘোষণা করেছে। তাদের কোনো দায়িত্ববোধ নেই, কেবল নিজেদের স্বার্থের চিন্তা রয়েছে। তারা নিজেদের ওই স্বার্থগুলোকে পবিত্র বলে ঘোষণা করেছে। এটি একটি একমুখী প্রক্রিয়া, যার কারণে পৃথিবী হয়ে গেছে অস্থিতিশীল।’ পুতিনের এ বক্তৃতাটি নিয়ে প্রচুর আগ্রহ তৈরি হয়েছিল। তবে ‘বড়’ ধরনের সাইবার হামলার কারণে বক্তৃতা দিতে দেড়ঘণ্টা দেরি হয়। ক্রেমলিনের মুখপাত্র দিমিত্রি পেসকভ তাৎক্ষণিকভাবে সাংবাদিকদের জানিয়েছিলেন, কনফারেন্সস্থলে ডিস্ট্রিবিউটেড ডিনায়াল অব সার্ভিস (ডিডিওএস; এক ধরনের সাইবার হামলা) অ্যাটাকের কারণে বক্তৃতা সাময়িকভাবে স্থগিত করা হয়েছে। তবে কারা ওই হামলা চালিয়েছিল তা নিশ্চিত হওয়া যায়নি। ইউক্রেনিয়ান আইটি আর্মি নামে একটি হ্যাকার দল এক সপ্তাহ আগে সেন্ট পিটার্সবার্গ ফোরামকে তাদের লক্ষ্যবস্তু হিসেবে টেলিগ্রামে ঘোষণা দিয়েছিল।
পুতিনের এ বক্তৃতা থেকে ইউক্রেন যুদ্ধ নিয়ে তার চিন্তাভাবনা জানা যাবে বলে প্রত্যাশা করা হয়েছিল। মঞ্চে উঠেই কোনোপ্রকার ভণিতা না করেই সরাসরি যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের সমালোচনা শুরু করেন তিনি। পুতিন বলেন, ‘তারা নিজেদের মতো করে নিজেদের অতীতের ভ্রান্তিতে আচ্ছন্ন রয়েছে... তারা মনে করে... তারা জিতে গেছে আর বাকি সব তাদের কলোনি, বাড়ির পেছনের জঙ্গল। আর সেখানে যারা বাস করছে তারা দ্বিতীয় শ্রেণির নাগরিক। রাশিয়ার ইউক্রেনে ‘বিশেষ অভিযান’ পশ্চিমাদের জন্য ত্রাতা হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে, কারণ এর মাধ্যমে তারা সব সমস্যার জন্য রাশিয়াকে দোষারোপ করতে পারছে।’ রাশিয়ার অর্থনীতিকে ক্ষতিগ্রস্ত করার চেষ্টার জন্য পশ্চিমাদের দোষারোপ করে পুতিন নিষেধাজ্ঞাকে ‘পাগলামি’ ও ‘অপরিণামদর্শী’ হিসেবে মন্তব্য করেছেন।
রাশিয়ার ওপর নিষেধাজ্ঞা দিয়ে পশ্চিমা দেশগুলো সফল হতে পারেনি বলে দাবি করে পুতিন বলেন, ‘এটা কাজ করেনি। রাশিয়ার ব্যবসায়ীরা কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে কাজ করে গেছে, আমরা এখন অর্থনীতিকে স্বাভাবিক করে তুলছি।’ গত সপ্তাহে রাশিয়ার দীর্ঘকালীন প্রেসিডেন্ট ভøাদিমির পুতিন ইঙ্গিত দিয়েছিলেন ইউক্রেনে তার লক্ষ্য হলো রাশিয়াকে একটি সাম্রাজ্যবাদী শক্তি (ইমপেরিয়াল পাওয়ার) হিসেবে পুনরায় উত্থান ঘটানো। শুক্রবার ইউরোপীয় কমিশন ইউক্রেন ও মলদোভাকে ইইউ ক্যান্ডিডেট দেওয়ার পক্ষে সমর্থন প্রকাশ করেছে। এদিকে ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ) প্রসঙ্গে শুক্রবারের
বক্তৃতায় পুতিন বলেছেন, এই ব্লকটি ‘সার্বভৌমত্ব হারিয়ে ফেলেছে। ইইউর নেতারা নিজেদের জনগণের ক্ষতি করে অন্যের কথায় নেচে বেড়াচ্ছে।’