দিনাজপুর আমেনাবাকী রেসিডেন্সিয়াল মডেল স্কুল অ্যান্ড কলেজে চার ছাত্রীকে যৌন হয়রানির অভিযোগ উঠেছে প্রতিষ্ঠানটির অধ্যক্ষের বিরুদ্ধে। এ অবস্থায় অধ্যক্ষকে ছুটি দিয়েছে বিদ্যালয় কমিটি।
তবে অধ্যক্ষকে নির্দোষ দাবি করে ওই প্রতিষ্ঠানের কিছু শিক্ষার্থী ক্যাম্পাসে বিক্ষোভ ও ভাঙচুর চালায়। এ পরিপ্রেক্ষিতে বিদ্যালয়ে শুক্রবার পর্যন্ত ছুটি ঘোষণা করা হয়। সংবাদ সংগ্রহ করতে গিয়ে বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের তোপের মুখে পড়তে হয়েছে সংবাদকর্মীদের।
জানা যায়, প্রায় ২০ দিন আগে বিদ্যালয়ের এক ছাত্রী তার বাবা-মাকে জানায় যে অধ্যক্ষ ‘তার গায়ে হাত দিয়েছে’। এমন অভিযোগের পর ওই বাবা-মা মামলার প্রস্তুতি নিলে মেয়েটির চাচা বিদ্যালয় পরিচালনার প্রতিষ্ঠান এবি ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান ডা. আমজাদ হোসেনকে অবহিত করেন। এরই মধ্যে অধ্যক্ষের বিরুদ্ধে আরো তিন ছাত্রী যৌন হয়রানির অভিযোগ তোলে। এ ঘটনায় ৫ জুন থেকে বিদ্যালয়ের অধ্যক্ষ মিজানুর রহমানকে ছুটিতে পাঠানো হয়।
স্থানীয় ও অভিভাবকরা জানান, শনিবার (১৮ জুন) রাতে বিদ্যালয়ের আবাসিক শিক্ষার্থীরা অধ্যক্ষের বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগ মিথ্যা ও বানোয়াট উল্লেখ করে প্রথমে ছাত্রীরা বিক্ষোভ শুরু করে। পরে ছাত্ররাও বিক্ষোভে যোগ দেয়। এ সময় তারা বিদ্যালয়ের ক্যাম্পাসে ফুলের টব, গাছপালা, ভবনের জানালা ভাঙচুর করে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে তাৎক্ষণিক চিরিরবন্দর থানা পুলিশ ঘটনাস্থলে যায়। রাত প্রায় ১২টার দিকে শিক্ষার্থীদের বুঝিয়ে হোস্টেলে ফেরত পাঠানো হয়। পরদিন রোববার (১৯ জুন) সকালেও শিক্ষার্থীরা বিক্ষোভের চেষ্টা করে। এ সময় ম্যানেজিং কমিটি সংশ্লিষ্টরা শুক্রবার পর্যন্ত বিদ্যালয় বন্ধ ঘোষণার সিদ্ধান্ত নেয়। দুপুরের মধ্যে বিদ্যালয়ের সব শিক্ষার্থীর অভিভাবককে বিদ্যালয় বন্ধের সিদ্ধান্ত জানিয়ে সন্তানদের বাড়ি নিয়ে যেতে বলা হয়। পরে অভিভাবকেরা তাদের সন্তানদের বিদ্যালয় থেকে নিয়ে যান।
এরপর রোববার বিকেলে আমেনা বাকী রেসিডেন্সিয়াল মডেল স্কুল অ্যান্ড কলেজে যায় দৈনিক দেশ রূপান্তরসহ বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে কর্মরত আট সাংবাদিক। তবে তারা সেখানে শিক্ষকদের বাধার মুখে পড়েন। এ সময় অভিভাবক ও শিক্ষার্থীদের সঙ্গে কথা বলতে চাইলেও শিক্ষকরা বাধা দেন।
অভিভাবক অশান্ত ঘোষ বলেন, কেন স্কুল বন্ধ দেওয়া হয়েছে তা আমাদের জানানো হয়নি। শুধু ফোন করে বলা হয়েছে, এখুনি আপনার বাচ্চাদের নিয়ে যান।
শরিফুল ইসলাম নামে বলেন, শুনেছি মেয়েদের গায়ে হাত দেওয়া হয়েছে এমন একটি ঘটনা আছে। তবে বিস্তারিত জানি না।
চিরিরবন্দর থানার অফিসার্স ইনচার্জ বজলুর রশিদ বলেন, শিক্ষার্থীরা বিক্ষোভ করছে এমন বিষয় অবহিত হওয়ার পর আমি ঘটনাস্থলে গিয়ে একাধিক শিক্ষার্থীর সঙ্গে কথা বলি। পরে বিদ্যালয়ের ম্যানেজিং কমিটির সদস্য ও শিক্ষকদের সঙ্গে কথা বলি। অধ্যক্ষের বিরুদ্ধে মোট চার ছাত্রী যৌন হয়রানির অভিযোগ করেছে। তবে বিদ্যালয়ের যেসব শিক্ষার্থী বিক্ষোভ করছিল তাদের দাবি, অধ্যক্ষ নির্দোষ। অধ্যক্ষের স্ত্রী এ বিদ্যালয়ের শিক্ষিকা এবং তাদের মেয়েও এখানে পড়াশোনা করে। ওই মেয়ের বন্ধুরা মিলে অধ্যক্ষ নির্দোষ দাবি করে তাকে স্বপদে বহাল রাখার দাবি তোলে। তবে তাৎক্ষণিক শিক্ষার্থীদের বুঝিয়ে তাদের হোস্টেলে ফেরত পাঠাই। এ ব্যাপারে এখন পর্যন্ত আমার কাছে লিখিত কোন অভিযোগ দেওয়া হয়নি।
বিদ্যালয়ের ছুটিপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ মিজানুর রহমান বলেন, ‘আমার বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগ মিথ্যা। বিদ্যালয়ে একজন শিক্ষার্থী আছে যার পায়ে ছয় আঙুল, এ জন্য সে জুতা পরতে পারে না। ওই শিক্ষার্থী একদিন আমাকে অভিযোগ করছিল যে, সে জুতা পরতে পারে না, বিষয়টি নিয়ে ক্লাস শিক্ষকরা তাকে বলেছিল যে সে কেন জুতা পরে না। পরে তার মাথায় হাত রেখে আমি বলেছি যে, ‘মা তুমি চিন্তা করিও না। আমি অন্যান্য শিক্ষকদের বিষয়টি বলে দেব’। আর একদিন কম্পিউটার ল্যাবে আমি নাকি একজন শিক্ষার্থীর হাতে হাত রেখেছি। এখন শেখাতে গেলে হয়তো মাউসে হাত রেখেছি। কিন্তু সেখানে তো সিসি ক্যামেরা আছে। চাইলেই বাস্তব বিষয়টি দেখা যেতে পারে। আমার বিরুদ্ধে এখানে ষড়যন্ত্র হচ্ছে। কিছু ব্যক্তি আমাকে এখান থেকে সরিয়ে দিতে চায়। এটি এমনও হতে পারে যে, প্রতিষ্ঠানটিকে নষ্ট করে দেওয়ার একটি চক্রান্ত’।
এ ব্যাপারে এবি ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান ডা. আমজাদ হোসেন বলেন, ‘অধ্যক্ষ মিজানুর রহমানের এই প্রতিষ্ঠানটির পেছনে অনেক অবদান আছে। তার বিরুদ্ধে যে অভিযোগ আনা হয়েছে তা স্পর্শকাতর। আমরা বিষয়টি অধিকতর তদন্ত করে দেখছি। এ সময় পর্যন্ত তাকে ছুটি প্রদান করা হয়েছে। এরই মধ্যে শিক্ষার্থীরা বিক্ষোভ করেছে। এতে করে হয়তো এমন হতে পারে যে, নিজেদের দ্বারাই শিক্ষার্থীরা আঘাতের শিকার হতে পারে। এ জন্য প্রতিষ্ঠানটি সাময়িকভাবে বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে’।
দিনাজপুর আমেনাবাকী রেসিডেন্সিয়াল মডেল স্কুল অ্যান্ড কলেজে প্রায় ২২০০’র অধিক শিক্ষার্থী পড়াশোনা করে। যার মধ্যে অধিকাংশই আবাসিক।