কনডেম সেল থেকে ১৪ বছর পর মুক্ত হচ্ছেন দুজন, একজনের যাবজ্জীবন

রাজশাহীর গোদাবাড়িতে একটি হত্যা মামলায় বিচারিক আদালতে চারজনের বিরুদ্ধে মৃত্যুদণ্ডের রায় হয় প্রায় ১৪ বছর আগে। এরপর হাইকোর্টেও সর্বোচ্চ দণ্ড বহাল থাকে। তবে আপিল বিভাগের রায়ে মৃত্যুদণ্ড থেকে খালাস পেয়েছেন ইসমাইল হোসেন বাবু ও সোনারুদ্দি নামে দুজন। এ ছাড়া তরিকুল ইসলাম নামে এক আসামির মৃত্যুদণ্ড রহিত করে তাকে যাবজ্জীবন সাজা দিয়েছে সর্বোচ্চ আদালত।

মৃত্যুদণ্ড প্রাপ্ত পলাতক মো. মোক্তার নামে এক আসামির মৃত্যুদণ্ড বহাল রয়েছে রায়ে।

বৃহস্পতিবার প্রধান বিচারপতি হাসান ফয়েজ সিদ্দিকীর নেতৃত্বে গঠিত আপিল বিভাগ এ রায় দেয়। বেঞ্চের অপর দুই বিচারক বিচারপতি ওবায়দুল হাসান ও বিচারপতি এম. ইনায়েতুর রহিম।

সংশ্লিষ্ট আইনজীবীরা বলছেন, দীর্ঘ দিন ধরে কারাগারের কনডেম সেলে থাকা একজনের স্বীকারোক্তিমুলক জবানবন্দি এবং পারিপার্শ্বিক সাক্ষ্য-প্রমাণ অভিযোগের সঙ্গে সন্নিবেশিত না হওয়ায় দুজনকে খালাস এবং একজনের দণ্ড কমিয়ে রায় দিয়েছে আপিল বিভাগ।

সংক্ষিপ্ত রায়ের বরাতে আইনজীবীরা বলেন, খালাসপ্রাপ্ত দুজনের বিরুদ্ধে অন্য কোনো মামলা না থাকলে তাদের দ্রুত কনডেম সেল থেকে মুক্তির নির্দেশ দিয়েছে আপিল বিভাগ। এখন আদালতের রায়ের অনুলিপি সংশ্লিষ্ট কারাগারে যাবে। সেখানে নথি যাচাই ও অন্যান্য প্রক্রিয়া শেষ হলে দুজন মুক্তি পাবেন। এ ছাড়া একই সময় ধরে কনডেম সেলে থাকা তরিকুলকে নিয়ে যাওয়া হবে সাধারণ সেলে।

মামলার নথি ও সংশ্লিষ্ট আইনজীবীদের তথ্য মতে, ২০০৬ সালের ২০ অক্টোবর রাজশাহীর গোদাগাড়ীর ধোয়াপাড়া যৌবন গ্রামের সৌদি প্রবাসী মো. বজলুর রহমানের বাড়িতে হানা দেয় দুর্বৃত্তরা। এ সময় তার স্ত্রী মিলিয়ারা খাতুন ওরফে   মিলু (৩০) এবং তার মেয়ে পারভীন ওরফে শাবনুরকে (৯) গলা কেটে হত্যা করা হয়। পরদিন মিলিয়ারার বাবা রফিকুল ইসলাম স্থানীয় থানায় অজ্ঞাতনামাদের আসামি করে একটি মামলা করেন। পরে এ মামলায় একই এলাকার সোনাদ্দি ওরফে সোনারুদ্দি, ইসমাইল হোসেন বাবু, তরিকুল ইসলাম ওরফে ভুতা এবং মো. মোক্তার নামে তিনজনকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ।

আসামি তরিকুল ফৌজদারি  কার্যবিধির ১৬৪ ধারায় আদালতে স্বীকারোক্তিমুলক জবানবন্দী দেন। তদন্ত শেষে চারজনকে অভিযুক্ত করে সংশ্লিষ্ট আদালতে অভিযোগপত্র দেয় পুলিশ।

এতে বলা হয়, ঘরে থাকা ৫০ হাজার টাকার লোভে ডাকাতি করতে গিয়ে মা-মেয়েকে হত্যা   করেন আসামিরা। এ ছাড়া আসামিদের বিরুদ্ধে মিলিয়ারাকে হত্যার আগে ধর্ষণের অভিযোগ আনা হয়।

সাক্ষ্যগ্রহণ ও যুক্তিতর্কের শুনানি নিয়ে ২০০৮ সালের ২৩ জুলাই রাজশাহীর দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনাল চার আসামির সবাইকে মৃত্যুদণ্ডের সাজা দেয়। এরপর নিয়ম অনুযায়ী দণ্ডপ্রাপ্তদের ডেথ রেফারেন্স (মৃত্যুদণ্ড অনুমোদন) হাইকোর্টে আসে। পাশাপাশি কনডেম সেলে থাকা তিন আসামি আপিল করেন। তবে, মোক্তার পলাতক থাকায় আপিলের সুযোগ পাননি।

শুনানি শেষে বিচারপতি সহিদুল করিমের নেতৃত্বে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চ ২০১৪ সালের ১৩ মার্চ এক রায়ে তিন আসামির আপিল খারিজ ডেথ রেফারেন্স অনুমোদন করে বিচারিক আদালতের দেওয়া সর্বোচ্চ সাজা বহাল রাখে। এরপর হাইকোর্টের এ রায়ের বিরুদ্ধে আপিল বিভাগে আপিল করেন সোনারুদ্দি ও ইসমাইল। তরিকুলের পক্ষে জেল আপিল হয়। শুনানি শেষে দুজনের আপিল গ্রহণ করে তাদের খালাস ও তরিকুলের সাজা সংশোধন করে তাকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া হয় রায়ে।

আদালতে ইসমাইলের পক্ষে শুনানিতে ছিলেন জ্যেষ্ঠ আইনজীবী এস এম শাহজাহান। সোনারুদ্দির পক্ষে ছিলেন আইনজীবী হেলাল উদ্দিন মোল্লা। তরিকুলের পক্ষে ছিলেন রাষ্ট্র নিযুক্ত আইনজীবী এস এম বকস কল্লোল। রাষ্ট্রপক্ষে ছিলেন ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল বশির আহমেদ।

রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আসামিরা দীর্ঘ দিন ধরে কনডেম সেলে রয়েছেন। মাত্র একজন আসামি স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন। পারিপার্শ্বিক সাক্ষ্য ও অন্যান্য বিষয় বিবেচনা করে আপিল বিভাগ দুজনকে খালাস এবং একজনের মৃত্যুদণ্ড কমিয়ে দিয়েছেন। রায়ে বলা হয়েছে, এর সংক্ষিপ্ত অনুলিপি কারাগারে দ্রুত পৌঁছাতে হবে এবং দ্রুত দুজনকে মুক্তি দিতে হবে।’

অ্যাডভোকেট এস এম বকস কল্লোল দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘কনডেম সেলে থাকা আসামি তরিকুল জেল আপিল করেছিলেন। আপিল বিভাগ তার মৃত্যুদণ্ড কমিয়ে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দিয়েছেন। এখন তাকে কনডেম সেল থেকে সাধারণ সেলে নিয়ে যাওয়া হবে। পূর্ণাঙ্গ রায় পাওয়ার পর বিস্তারিত জানা যাবে।’

রায়ের বরাতে অ্যাডভোকেট হেলাল উদ্দিন মোল্লা দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘খালাস পাওয়া দুজনকে মুক্তি দিতে এবং যাবজ্জীবন সাজাপ্রাপ্ত তরিকুলকে কনডেম সেল থেকে সাধারণ সেলে নিয়ে যাওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন আদালত। ফলে ১৪ বছর ধরে এ তিনজনের কনডেম সেল জীবন শেষ হতে যাচ্ছে।’